০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:২৩

গণভোট ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছুটি নিয়ে অসন্তোষ; রাবি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

রাবি লোগো   © টিডিসি সম্পাদিত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে রাজনৈতিক আগ্রহ ও জন আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছুটির সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাত্র দুই দিনের ছুটি ঘোষণা করায় ভোটাধিকার প্রয়োগ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। অনেক শিক্ষার্থীর ভোটকেন্দ্র নিজ নিজ জেলা বা নিজ এলাকা হওয়ায় সেখানে গিয়ে ভোট দিতে সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মাত্র দুই দিনের ছুটিতে দূরবর্তী এলাকায় যাতায়াত করে সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে, অনানুষ্ঠানিকভাবে ৯ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত পরীক্ষা বন্ধ থাকার কথা জানানো হলেও বাস্তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অফিসিয়ালি মাত্র দুই দিনের ছুটির ঘোষণা দিয়েছে। এ সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও হতাশা আরও বেড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও যাতায়াত পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম সাগর বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার তিনটি ডামি নির্বাচনের পর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৮-৩০ বছর বয়সি তরুণরা, যারা আগের নির্বাচনগুলোতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, এবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। গণভোট থাকায় নির্বাচনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলেও দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও রাবি জাতীয় স্বার্থে দুই দিনের বেশি ছুটি দিতে পারেনি এটি দুঃখজনক।

ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী বাঁধন বিশ্বাস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলেও মাত্র দুই দিনের ছুটির সিদ্ধান্ত তাদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত করছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়ি যাওয়া কঠিন হওয়ায় তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছে না। এতে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী আর-রাফি সিরাজী অন্তর বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুই দিনের বন্ধ শিক্ষার্থীদের গণভোটসংক্রান্ত প্রচারণাকে সীমিত করতে পারে, বিশেষত যাদের নির্বাচনি এলাকা ক্যাম্পাস থেকে দূরে। স্বল্প সময়ের কারণে সরাসরি আলোচনা ও সচেতনতা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও অনলাইন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আংশিক কার্যক্রম সম্ভব, তবুও এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সমাজকর্ম বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী আলিউল আজিম বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘোষিত দুই দিনের ছুটি যুক্তিসঙ্গত নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য দূরত্ব, যাতায়াতের সময় ও ব্যয় বিবেচনায় এ ছুটি অপর্যাপ্ত। পাশাপাশি নির্বাচনপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের জীবন ও নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের উচিত ছুটির সময়সীমা আরও বাড়ানো।

এদিকে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কেউ নয়। দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, অথচ বড় ও গ্রহণযোগ্য স্টেকহোল্ডারদের এলাকায় যাওয়ার ছুটি না দেওয়া বেইনসাফি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এলাকার ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বেশি তাদের নিজ নিজ এলাকায় ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়া জরুরি। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলা হলেও তারা রাজি হয়নি; তবে ৮ তারিখের পর বিভাগগুলোতে পরীক্ষা না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ এলাকায় গেলে অ্যাটেনডেন্স নিয়ে পরবর্তীতে কোনো বিভাগ একাডেমিক হেনস্তা করলে তিনি প্রতিবাদ ও সমাধান করবেন। পাশাপাশি তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকার আহ্বান জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ফাহিম রেজা তার ফেসবুক পোস্টে প্রশাসনের সমালোচনা করে বলেন, নকীব প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ‘বাটপারি’ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্লাস-পরীক্ষার চাপ দিয়ে তাদের এলাকায় যেতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আর্থিক সক্ষমতা না থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প ছুটিতে বাড়ি যাওয়া বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, গণভোট উপলক্ষ্যে কোনো ধরনের বন্ধ দেওয়া হয়নি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বন্ধটা দেওয়া হয়েছে ভোটের জন্য। আর আমরা ৮ তারিখের পর থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত পরীক্ষা বন্ধ রেখেছি। 

বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের নেতিবাচক মন্তব্য কোন দৃষ্টিতে দেখছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আমরা কোনো দৃষ্টিতেই দেখছি না। আমরা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ছুটিতে গেছি।