০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৫

থাইল্যান্ডে সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আজ, হবে গণভোটও

থাইল্যান্ডে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত আজ  © সংগৃহীত

পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ডে আজ রবিবার আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ।

নির্ধারিত সময়ের আগেই অনুষ্ঠিত হওয়া এই সাধারণ নির্বাচনকে প্রগতিশীল, জনতাবাদী ও ঐতিহ্যবাহী পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতির মধ্যে একটি ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ৫০টির বেশি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তবে দেশব্যাপী সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তার দিক থেকে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে তিনটি দল—পিপলস পার্টি, ভুমজাইথাই পার্টি এবং ফিউ থাই পার্টি।

থাইল্যান্ডের ৫০০ আসনের সংসদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন অর্জনকারী দল বা জোট পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করবে। তবে স্থানীয় জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, কোনো দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। ফলে নির্বাচনের পর জোট সরকার গঠন অনিবার্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জরিপ অনুযায়ী প্রগতিশীল পিপলস পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হলেও দলটির সংস্কারমূলক রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। ফলে অন্য দলগুলো একত্র হয়ে সরকার গঠন করলে পিপলস পার্টি ক্ষমতার বাইরে ছিটকে পড়তে পারে।

পিপলস পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাত্থাফং রুয়াংপানিয়াওয়ুত। দলটি ২০২৩ সালের নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পাওয়া মুভ ফরওয়ার্ড পার্টির উত্তরসূরি। ওই সময় কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতাদের বাধায় সরকার গঠন করতে না পারায় দলটি ভেঙে দিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে পিপলস পার্টি সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণ ও শহুরে ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে রাজতন্ত্র নিয়ে সমালোচনামূলক আইন সংস্কারের দাবি থেকে তারা সরে এসে অর্থনৈতিক ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কী, নির্বাচন এলেই কেন এই কথা শোনা যায়?

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান নরম করায় দলটির মূল সমর্থন দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে গত বছর কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতের সময় দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ বৃদ্ধি পাওয়ায় সেনাবাহিনীর সমালোচনা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড ফিউচারের সেন্টার ফর পলিটিকস অ্যান্ড জিওপলিটিকসের পরিচালক নাপন জাতুস্রিপিতক বলেন, সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি বর্তমানে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বাধীন ভুমজাইথাই পার্টিকে রাজতন্ত্রপন্থী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুতিন গত সেপ্টেম্বরেই প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী পায়েতোংতার্ন সিনাওয়াত্রার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতা লঙ্ঘনের অভিযোগে পায়েতোংতার্নকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

পরবর্তীতে অনুতিন অনাস্থা প্রস্তাবের মুখে সংসদ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সীমান্ত উত্তেজনার পর নিজেকে যুদ্ধকালীন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ান। তার নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রধান বিষয় হিসেবে স্থান পেয়েছে। পুরোনো পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি ও শক্তিশালী তৃণমূল সংগঠনের মাধ্যমে ভুমজাইথাই পার্টিকে পরবর্তী সরকার গঠনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফিউ থাই পার্টি হচ্ছে ধনকুবের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী দল। দলটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা থাই রাক থাই পার্টির জনতাবাদী নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। বারবার নির্বাচনে জয়ী হলেও সামরিক হস্তক্ষেপ ও আদালতের রায়ে থাকসিনপন্থী সরকারগুলো ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। ২০২৩ সালে তুলনামূলক নরম রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরলেও পরবর্তী দুই বছরে আদালতের রায়ে দুই প্রধানমন্ত্রী অপসারিত হন এবং থাকসিনকে পুরোনো মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বর্তমানে ফিউ থাই পার্টি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নগদ সহায়তার মতো জনতাবাদী প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনে লড়ছে। দলটি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে থাকসিনের ভাতিজা ইয়োদচানান ওয়ংসাওয়াতকে মনোনয়ন দিয়েছে।

আজকের ভোটে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে, ২০১৭ সালে সামরিক সরকারের প্রণীত সংবিধান পরিবর্তনের জন্য নতুন খসড়া প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না। এটি সরাসরি নতুন সংবিধানের খসড়া নয়, বরং সংসদকে সংবিধান প্রণয়নের অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নে ভোট গ্রহণ।

গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো মনে করছে, নতুন সংবিধান সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমানোর জন্য অপরিহার্য। তবে রক্ষণশীলদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালে। সে অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের চার বছর মেয়াদ থাকার কথা থাকলেও রাজনৈতিক সংকট ও সরকার পতনের ধারাবাহিকতায় নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি