০৬ অক্টোবর ২০২০, ১০:৪৯

শিক্ষার্থীদের ‘মানসিক বিষন্নতা’ প্রতিরোধে নিরুদ্বেগ জাবি কর্তৃপক্ষ

জাবি ও লোগো  © ফাইল ফটো

বিশ্বমানের বিদ্যা চর্চা হয় যে আলয়ে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে লেখাপড়ার সমান্তরালে চলে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টি, সংস্কৃতিচর্চা, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিতর্ক, আড্ডা ও হৈ-চৈ। অভূতপূর্ব করোনা মহামারি এসে সব সমীকরণই উল্টে দিয়েছে। ছয় মাস ধরে বন্ধ দেশের সংস্কৃতি চর্চার রাজধানী খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। ফলে সবুজ নগরের বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ঘরবন্দি।

করোনার কারণে তারা জীবন বাস্তবতা ও প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রাণবন্ত তারুণ্য সীমাবদ্ধ হওয়ায় অনেকের অস্বাভাবিক মানসিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে অনেক ছাত্র-ছাত্রী মানসিক অবসাদ, বিষন্নতা ও হতাশায় ভুগছেন। হতাশা প্রতিরোধে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত পরিবেশ ও সেবা কোনটিই পাচ্ছে না। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই।

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শিশু ও তরুণদের ওপর কিরুপ প্রভাব ফেলেছে তা জানতে ১৩টি উন্নয়নশীল দেশে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্যা টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে জরিপ পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক শিশুকেন্দ্রিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন। জরিপে দেখা যায়, তরুণরা এই পরিস্থিতে মানসিক বেদনা ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।

মহামারীর সময়ে জীবনে ছন্দপতনের জন্য জরিপে সরাসরি তিনটি কারণ উঠে আসে। এগুলো হল- শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক বেদনা এবং পরিবারিক দারিদ্র্যতা বৃদ্ধি পাওয়া।

নিজ গ্রামে অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের ৪৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান কাদের বলেন, ‘ছুটির সময় ভাবতেও পারিনি এতদিন বাড়িতে থাকতে হতে পারে। আসার সময় হল থেকে বই-পত্র নেওয়া হয়নি সেরকম। বর্তমানে বাড়িতে উদ্দেশ্যহীন ও এলামেলোভাবে দিন কাটাচ্ছি। এর মাঝেই প্রচ্ছন্ন পারিবারিক চাপ ও দায়িত্ব অনুভূতি কাজ করছে। ফলে নিজের ক্যারিয়ার ও শিক্ষাজীবন নিয়ে কঠিন হতাশার মধ্যে দিনানিপাত করছি। এই মাসনিক অবসাদে কারো সাথে মন খুলে কথা বলার পরিবেশও পাচ্ছি না।’

মনোবিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, ‘অনিশ্চিতি ও নিরাপত্তাহীনতায় শিশু কিশোর ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির পর্যায়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। যা আমরা এ দুঃসময়ে হয়তো খেয়াল করছি না। ভাইরাসজনিত ছুটির ফলে শিক্ষার্থীদের অপ্রত্যাশিত ঝামেলা অবলোকন ও অতিক্রম করতে হচ্ছে। স্বভাবতই এসব দেখে তরুণরা ট্রমায় আক্রান্ত হতে পারে। মহামারির বাস্তবতা, মানুষের দুঃখ, কষ্ট দহনের দৃশ্যাবলি অনেককে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত করবে।’

ট্রমা ছাড়াও মনোবিজ্ঞানী ও আচরণবিজ্ঞানীরা সংগনিরোধ ও সামাজিক দূরত্ব থেকে সৃষ্ট বিষন্নতা, ভয়-আতঙ্ক, বিরক্তিবোধ, ক্রোধ, বিচ্ছিন্নতা, নৈঃসঙ্গ, অবহেলা, অবনমন, নিরর্থকতা ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। যা থেকে মানুষের মধ্যে অনিদ্রা, অনীহা, বিরোধ, অবসন্নতা, অসুস্থতা ইত্যাদি তৈরি হয়।

