২০ মার্চ ২০২১, ০৯:৪৫

তিনদিন জাবির দাপ্তরিক কার্যক্রম, ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ফটো

করোনা মহামারিতে এক বছর ধরে বন্ধ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত না হলেও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমোদন রয়েছে। তবে কার্যদিবস ও কর্মঘন্টার পরিমাণ কম হওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। দেশের এই অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চলছে সপ্তাহে মাত্র তিনদিন। এতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে দূর-দূরান্ত হতে আসা শিক্ষার্থীদের। মাত্র তিন দিন অফিস চালু থাকায় কাজের চাপও বেড়েছে অনেক। তার ওপর এসব দিনেও অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অফিসে না আসার অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি করেনাপূর্ব স্বাভাবিক নিয়মে অফিস শুরু করা।

গত বছরের ৯ জুলাই লকডাউন পরবর্তী নিউ-নরমালের প্রারম্ভে, সরকারি নির্দেশনা মেনে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল করতে অফিস আদেশ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। অফিস আদেশে বলা হয়, ১২ জুলাই ক্যাম্পাস অথবা ক্যাম্পাসের পাশ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী জনবল দিয়ে স্বল্প পরিসরে (রবি ও বুধবার) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অফিস প্রধান কর্তৃক স্ব-স্ব অফিসে প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন করানো যাবে।

পরে গত বছরের ১ নভেম্বর প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি বাড়াতে সপ্তাহে এক কর্মদিবস বাড়িয়ে তিন দিন অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসন। এছাড়াও প্রতি কর্মদিবস আগের চেয়ে একঘন্টা বৃদ্ধি করা হয়। সে অনুযায়ী বর্তমানে সপ্তাহের রোব, মঙ্গল এবং বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুসারে সেটি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত না হলেও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনদিন যথেষ্ট নয়।

সরকার ও রাজনীতি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘সপ্তাহে মাত্র তিনদিন অফিস চলায় আমার একটি অনিয়মিত পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে প্রায় ১৫ থেকে বিশ দিন লেগে যায়।  আমাকে বিভাগের চেয়ারম্যান, হলের প্রভোস্ট, ব্যাংক এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিস ঘুরতে হয়েছে। হল খোলা না থাকায় ঢাকার বাইরে থেকে আসা-যাওয়াই আমার ভোগান্তি দ্বিগুন হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল রনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নেই। যারা আছেন, তারা সংখ্যায় খুব বেশি নন। তবু এই অল্প শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় কাজ করে দিতে অফিসগুলো এখনো সেই আগের মতই সময় নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে সপ্তাহে তিনদিন নয়, সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন অফিসগুলো খোলা রাখা দরকার। তবে শুধু অফিস খুলে তাতে শিক্ষার্থীদের খুব লাভ হবে, এমন তো না। আমাদের আশা থাকবে, শিক্ষার্থীদেরকে বিপদ থেকে বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয় অন্তত সীমিত পর্যায়ে খুলে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণেও পিছপা হবে না এই স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন।’

এ ব্যাপারে পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সাধারণ সম্পাদক খবির উদ্দিন বলেন, ‘রাষ্ট্রের নিয়মানুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে ক্লাস-পরীক্ষা ছাড়া সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলার কথা। কিন্তু অজানা কারণে জাহাঙ্গীরনগরে তা হচ্ছে না। এখানে মাত্র তিনদিন দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্পষ্টত রাষ্ট্রের নিয়ম লঙ্ঘন করছে।’

এসব দিনেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘করোনার মতো সংকটকালেও যখন একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা একবছর ধরে অফিস করেন না, তখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপারটা নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার সংযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তবে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আমির হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় তিনদিন চলায় অনেকে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে আমরা অবগত রয়েছি। যেকোন সময় আমরা স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে যেতে পারবো। তবে এক্ষেত্রে কিছু প্রক্রিয়া আছে। সেগুলো মান্য করে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফলতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা অপ্রত্যাশিত। কিন্তু করোনার কারণে আমরা কাউকে বাধ্য করতে পারছি না।’

এদিকে রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, কোনো ফাইল স্বাক্ষর করাতে হলে কিছুক্ষেত্রে লেগে যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ দিন। প্রথমে সেটি রেজিস্ট্রারের কাছে যায়, তারপর পরবর্তী কর্মদিবেসে সেটি যায় উপ-উপাচার্যের কাছে। শেষে যায় উপাচার্যের কাছে। অফিস সপ্তাহে মাত্র তিনদিন খোলা থাকার কারণে একটি ফাইল পুরোপুরি প্রস্তুত হতে প্রায় একমাস সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ৬৬দিন বন্ধের পর গত ৩১ মে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে সকল ধরনের সরকারি-বেসরকারি অফিস। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গত ৭ ফেব্রুয়ারি হতে কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী নিয়মে চলছে অফিস। এমনকি রাবি, চবি, জবিসহ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় করোনা পূর্ববর্তী নিয়মে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।