বৈশ্বিক শুল্ক ১৫ শতাংশে বাড়ানোর ঘোষণা ট্রাম্পের
ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। তার বৈশ্বিক শুল্ক নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেওয়ার পর তিনি ওই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা অব্যাহত রেখেছেন। রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
এর আগে শুক্রবার আদালত কর্তৃক বাতিল হওয়া শুল্কের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তবে শনিবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানান, আগে কখনো ব্যবহার হয়নি—এমন একটি আইনের আওতায় তিনি শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করবেন।
এই আইনে নতুন কর সর্বোচ্চ পাঁচ মাস পর্যন্ত কার্যকর রাখা যাবে। এরপর তা অব্যাহত রাখতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এখন সেটি ১৫ শতাংশে উন্নীত হলে কবে থেকে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারার অধীনে নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশের জন্য প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ এসব দেশ আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ শতাংশ শুল্কে বাণিজ্য চুক্তি করেছিল।
ট্রাম্প দাবি করেন, সুপ্রিম কোর্টের ‘হাস্যকর, দুর্বলভাবে লেখা ও শুল্কবিরোধী’ রায় পর্যালোচনা করেই তার প্রশাসন শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ৬-৩ ভোটে আদালত রায় দেয়, ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে গত বছর ব্যাপক বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই আইন ব্যবহার করে ইতোমধ্যে অন্তত ১৩০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর ট্রাম্প বলেন, আদালতের কিছু সদস্যের জন্য তিনি ‘লজ্জিত’ এবং যারা তার বাণিজ্য নীতি প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাদের ‘বোকা’ আখ্যা দেন।
রায়টি সমর্থন করেন তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি, যাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মনোনীত। বিচারপতি অ্যামি কোনে ব্যারেট ও নেইল গরসাচকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন ট্রাম্প নিজেই। অন্যদিকে রায়ের বিরোধিতা করেন ক্ল্যারেন্স থমাস, ব্রেট কাভানাফ ও স্যামুয়েল আলিতো।
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি তার অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার দাবি, এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াবে। তবে সর্বোচ্চ আদালতের রায় তার ক্ষমতার ওপর বড় সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে এবং দ্বিতীয় মেয়াদের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিয়েছে।
ট্রাম্পের যুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুল্ক প্রয়োজন। কিন্তু চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে—২০২৪ সালের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাল্টিমোরের একটি ইস্পাত কারখানার মালিক ড্রু গ্রিনব্লাট বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে তিনি ‘খুবই হতাশ’। তার মতে, এতে দরিদ্র মানুষদের উৎপাদন খাতে কাজ পেয়ে মধ্যবিত্তে উন্নীত হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।
অন্যদিকে ভার্জিনিয়ার সয়াবিন চাষি ও ন্যাশনাল ব্ল্যাক ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা জন বয়েড বলেন, ‘এটি আমার জন্য বড় জয় এবং প্রেসিডেন্টের জন্য বড় পরাজয়। যেভাবেই দেখা হোক না কেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখানে হেরেছেন।’
যুক্তরাজ্য সরকারের সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা ও এসইসি নিউগেটের পরিচালক অ্যালি রেনিসন বলেন, ‘এটি মুক্ত বাণিজ্যের জন্য ভালো দিন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে বাণিজ্য আরও জটিল হয়ে গেছে।’
তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে শুল্ক নীতি আরও জটিল আকার নিচ্ছে।
১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া অধিকাংশ পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যাবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ধাতু ও ওষুধের মতো কিছু পণ্য এই শুল্কের বাইরে থাকবে।
ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কাঠ ও গাড়ির ওপর অন্য আইনের অধীনে আরোপিত শুল্ক বহাল থাকবে; সেগুলো আদালতের রায়ে প্রভাবিত হয়নি।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশ আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তারাও ১২২ ধারার অধীনে বৈশ্বিক শুল্কের আওতায় পড়বে। তবে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, ওষুধ, গাড়ি ও বিমান খাত আগের চুক্তির আওতায়ই থাকবে।
যুক্তরাজ্য সরকার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ‘বিশেষ বাণিজ্যিক অবস্থান’ বজায় রাখার আশা করছে।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে ওলাফ শলৎস শুল্ক–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাকে ‘বিষের মতো’ আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় বিষ হলো এই অব্যাহত অনিশ্চয়তা। এর অবসান হওয়া উচিত।’
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বেআইনি শুল্ক ফেরত চাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে আদালত সরাসরি বলেনি, অর্থ ফেরত দেওয়া হবে কি না।
শুক্রবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, আইনি লড়াই ছাড়া কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হবে না এবং এই প্রক্রিয়া কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন কোম্পানি ও বাণিজ্য সংগঠন অর্থ ফেরতের দাবি তোলার কথা জানিয়েছে।