১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৭

ঘুষে দণ্ডিত হয়েও পদোন্নতি, স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া ইউজিসি পরিচালকের অনিয়মের পাহাড়

রেজাউল করিম হাওলাদার  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পরিচালক পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া মো. রেজাউল করিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। বাজেট পর্যালোচনার নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকে জোরপূর্বক সম্মানী ও উৎকোচ গ্রহণ, সরকারি অনুদানের অব্যয়িত অর্থ নির্ধারিত সময়ে কোষাগারে জমা না দেওয়া এবং ব্যাংকে রেখে সুদ আয়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়; ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে পূর্বে শাস্তিপ্রাপ্ত হলেও পরবর্তীতে ‘যাদুর কাঠির বলে’ পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক হন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তীতে অডিট আপত্তিসহ পেনশন পেতে সমস্যা হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন তিনি বলে জানা গেছে।

গত ৪ জানুয়ারি ইউজিসি পরিচালকের পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেন রেজাউল করিম হাওলাদার। ইউজিসি সচিব বরাবর জমা দেওয়া আবেদনে তিনি জানান, ‘১৯৯৬ সালে কমিশনের শাখা প্রধান পদে যোগদান করি। আমার সর্বমোট চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় আমি পারিবারিক কারণে ৫ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ন থেকে স্বেচ্ছায় অবসরগ্রহণে ইচ্ছুক। নিয়মানুযায়ী আমার স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ অনুমোদনপূর্বক ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন ভাতা, আনুতোষিক ভাতা ও জি পি ফান্ডের অর্থ পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজেট পর্যালোচনার নামে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসি কার্যালয়ে ডেকে সভা করতেন এই কর্মকর্তা। ইউজিসি কার্যালয়ের সভায় সম্মানী নেওয়ার নিয়ম না থাকলেও ব্যতিক্রম ছিলেন রেজাউল করিম হাওলাদার। অফিসে বসে সভা করতেও সম্মানী নিতেন তিনি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বৃদ্ধি করতে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮ থেকে ২০২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট, মূল বাজেট এবং প্রক্ষেপণ বাজেট প্রস্তুতকরণের জন্য তিনি ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন সম্মানী হিসেবে। অতিরিক্ত বাজেটের কারণে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীতে বড় নিয়োগ দিয়েছিল। এই নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে দুদক মামলা করেছিল।

শুধু তাই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সরকারি অনুদানের (জিওবি) ছাড়কৃত অর্থের অব্যয়িত ৯৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা কোষাগারে জমা দেয়নি ইউজিসি। ইউজিসির ২০২২-২০২৩ ও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেটে এই কাজ করতে সহযোগিতার অভিযোগ আছে রেজাউল করিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের মুনাফা পেতে এমন কাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিষয়টি অডিট আপত্তি জানিয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম অর্থ কমিটির একটি সভাকে তিনটি সভা দেখিয়ে তিন দিনের সম্মানী নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউজিসির অর্থ ও হিসাব শাখার সদ্য সাবেক পরিচালক রেজাউল করিম হাওলাদার। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একটি কুচক্রী মহল আমার সম্মান নষ্ট করতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। ইউজিসিতে থাকাকালীন আমাকে জামায়াতের ট্যাগ দেওয়া হত। আমি আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী নই। ঘুষ গ্রহণের জন্য যে শাস্তি আমাকে দেওয়া হয়েছিল সেটি মূলত ওই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।’

ঘুষ গ্রহণের শাস্তি পাওয়ার পর ওই একই সময়ে কীভাবে প্রমোশন পেলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানকেও (বিএনপি চেয়ারম্যান) শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনি যেভাবে শাস্তি পেয়েছিলেন, আমাকেও সেভাবেই শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।’

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ কমিটির সভা থেকে সম্মানী নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না দাবি করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অর্থ কমিটির সভা অনলাইনে হয়েছিল। ওই সময় আমি পরিচালকের দায়িত্বে ছিলাম না।’ যদিও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯তম অর্থ কমিটির সভার সময় ইউজিসির অর্থ ও হিসাব শাখার দায়িত্বে তিনিই ছিলেন বলে ইউজিসির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

৯৮ কোটি টাকা অন্য ব্যাংকে রেখে মুনাফা নেওয়ার বিষয়ে রেজাউল করিম হাওলাদার বলেন, ‘পরিচালকের এসব কাজ করার কোনো ক্ষমতা থাকে না। ইউজিসি চেয়ারম্যান এবং অর্থ ও হিসাব শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য এগুলো করতে পারেন। আমি কেবল তাদের নির্দেশনা প্রতিপালন করেছি।’

ঘুষের অভিযোগে দণ্ড, তবুও পদোন্নতি

অনুসন্ধানে জানা গেঝে, ২০১৯ সালে নিজ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের কথা বলে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদা নিয়েছিলেন রেজাউলি করিম হাওলাদার। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ইউজিসিতে অভিযোগ দিলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে হলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। 

ইউজিসির ১৫৯তম কমিশন সভায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রেজাউল করিম হাওলাদারের একটি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করা হয়। তবে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পুনর্বহাল করা হয়। পরবর্তীতে ১৬০তম পূর্ণ কমিশন সভায় তার আপিল আবেদন বিবেচনা করে বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হলেও বরখাস্তকালীন সময়কে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন ইউজিসির তৎকালীন সচিব ফেরদৌস জামান।

গুরু অপরাধে তুলনামূলক লঘু দণ্ড দেওয়ার পরই তাকে পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে কমিশনের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউজিসিতে থাকা সদস্য এবং সচিবের সহযোগিতায় অপকর্ম করেও পার পেয়েছেন তিনি।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ইউজিসির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইউজিসির দরবেশ খ্যাত এই পরিচালক অনেকটা প্রকাশ্যেই অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতেন। অফিসের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্মশালায় রিসোর্সপার্সন হিসেবে অংশ নিতেন। কর্মশালার সব সেশন তিনি একাই পরিচালনা করতেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কর্মশালা আয়োজন করতে বাধ্য করতেন। অফিস অনুমতির ঝামেলা এড়াতে তিনি কর্মশালা আয়োজনের জন্য শুক্র ও শনিবারকে বেছে নিতেন। চাহিদামতো অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হলে বাজেট পর্যালোচনা সভাগুলোতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নানাভাবে নাজেহাল করতেন। 

৯৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে সরকারি অনুদানের (জিওবি) অব্যয়িত অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে রেজাউল করিম হাওলাদারের বিরুদ্ধে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে ছাড়কৃত অর্থের অব্যয়িত অংশ অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা হয়েছে।

তবে ২০২২-২০২৩ ও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ইউজিসির অনুকূলে ছাড়কৃত অর্থের মধ্যে ৯৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা কোষাগারে জমা না দিয়ে অন্য ব্যাংক হিসাবে রেখেছিলেন অর্থ ও হিসাব বিভাগের সাবেক পরিচালক রেজাউল করিম হাওলাদার। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকে রাখা এ অর্থ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা সুদ পেয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে ইউজিসিতে অডিট পরিচালনার সময় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানায় শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর।

রেজাউল করিম হাওলাদারের এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ এবং সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলামকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।