সপ্তদশ শতকের অনন্য স্থাপত্য রমনার শিববাড়ি মন্দির
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় গুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উপাসনালয় হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শিববাড়ি মন্দির। যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাম্প্রদায়িক নীতির পরিচয়কেই ধারণ করে।
মন্দিরটি সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬০৬-১৬২৮খ্রি. এর মধ্যে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। বার বার সংস্কারের ফলে একদিকে যেমন এর স্থায়ীত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে অন্যদিকে এটি এর আদি বৈশিষ্ট্যও হারাচ্ছে। যার ফলে, পরবর্তী কালের স্থাপত্যের সংযুক্তি ফলে সঠিক নির্মাণ কাল নির্ণয় করা কঠিন। প্রায় তিন বিঘা জমিতে অবস্থিত এই মন্দিরটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন স্থানে এখনো ঠাঁয় দাড়িয়ে কালের সাক্ষী হয়ে।
মন্দিরের প্রধান সেবায়েত স্বামী হরিহরানন্দ জানান, ’পূর্বে রমনা থানা জুড়েই এই মন্দিরের সম্পত্তি বিস্তৃত ছিলো। কালক্রমে মন্দিরটি তার জমির পরিমাণ হারিয়ে ফেলে।’
মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ১১০ ফুট, প্রস্থ ৫২ ফুট, উচ্চতা ৩৫ ফুট এবং আয়তন ৫৫০০ বর্গফুট। মন্দিরের প্রবেশ পথ দুটি; একটি পূর্ব দিকে এবং অন্যটি মন্দিরের পশ্চিম দিকে; পশ্চিম দিকের প্রবেশ পথটি কেবলমাত্র প্রধান উৎসবের সময় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পূর্ব দিকের প্রবেশ পথ খোলা থাকে সবসময়।
আরও পড়ুন:
মন্দিরটির সামনে একটি বিশাল পুকুর রয়েছে যা পূর্বে মন্দিরের অধীনে থাকলেও বর্তমানে তা আর নেই। অযত্ন এবং অবহেলায় পুকুরটি আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে এটি তার পূর্বের আকৃতি হারিয়েছে। মন্দিরের ভবনটি ইংরেজি এল (L) অক্ষরের আকৃতিতে নির্মিত।
মন্দিরের প্রথম অংশে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের সমাধি কক্ষ। এটি ব্রজানন্দের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো। এ কক্ষের অভ্যন্তরে পাচঁটি কুলুঙ্গি আছে যাতে প্রদীপ জ্বালানো হয়। দ্বিতীয় কক্ষটি নাটমন্দির; এর সাথেই ক্ষুদ্র একটি কক্ষে মূল শিব লিঙ্গটি স্থাপন করা হয়েছে। আর তৃতীয় অংশে সমাধি মন্দির; সাধক পুরুষদের সমাধি রয়েছে এখানে।
মন্দিরটিতে শিব লিঙ্গ পাথরটি এখনো রক্ষিত আছে। এ শিব লিঙ্গ পাথরটির জন্যই এ মন্দিরটির নাম শিববাড়ি মন্দির। শিব মন্দিরটি শিখর রীতিতে নির্মিত। মন্দির ভবনটি ক্রমহ্রাসমান এবং শীর্ষে গিয়ে একটি বিন্দুতে সমাপ্ত হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গণে দুটি সমাধি আছে,সমাধিতে যে দু জন সমাহিত আছেন এদের একজন শ্রী শ্রী বুড়াশিবের সেবক শ্রী মনিজানন্দ। যিনি ১৩৭৫ বঙ্গাব্দের ১৩ মাঘ দেহ ত্যাগ করেন। অন্যজন তার স্ত্রী বলে ধারনা করা হয়।
প্রচলিত আছে, স্বামী ব্রজানন্দ সরস্বতী তীর্থ ভ্রমণে এখানে আসেন মতান্তরে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে এখানে আসেন এবং বটবৃক্ষের নিচে একটি শিব লিঙ্গ খুঁজে পান। দীর্ঘদিন বটগাছের তলায় স্থানীয় জনসাধারণ শিবলিঙ্গটিকে পূজা করে। পরবর্তীতে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে ঝড়ে বটগাছটি উপড়ে গেলে বর্ধমানের রাজা একটি একচালা শিবমন্দির নির্মাণ করেন। কালক্রমে এতে একটি পঞ্চরত্ন মন্দিরের আকৃতি পায়। মন্দিরটি একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন হওয়ায় এটি নিয়মিত সংস্কারের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার দাবি দর্শনার্থীদের।