৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের চেতনার মূর্ত প্রতীক জাবির দুই হল
মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দুটি আবাসিক হল। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত শহীদ সালাম-বরকত হল এবং ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত শহীদ রফিক-জব্বার হল। শুধু আবাসিক সুবিধার স্থান নয়, এই হল দুটি ভাষা আন্দোলনের চেতনা, আত্মত্যাগ ও বাংলা ভাষাভাষী এদেশের মানুষের গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে প্রতিনিয়ত নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদ আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুর রফিক ও আবদুল জব্বারের আত্মত্যাগ বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। সেই আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই দুই হলের নামকরণ করে। ফলে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই নামের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের নতুন করে পরিচিত করার প্রয়াস পায়। বৃদ্ধি পায় নিজের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও আগলে রাখার প্রবনতা।
প্রত্যেক ভাষার নিজস্বতা আছে তা স্বীকার করে নেওয়া বা স্বীকৃতি দেওয়ার মাঝেই ভাষা আন্দোলনের মূলমন্ত্র লুকায়িত। ভাষা আন্দোলনে সালাম-বরকতদের চেতনা নিজের ভাষার প্রতি অটুট অটলতা এবং ভাষা হিসেবে প্রত্যেক বুলির নিজস্বতা স্বীকারের শিক্ষা। তারা প্রমাণ করেছে দেহ থেকে রক্ত জড়ানো যায় কিন্ত মায়ের শেখানো বুলি কেড়ে নেওয়া যায় না।
ভাষা শহীদের স্মরণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মিত হলের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পর্কে শহীদ সালাম-বরকত হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল হালিম বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মহান শহীদদের স্মরণে এই হলের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম ও আবদুল বরকত-এর আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়, আর তাদের নামেই হলটির প্রতিষ্ঠা আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।’
আব্দুল হালিম আরও বলেন, ‘হলের প্রধান ফটকে স্থাপিত স্মৃতিচিহ্ন শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণের অনুপ্রেরণা দেয়।’ ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনই জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার পথ সুগম করেছিল।’
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শহীদ সালাম বরকত হলের শিক্ষার্থীরা শহীদদের আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের গড়ে তুলবে এবং শহীদদের স্মৃতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে চিরকাল অম্লান থাকবে।
শহীদ রফিক জব্বার হলের প্রাধ্যক্ষ ড. আব্দুছ ছাত্তার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ সারা বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে, যা ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলা ভাষাই একমাত্র ভাষা যার জন্য মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভাষা শহীদ আবদুর রফিক, আবদুল জব্বার, সালাম ও বরকতসহ সকল শহীদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ বাংলা ভাষা বিশ্বদরবারে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ভাষা শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা, সেমিনার, মিলাদ মাহফিল ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা উচিত। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম শহীদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে এবং তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাষা শহীদদের নামে প্রতিষ্ঠিত হলগুলো থেকে যখন শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করা হয়, তখন তাদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ভাষা শহীদদের পরিবারের সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মাননা প্রদান করলে তা শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।’
অধ্যাপক আব্দুছ ছাত্তার আশা প্রকাশ করেন, ‘ভাষা শহীদদের স্মরণে আরও ব্যাপক ও ভাবগম্ভীর কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে তাদের আত্মত্যাগের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।’
৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ ছিল না যা রুপ নিয়েছে সকল ভাষার জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি হিসেবে। ৫২'এর ভাষা আন্দোলন মুক্ত করে গেছে পৃথিবীর সকল অজানা বুলিকে আর সেই চেতনাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে দিতে মূর্ত প্রতীকের ন্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহীদ সালাম-বরকত হল ও শহীদ রফিক-জব্বার হল।