২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৭

প্রো-ভিসির ‘অ্যাগ্রেসিভ আচরণ’ দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, দুঃখপ্রকাশের আগেই শুরু সংঘর্ষ

  © সংগৃহীত

ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বর্তমান প্রশাসন অধিভুক্ত সাত কলেজের সংকট নিরসন সুন্দরভাবেই সমাধানের পথে ছিল। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে করে দেওয়া কমিটি নিয়ে কাজও চলছিল। সর্বশেষ রবিবার (২৬ জানুয়ারি) সাত কলেজের অধ্যক্ষ ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন-ইউজিসিতে সংস্থাটির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকও ছিল। সেখানে ফলপ্রসূ আলাপও হয়েছিল বলে সভা সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলছেন, একইদিন বিকেলে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব কলেজের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা ঢাবির প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে দেখা করতে গেলে তাদের সঙ্গে তিনি ‘অ্যাগ্রেসিভ আচরণ’। এরপর সেখানেই শুরু হয় হট্টগোল। পরে প্রো-ভিসি আলোচনা না করেই এসব শিক্ষার্থীদেরকে তৎক্ষণাৎ করে বের করে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবসহ একাধিক সড়কে অবরোধ করেন তারা।

এ ঘটনার ধারণ করা একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে বলতে শোনা যায়, তোমরা এখানে এসে মব তৈরি করতে পারো না। আমি বলেছিলাম তোমরা দুইজন এসো। কিন্তু তোমরা দলবল নিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছো। তখন একজন শিক্ষার্থীকে বলতে শোনা যায়, আপনি আমাদের প্রতি এতো অ্যাগ্রেসিভ হচ্ছেন কেন? তখন ড. মামুন বলেন, অ্যাগ্রেসিভ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

এ ঘটনার পর প্রো-ভিসি কার্যালয় থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় ৬টার দিকে সায়েন্স ল্যাব অবরোধ করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এরপর শাহবাগ, মিরপুর টেকনিক্যাল ও তাঁতিবাজার মোড়েও কিছু সময়ে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।

যে দাবিগুলো নিয়ে তারা প্রো-ভিসির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, সেগুলো হলো- ২০২৪-২৫ সেশন থেকেই সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো যাবে না, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হবে, নেগেটিভ মার্ক যুক্ত করতে হবে, সাত কলেজের ভর্তি ফির স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাবি ব্যতীত নতুন অ্যাকাউন্টে ভর্তি ফির টাকা জমা রাখতে হবে।

সায়েন্স ল্যাবে অবরোধকালে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, পাঁচ দাবিতে তারা ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি দুর্ব্যবহার করেন। আমাদের অপমান করে বের করে দেয়। এখন শিক্ষার্থীদের নিকট ক্ষমা চাওয়াসহ সবগুলো দাবি রাতের মধ্যে মেনে নিতে হবে। না মানলে রাস্তা ছাড়ব না।

এদিকে, রাত ১০টার দিকে ক্ষমা না চাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রো-ভিসির বাস ভবন ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেন। পরে ১১টার দিকে সায়েন্স ল্যাব থেকে নীলক্ষেত হয়ে ঢাবির মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা। এসময় স্যার এ এফ রহমান হলের দিকে ঢাবি শিক্ষার্থীরা অবস্থান করলে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর পরই নীলক্ষেত এলাকায় শুরু হয় দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, দুই পক্ষের এই সংঘর্ষ শুরুর আগে রাত ১০টার দিকে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদকে ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করতে বলেছিল। তবে তিনি সে সময় সেটা করেননি। যদিও ড. মামুন রাত ১২টার দিকে শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষ সংর্ঘষ জড়ানোর পর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য এক ভিডিও বার্তা আন্তরিকভাবে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রাত ১০টার দিকে তিনি এই দুঃখপ্রকাশ করলে দু’পক্ষ সংর্ঘষ জড়ানো এড়ানো যেত। তার এই দূরদর্শিতার অভাবে সংর্ঘষ বড় ধরনের রূপ নেয়।

তবে ১২টার দিকে ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও বার্তায় প্রো-ভিসি বলেন, ‘গতকাল সন্ধ্যায় ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে আমার অফিসে আলোচনাকে কেন্দ্র করে রাতে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে তা দুঃখজনক। এতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমি বিশ্বাস করি, সুষ্ঠু পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই ভুল বোঝাবুঝি অবসান ঘটবে’। 

তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সব পক্ষকে ধৈর্য ধারণ করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাচ্ছি’। 

এদিকে, এ ঘটনায় সোমবারের (২৭ জানুয়ারি) ঢাবির সকল পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। রবিবার দিনগত রাত দুইটার দিকে এক বার্তায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম পঠানো এক বার্তায় বলা হয়, অনিবার্য কারণবশত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে। 

পরে রাত ৩টার দিকে এক বিবৃতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান ক্যাম্পাসে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত।বিবৃতিতে তিনি ধৈর্য ধারণ এবং সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান। 

বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশ এক ক্রান্তিকাল  অতিক্রম করছে। এই অবস্থায় কোন তৃতীয় পক্ষ যাতে সুযোগ নিতে না পারে সে ব্যাপারে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।

উপাচার্য আরও বলেন, আজ ২৭ জানুয়ারি অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের অধ্যক্ষগণের সঙ্গে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হবে। যে সকল বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।