জাবির ল্যাবরেটরিতে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্টের শঙ্কা
সাধারণত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দুই মাসের অধিক অব্যবহৃত থাকলেই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়, কর্মদক্ষতাও হ্রাস পায়। করোনা মহামারিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) বন্ধ ছয় মাসের অধিক। ফলে দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত রয়েছে প্রতিটি বিভাগের কম্পিউটার ল্যাব, বিভাগ-ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি, ওয়াটার রিসার্চ সেন্টার ও ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র।
এসব ল্যাবরেটরিতে উচ্চমানের কম্পিউটার ও দামি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, গবেষণার বিশেষ যন্ত্রপাতি এবং ভারী রাসায়নিক পদার্থ মজুদ রয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত হওয়াই যন্ত্রপাতিসমূহ পরিত্যক্ত অবস্থায় নষ্টের আশঙ্কা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
ল্যাব সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দুইশ’র বেশি কম্পিউটার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। ক্যাম্পাস বন্ধের ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এগুলো ব্যবহার করছে না। এ অবস্থায় বিভাগের কর্মচারীরা কম্পিউটার ও ডিভাইসগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখেই তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। ফলে ডিভাইসসমূহ অব্যবহৃত হয়ে নষ্টের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আইআইটিতেও একশ’র বেশি কম্পিউটার ও একটি বিশেষায়িত ল্যাব রয়েছে। বিশেষায়িত ল্যাবের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অব্যবহৃত রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইসসমূহ। অন্যদিকে বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের বিশেষায়িত গবেষণাগারে প্রায় ২৫ ধরনের ভারী যন্ত্রপাতি থাকলেও শুধুমাত্র রেফ্রিজারেটরগুলো চালু রয়েছে। কার্যক্রম না থাকায় অন্যান্য যন্ত্রগুলো বন্ধ অবস্থায় সপ্তাহান্তে দুইদিন পরিষ্কার করা হয়।
এতে ডিভাইসসমূহ ঠিক রয়েছে কিনা তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এদিকে রসায়ন বিভাগের ল্যাবগুলোতে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা না আসায় ল্যাবগুলো বন্ধ রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। এ অবস্থায় পিয়ন ও কর্মচারীরা ল্যাব দেখাশোনা করছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাসায়নিক পদার্থ ও যন্ত্রপাতিসমূহ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটার রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খবির উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ভারী যন্ত্রপাতি রয়েছে ওয়াজেদ মিয়া গবেষণা কেন্দ্রতে, ওয়াটার রিসার্চ সেন্টার ও কিছু বিভাগের বিশেষায়িত ল্যাবে। এসব যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরিচর্যা না করলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই নষ্টের সম্ভাবনা রয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কারখানার সিনিয়র নির্বাহী প্রকৌশলী (যন্ত্র) গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘যদি ছয় মাস ধরে কম্পিউটার, প্রিন্টার, প্রজেক্টর, রেফ্রিজারেটর ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস একটানা বন্ধ থাকে তবে ডিভাইসের নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তবে নিয়মিত বিরতিতে যন্ত্রগুলো চালু রাখলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায়।’