করোনার এই সময়ে ঘরবন্দি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক সংগঠন রোভার স্কাউটের সাথে যুক্ত সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী আকিমুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শুধু পড়ালেখাই করতাম না, টিএসসি ভিত্তিক কিছু সংগঠনেও যুক্ত ছিলাম এবং খেলাধুলা করতাম। ফলে ক্যাম্পাসে পড়ালেখার বাইরে ঘোরাফেরা আড্ডাবাজি ও শিক্ষনীয় অনেক কিছু করতাম। কিন্তু লকডাউনে বাড়িতে বসে কিছুই হচ্ছেনা। ফলে সিরিয়াস মেন্টাল ট্রমার মধ্যে দিন পার করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা ও ব্যক্তিগত সর্ম্পক নিয়ে মানসিক টানপোড়নের মধ্যে দিয়ে সময় যাচ্ছে। এর মাঝে পরিবারের প্রত্যাশার নিজেকে আরো বিষন্ন করে তুলছে। কিন্তু কোন চাকরি নেই, এমনকি চাকরি পরীক্ষা কবে হবে তাও অনিশ্চিত। সবমিলিয়ে মানসিকভাবে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের সহকারি-পরিচালক (মনোবিজ্ঞান) শুভাশীষ কুমার চ্যাটার্জী বলেন, ‘করোনাভাইরাস ও মহামারির কারণে অহেতুক আতঙ্ক, অস্বাভাবিক স্নায়ুচাপ ও শুচিবায়ু জনিত ব্যাপারে লকডাউনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৩টি কেস টেলি যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছি। এগুলোর বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের আর্থিক, পারিবারিক, ক্যাম্পাস সর্ম্পক ও ক্যারিয়ার কেন্দ্রিক হতাশা ও বিষন্নতা ছিলো।’

আরেক সহকারী পরিচালক ইফরাত জাহান (মনোবিজ্ঞান) বলেন, ‘মেয়েরা প্রকৃতিগতভাবে অন্তর্মুখি হওয়ায় তাদের সমস্যা খোলামেলাভাবে বলতে পারছে না। লকডাউনের শুরু থেকে প্রায় ১৩টি টেলিসেবা দিয়েছি। কেসগুলোর বেশিরভাগই হতাশা ও প্রেম সর্ম্পকিত ছিলো। লকডাউনে ফিজ্যিক্যাল ডিসট্যান্সের কারণে তরুণদের মধ্যে সম্পর্কে অবিশ্বাস ও কলহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষন্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

সামগ্রিক উদ্যোগের ব্যাপারে পরিচালক অধ্যাপক আব্দুল মান্নান চৌধুরী বলেন, ‘করোনার কারণে সকল কার্যক্রম অনলাইনভিত্তিক হয়ে যাওয়ায় সকলের কাছে পৌছাঁনো সম্ভব হচ্ছে না। তবে এর মধ্যেও শিক্ষার্থীদের মানসিক অবসাদ ও বিষন্নতার বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে আমরা সামগ্রিক কর্মসূচি হাতে নেবো।’

এদিকে অদূর ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ নিয়েও জাবি শিক্ষার্থীরা আছে উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে। কারণ প্রথম বর্ষ থেকে শুরু করে সদ্য পাস করা সবাই নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবেন। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে আবাসন ও পরিবহন সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি, ক্লাসরুম ও পাঠাগার সংকট, অবাধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, আগের মতো প্রাণখোলা আড্ডা-গল্পে সীমাবদ্ধতা এবং সেই সঙ্গে চাকরি পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব, মানসিক সমস্যা প্রভৃতি অন্যতম।

এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনলাইনে ক্লাস শুরু করতে পারলেও তারা শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা যাচাই করতে সক্ষম হয়নি। এ অবস্থায় ক্লাসের সাথে আমাদের সাইকোলজি ঠিক রাখার জন্য অনলাইনে মেন্টাল নার্সিং এর প্রোগ্রাম শুরু করতে হবে।