জাবিতে ৫ বছরে গবেষণা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) গবেষণা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে গবেষণা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতি বছরের গবেষণা নিবন্ধের সংখ্যা পর্যালোচনায় এমনটি দেখা গেছে। এ বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জাবির অবস্থান চতুর্থ। তবে গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি।
জার্নাল, বুক রিভিউ এবং কনফারেন্স পেপার সম্পর্কিত সাইটেশনের উপাত্ত নিয়ে কাজ করা স্কোপাসের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালে ২০৪টি, ২০১৬ সালে ১৮০টি, ২০১৭ সালে ১৯৯টি, ২০১৮ সালে ২২৮টি, ২০১৯ সালে ৩০১টি এবং সর্বশেষ ২০২০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪৭টি গবেষণা নিবন্ধ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও এর মধ্যে মাত্র ১৮৪টি গবেষণা নিবন্ধের লেখক বিশ্ববিদ্যালয়কে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এসব গবেষণা নিবন্ধের মাত্র সাতটি প্রকাশনায় আর্থিক সহযোগিতা করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া বাকি ২৯৯টি নিবন্ধে সরাসরি বাংলাদেশি লেখক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরকে পরোক্ষভাবে প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে।
২০২১ সালের সর্বশেষ তথ্য মতে, ১৮৪টি প্রকাশনা (৪৪.৪৪ শতাংশ) ছাড়াও বাকি প্রকাশনাসমূহে জাহাঙ্গীনগরের গবেষকদের অংশগ্রহণ রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বে পরিচালিত ১৪৫টি প্রকাশনায় জাবির গবেষকরা রয়েছেন। কিছু প্রকাশনায় জাহাঙ্গীরনগর ও অন্যান্য অংশীদারদের সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বুকে দেওয়া তথ্য মতে, এ বছরের ১৮৪টি প্রকাশনার মধ্যে মাত্র সাতটি প্রকাশনায় অর্থায়ন করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ ২০১৯-২০ সালে গবেষণা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয় পাঁচ কোটি টাকা। যা মূল বাজেটের ১.১৫ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালে এ বরাদ্দ ছিল ২.৮ কোটি টাকা। পরে সংশোধন করে তা তিন কোটি করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য মতে, ২০১৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৩৬ জন শিক্ষক ছিলেন। যাদের প্রত্যেকে একটি নির্দিষ্ট গবেষণা ভাতা পান। যেখানে অধ্যাপক ২৮৪ জন, সহযোগী অধ্যাপক ১৭৮, সহকারী অধ্যাপক ২১৬ এবং প্রভাষক ১৫৮ জন। কিন্তু এ বছর শিক্ষক অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিমাণ প্রায় প্রতি দুজনে একটি করে।
জাহাঙ্গীরনগরের গবেষকদের ৪৪৭টি গবেষণা নিবন্ধের মধ্যে প্রায় ৩৪৪টি (৭৮ শতাংশ) জার্নাল নিবন্ধ। বাকিগুলো কনফারেন্স পেপার (৮.৫ শতাংশ), রিভিউ আর্টিকেল (৫.৮ শতাংশ), পত্র (৬.০ শতাংশ) এবং বইয়ের অনুচ্ছেদ (০.৪ শতাংশ) আকারে প্রকাশিত। এ ছাড়া গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রগুলো হলো- মেডিসিনে ১৩.৪ শতাংশ, কম্পিউটার সায়েন্সে ৮.৮ শতাংশ, রসায়নে ৮.৪ শতাংশ, পরিবেশ বিজ্ঞানে ৭.১ শতাংশ, প্রকৌশলে ৬.৩ শতাংশ, ম্যাটেরিয়েল সায়েন্সে ৬.৩ শতাংশ, পদার্থ বিজ্ঞানে ৬.২ শতাংশ, কৃষিতে ৫.৪ শতাংশ, বায়োকেমেস্ট্রিতে ৫.১ শতাংশ, সমাজবিজ্ঞানে ৪.০ শতাংশ এবং অন্যান্য বিষয়ে ২৮.৯ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় গবেষকদের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান, চীন, সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূল অংশীদার ছিল। অন্যদিকে, চিন্তা রিসার্চ বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি প্রধান স্থানীয় অংশীদার ছিল। এ ছাড়া গবেষকরা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়, গণবিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একাধিক গবেষণা নিবন্ধও প্রকাশ করেছেন।
এ গবেষণা প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় উভয় তহবিল সংস্থা জড়িত ছিল। জাতীয় অর্থায়নের সিংহভাগ এসেছে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে।
এগুলো যেসব জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে- মডেলিং আর্থ সিস্টেমস এন্ড এনভায়রনমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড অ্যাডিকশন, হেলিয়ন, এশিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি, ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ, প্লস ওয়ান, জার্নাল অব বায়োমলিকিউলার স্ট্রাকচার অ্যান্ড ডায়নামিক এবং ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন উল্লেখযোগ্য।
সেরা ১৫ গবেষকের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এ এ মামুন। ৩৬টি প্রকাশনা নিয়ে তিনি প্রথম স্থানে রয়েছেন। এ এম হক ১৯টি প্রকাশনা নিয়ে দ্বিতীয়; এফ আহমেদ এবং এম টি সিকদার ১৫টি করে প্রকাশনা নিয়ে তৃতীয়; এম এস কায়সার এবং এম এ উল্লা ১৩টি করে প্রকাশনা নিয়ে চতুর্থ; এম এম রহমান এবং বি সরকার ১২টি করে প্রকাশনা নিয়ে পঞ্চম; এস ই কবির, এ এ মামুন, এম এম রহমান এবং এম এম রহমান ১১টি করে প্রকাশনা নিয়ে ষষ্ঠ; এম এ হোসেন, এস হোসেন, এস ইসলাম, এম শাম্মী এবং এম এস উদ্দিন ১০টি করে প্রকাশনা নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছেন।
গবেষণাপত্র প্রকাশে শীর্ষস্থানে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের শিক্ষার্থী ও চিন্তা রিসার্চ বাংলাদেশের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এতগুলো গবেষণা করেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো ধরনের (উপকরণ বা আর্থিক) সহযোগিতা পাচ্ছি না। উল্টো গবেষক হিসেবে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় নিরুৎসাহিত করছে। অথচ দেশ ও বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্বকারী সব ব্যক্তিত্বকে স্বীকৃতি ও সংবর্ধনা দেওয়া হয়।’
অন্যদিকে, রিসার্চিফাই নামের তথ্য পোর্টালের সূত্র অনুসারে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭৬০টি প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম, ৫১০টি প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) দ্বিতীয়, ৪৫৬টি প্রকাশিত প্রবন্ধ নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তৃতীয় এবং ৪৩৭টি প্রবন্ধ প্রকাশ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
গবেষণার সার্বিক বিষয়ে বিশিষ্ট পদার্থবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিঞা বিজ্ঞান গবেষষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক এ এ মামুন বলেন, ‘আমরা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এগিয়ে আছি। কারণ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলনায় আমাদের শিক্ষক সংখ্যা কম। আমাদের অনেক শিক্ষক আছেন যারা গবেষণা করেন, কিন্তু বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে তা প্রকাশ করতে পারেন না। এ ছাড়া আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বিদেশে পড়ালেখা করেন। তাই তারা সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামেই গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।’
গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্থায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী যদি গবেষণায় ভালো করে এবং সঠিক মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে সহযোগিতা চায়, তবে আমার বিশ্বাস প্রশাসন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিবে।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে মাত্র সাতটি প্রকাশনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গবেষণাপত্র প্রকাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা বা বিড়ম্বনা এর মূল কারণ। এ বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেছি ব্যাপারটি সহজ করার জন্য।’