এদিকে ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘লকডাউন চলাকালীন তিন মাস আমাদের গবেষণা কেন্দ্র বন্ধ ছিলো। এতে যন্ত্রপাতি নষ্টের আশঙ্কা দেখা দিলে পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তির অভাব সত্ত্বেও মেইনটিনেন্সের জন্য আবারো খোলা হয়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে কাজ চলছে। আরো দুই সপ্তাহ লাগবে। এছাড়া কিছু যন্ত্রপাতি শুধু সেটআপ অবস্থায় রয়েছে বিশেষজ্ঞের অভাবে। সেগুলোর কি অবস্থা তা বলা যাচ্ছে না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউটে ন্যূনতম ১০টি কম্পিউটারের সমন্বয়ে একটি করে কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। এসব ল্যাবে গবেষণার জন্য রয়েছে বিশেষ ধরনের ভারী ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও যন্ত্রপাতি। এমনকি প্রতিটি বিভাগের ক্লাসরুমে রয়েছে দামি ইলেকট্রনিক প্রজেক্টর। এসব যন্ত্রপাতির বাজার মূল্য কয়েক কোটি টাকার ওপরে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
করোনা প্রতিরোধে বিগত ১৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সাথে বন্ধ হয় এসব গবেষণাগারও। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত হওয়াই পরিত্যক্ত হয়েছে গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি। গবেষণাগারে এগুলো সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিও সজাগ নয় এসব দামি যন্ত্রপাতিসমূহের তত্ত্বাবধানে। বর্তমানে সপ্তাহে দুদিন (রবিবার ও বুধবার) অফিস শুরু হলে আবারো সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে তা মেইনটিনেন্সের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মত সংশ্লিষ্টদের। ফলে মহামারি সময়ে ঝুঁকির মুখে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।
এ বিষয়ে রসায়ন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক নূরুল আবছার বলেন, ‘লকডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভাগের ল্যাব অনেক দিন বন্ধ থাকায় দুটি যন্ত্র নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও কিছু বিস্ফোরক বিপজ্জনক পর্যায়ে উন্নীত হলেও শেষ পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণের কারনে বড়ো বিপদ হতে রক্ষা হয়েছে। তবে বর্তমানে বিভাগের বিশেষায়িত ল্যাবের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চললেও রাসায়নিক পদার্থ ও যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে বিপদের সম্ভাবনা নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওয়াজেদ মিয়া গবেষণাগারে প্রায় দশ কোটি দামের তিনটি প্রধান মেশিন সেটআপ অবস্থায় থাকাকালে নষ্টের হাত থেকে শেষ পর্যায়ে গিয়ে রক্ষা পেয়েছে। লকডাউনের মধ্যেই বিদেশী টেকনিশিয়ানের সাথে ভিডিও কনফারেন্সের সাহায্যে এসব যন্ত্রপাতির যান্ত্রিক ত্রুটি দূর করা হয়। এছাড়াও আরো প্রায় ১৫ কোটি মূল্যমানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মেইনটিনেন্স এর কাজ চলমান রয়েছে।’
আইআইটি’র পরিচালক অধ্যাপক এম মেসবাউদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমাদের বিশেষায়িত ল্যাবের দায়িত্বে একজন শিক্ষক রয়েছে। আইসিটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই ল্যাবের কার্যক্রম প্রায় ছয় মাসের অধিকসময় ধরে বন্ধ রয়েছে এক্সর্পাটের অভাবে ও করোনার কারণে। তবে যন্ত্রপাতি সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। এছাড়াও কম্পিউটার ল্যাবে প্রতি সপ্তাহেই (রবিবার ও বুধবার) ল্যাব অ্যাটেনড্যান্টসরা এসে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করেন। তবে ডিভাইস সমূহের ব্যাপারে আমরা নিয়মিত খোজঁ খবর রাখি।’
বিশেষায়িত ল্যাবসমূহের যথাযথ সংরক্ষণের ব্যাপারে গাণিতিক ও পদার্থ বিষয়ক অনুষদের ডিন অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার, ‘এটার দায়-দায়িত্ব অনুষদ কর্তৃপক্ষের হাতে নেই। এর দায়ভার সম্পূর্ণ বিভাগীয় প্রধানদের।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক অধ্যাপক আমির হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগীয় সভাপতিকে এ মর্মে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এরপরেও দেখা যাচ্ছে কিছু ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যাতয় ঘটছে, যা প্রত্যাশিত নয়। নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধান ছাড়া আমাদের আসলে করার কিছুই নেই। তবে এব্যাপারে নতুন করে প্রশাসন অ্যালার্ম দেওয়ার চেষ্টা করবে।’