২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৭

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যেকোনো আগ্রাসনের শক্তিশালী জবাব দেবে ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি  © সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হামলার হুমকির জবাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যেকোনো হামলা হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালীভাবে জবাব দিতে প্রস্তুত।

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আব্বাস আরাঘচি লেখেন, ‘আমাদের সাহসী সশস্ত্র বাহিনী ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত আছে—আমাদের প্রিয় ভূখণ্ড, আকাশ ও সাগরের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া জানাতে।’

তিনি বলেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের কয়েকদিনব্যাপী সামরিক হামলা এবং সে সময় ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা থেকে ইরান ‘মূল্যবান শিক্ষা’ নিয়েছে।

আরাঘচির ভাষ্য, ‘১২ দিনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমাদের আরও শক্তিশালী, দ্রুত এবং গভীরভাবে জবাব দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করেছে।’

ট্রাম্পের নতুন করে সামরিক হুমকির কয়েক ঘণ্টা পরই এসব মন্তব্য করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সম্প্রতি সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় ওয়াশিংটনের চাপ বাড়ার মধ্যেই ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দেন।

নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘একটি বিশাল নৌবহর ইরানের দিকে এগোচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, এই বহর ‘প্রয়োজনে দ্রুত ও সহিংসতার সঙ্গে নিজেদের মিশন সম্পন্ন করতে প্রস্তুত।’

এ সময় ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তি করবে—কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগেও বলেছিলাম, এখনো বলছি—চুক্তি করুন।’

পারমাণবিক অস্ত্র প্রসঙ্গে ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়, যখন তিনি বারবার দাবি করে আসছেন যে গত বছরের মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, তেহরান চুক্তিতে না এলে পরবর্তী হামলা হবে ‘আরও ভয়াবহ’।

শক্তি প্রদর্শন ও উত্তেজনা

চলতি মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প, যা পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও, চলতি সপ্তাহে আবার উত্তেজনা বাড়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরী ওই অঞ্চলে পাঠায়।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আদনান হায়াজনেহ বলেন, এই রণতরী মোতায়েন মূলত ওয়াশিংটনের একটি ‘শক্তি প্রদর্শন’। তার ভাষায়, এটি তেহরানের প্রতি বার্তা—’তোমরা যদি আমাদের চাওয়া অনুযায়ী না চলো, তাহলে আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ব।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতি না সামরিক পথ বেছে নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই হুমকিগুলো মূলত ইরানকে আলোচনায় বসাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত কৌশল।

হায়াজনেহ আরও বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করতে চায়, যা অঞ্চলে ইসরায়েলের আধিপত্যের জন্য চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে ইরান দুর্বল অবস্থায় থাকতেই যুক্তরাষ্ট্র এই চাপ বাড়াচ্ছে।

তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। জুনে হামলার পর থেকে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান এখনো অজানা।

কূটনৈতিক অবস্থান

মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হুমকির সমালোচনা করে বলেন, এসব হুমকি ‘অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে এবং এর ফল হবে কেবল অস্থিতিশীলতা।’

এর আগে, বুধবারই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, হামলার হুমকির মধ্যে ইরান পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো আলোচনা পুনরায় শুরু করবে না।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমার সঙ্গে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের কোনো যোগাযোগ হয়নি, এবং আমাদের পক্ষ থেকেও আলোচনার কোনো অনুরোধ জানানো হয়নি।’

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—হুমকির সঙ্গে আলোচনা চলে না। কোনো ভয়ভীতি বা অতিরিক্ত দাবি না থাকলেই কেবল আলোচনা সম্ভব।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে আরাঘচি উল্লেখ করেন, হুমকিমুক্ত পরিবেশে ‘পারস্পরিক লাভজনক, ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক’ একটি পারমাণবিক চুক্তিকে ইরান সবসময় স্বাগত জানায়, যা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার নিশ্চিত করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র না থাকার নিশ্চয়তা দেবে।

তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক আলী হাশেম জানান, প্রকাশ্য হুমকির আড়ালে পর্দার পেছনে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। মধ্যস্থতাকারীরা সংকট সমাধানের চেষ্টা করছেন।
তার ভাষায়, ‘কূটনৈতিক পর্যায়ে অনেক কিছুই ঘটছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় মধ্যস্থতাকারীরা সমাধান বের করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।’

তিনি বলেন, প্রকাশ্যে ইরান লড়াইয়ের প্রস্তুতির সংকেত দিচ্ছে, একই সঙ্গে উপযুক্ত পরিবেশে আলোচনার প্রস্তুতির কথাও জানাচ্ছে।

এদিকে বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘ইরান আবারও পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।’

আঞ্চলিক উত্তেজনা

সামরিক হুমকির কারণে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সতর্ক করেছে, কোনো প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলার জন্য ব্যবহার করে, তাহলে সেই দেশকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

গত জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালায়।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেখানে মার্কিন বাহিনী অবস্থান করছে, ইতোমধ্যে জানিয়েছে—তারা তাদের আকাশসীমা কোনো হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।

বুধবার মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি আলাদা করে আরাঘচি ও মার্কিন দূত উইটকফের সঙ্গে কথা বলেছেন, যাতে ‘অঞ্চলকে নতুন করে অস্থিতিশীলতার চক্রে না ঠেলে শান্ত পরিস্থিতি বজায় রাখা যায়।’

তবে অধ্যাপক হায়াজনেহ মনে করেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর উত্তেজনা কমানোর আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে তেমন প্রভাব ফেলবে না। তার কথায়, ‘ট্রাম্প আসলে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর কথা খুব একটা শোনেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের কথাই শোনেন।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা।