২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৪৯

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে যে ৭ ঘটনা ঘটতে পারে

ট্রাম্প ও খামেনি  © সংগৃহীত

ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন পুরোপুরি প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে এবং ধারণা করা হচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যেই এই হামলা হতে পারে। হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুগুলো সম্পর্কে আগে থেকে অনুমান করা গেলেও, এর পরিণাম কী হবে তা একেবারেই অনিশ্চিত।

তেহরানের সাথে শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মার্কিন বাহিনীকে হামলার নির্দেশ দেন, তবে সম্ভাব্য ফলাফলগুলো কী হতে পারে?

 ১. সুনির্দিষ্ট ও নিখুঁত হামলা, ন্যূনতম বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং গণতন্ত্রে উত্তরণ

মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর সামরিক ঘাঁটি, ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি লক্ষ্য করে সীমিত ও নিখুঁত হামলা চালাতে পারে।

এর ফলে ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং ইরান শেষ পর্যন্ত একটি প্রকৃত গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি পুনরায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

তবে এটি একটি অত্যন্ত আশাবাদী ধারণা। ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ সহজভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। যদিও ওই দেশগুলোতে নিষ্ঠুর একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটেছিল, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত বজায় ছিল।

তবে সিরিয়া, যেখানে ২০২৪ সালে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ছাড়াই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, তারা তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

২. শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে কিন্তু নীতিমালায় নমনীয়তা আসবে

একে অনেকটা "ভেনেজুয়েলা মডেল" বলা যেতে পারে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত ও শক্তিশালী পদক্ষেপের ফলে শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলেও তাদের নীতিমালায় পরিবর্তন আসে।

ইরানের ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে—ইসলামিক রিপাবলিক টিকে থাকবে (যা অনেক ইরানিকে সন্তুষ্ট করবে না), কিন্তু তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করতে, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি সীমিত করতে এবং অভ্যন্তরীণ আন্দোলন দমনে কঠোরতা কমাতে বাধ্য হবে।

তবে এটি ঘটার সম্ভাবনাও খুব কম। কারণ গত ৪৭ বছর ধরে ইসলামিক রিপাবলিকের নেতৃত্ব অত্যন্ত অনমনীয় এবং তারা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা তাদের পথ পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না।

৩. শাসনব্যবস্থার পতন এবং সামরিক শাসনের সূচনা

অনেকের মতে এটিই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল। যদিও বর্তমান সরকার অনেক মানুষের কাছে অপ্রিয় এবং প্রতিটি বিক্ষোভের ঢেউ তাদের আরও দুর্বল করছে, তবুও সেখানে একটি বিশাল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো (Deep State) রয়েছে যাদের স্বার্থ বর্তমান ব্যবস্থার টিকে থাকার ওপর নির্ভরশীল।

এখন পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা সফল না হওয়ার প্রধান কারণ হলো—নিরাপত্তা বাহিনী থেকে কোনো বড় ধরনের পক্ষত্যাগের ঘটনা ঘটেনি এবং শাসকরা ক্ষমতা ধরে রাখতে সীমাহীন শক্তি ও নৃশংসতা প্রয়োগে প্রস্তুত। মার্কিন হামলার পরবর্তী বিশৃঙ্খলার মধ্যে আইআরজিসি-র কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সামরিক সরকার ইরান শাসন করতে পারে, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

৪. মার্কিন বাহিনী ও প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের পাল্টা আঘাত

ইরান যেকোনো মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে এবং বলেছে যে, তাদের "আঙুল এখন ট্রিগারে রয়েছে"।

মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনীর শক্তির কাছে ইরান হয়তো টিকতে পারবে না, কিন্তু পাহাড়ের গুহায় বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে লুকিয়ে রাখা তাদের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল দিয়ে তারা হামলা চালাতে পারে। বাহরাইন ও কাতারের মতো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। ইরান চাইলে জর্ডানের মতো যেসব দেশ মার্কিন হামলায় সহায়তা করবে বলে তারা মনে করে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।

২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় ভয়াবহ ড্রোন ও মিসাইল হামলার ঘটনা সৌদিদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সামনে কতটা অরক্ষিত। ফলে মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলো এখন বেশ আতঙ্কিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই এসে পড়বে।

৫. পারস্য উপসাগরে মাইন স্থাপন করে প্রতিশোধ

বিশ্বের জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘদিনের এক বড় হুমকি। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরান সমুদ্রপথে মাইন বিছিয়েছিল।

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ হরমোজ প্রণালী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি (LNG) এবং ২০-২৫ শতাংশ তেল ও তেলজাত পণ্য এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান দ্রুত সমুদ্রসীমায় মাইন স্থাপনের মহড়া চালিয়েছে। যদি তারা এটি করে, তবে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের বাজারে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

৬. মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া

পারস্য উপসাগরে মোতায়েন এক মার্কিন নেভি ক্যাপ্টেন একবার আমাকে বলেছিলেন যে, ইরানের কাছ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি যে হুমকির ভয় পান তা হলো "ঝাঁক বেঁধে হামলা"।

এর অর্থ হলো—ইরান একসাথে এত বিপুল সংখ্যক বিস্ফোরকবাহী ড্রোন এবং দ্রুতগামী টর্পেডো বোট নিয়ে হামলা চালাবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও হয়তো সবগুলোকে একসাথে ধ্বংস করতে পারবে না। পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রথাগত নৌবাহিনীর পরিবর্তে এখন আইআরজিসি নেভি দায়িত্ব পালন করে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে অসম বা ছদ্মবেশী যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছে যাতে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের প্রযুক্তিগত সুবিধাকে অকেজো করে দেওয়া যায়।

কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং বেঁচে যাওয়া ক্রুদের বন্দি করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে এক বিশাল অপমান। যদিও এটি ঘটার সম্ভাবনা কম, তবে ২০০০ সালে এডেন বন্দরে আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় ইউএসএস কোল  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ১৭ জন মার্কিন নাবিক নিহত হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৮৭ সালে ইরাকি বিমানের মিসাইল হামলায় ইউএসএস স্টার্ক-এর ৩৭ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছিলেন।

৭. শাসনব্যবস্থার পতন এবং চরম বিশৃঙ্খলা

এটি একটি বাস্তব বিপদ এবং কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি জাতিগত সংঘাতের ঝুঁকিও রয়েছে। কুর্দি, বালুচ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগে নিজ নিজ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই হয়তো ইসলামিক রিপাবলিকের অবসান দেখতে চায়, বিশেষ করে ইসরায়েল। কিন্তু ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইরানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে যে মানবিক ও শরণার্থী সংকট তৈরি হবে, তা কেউ চায় না।

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সীমান্তের কাছে শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করেছেন। এখন তিনি যদি মনে করেন যে, হামলা না চালালে তিনি "মুখ রক্ষা" করতে পারবেন না, তবে এমন এক যুদ্ধ শুরু হতে পারে যার কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি নেই এবং যার পরিণতি হবে অভাবনীয় ও অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সংবাদসূত্র: বিবিসি