ঢাবির ‘খ’ ইউনিটে পাস করলেই হবে না, মেধাক্রমও গুরুত্বপূর্ণ

রবিউল ইসলাম
রবিউল ইসলাম  © টিডিসি ফটো

প্রিয় ভর্তিচ্ছু ভাই-বোনেরা। বিগত বছর করোনা পরিস্থিতির জন্য তোমাদের সেশন জটের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বল্প সময়ে নতুন পাঠ্যক্রম সাজানো হয়েছে এবং তোমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ৪ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। হয়তো এ মুহূর্তে তাই রাত-দিন ভুলে গিয়ে বইয়ের মধ্যে ডুবে আছো তোমরা। স্বপ্নের হাতছানিতে সাড়া দিতে হবে যে! ভর্তি পরীক্ষার জন্য হাতে সময় খুবই কম। এই কম সময়ের মধ্যেও কিভাবে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া যায় সে বিষয়েই আজকে আলোচনা করবো।

প্রথমেই ভর্তি পরীক্ষার মানবন্টন সম্পর্কে জানা জরুরী। পরীক্ষার মোট নাম্বার ১০০ থাকবে। এর মধ্যে এমসিকিউ (বহু নির্বাচনী প্রশ্ন) পরীক্ষার নম্বর ৬০, অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষার মোট নম্বর থাকবে ৪০। এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষার জন্য আলাদাভাবে ৪৫ মিনিট বরাদ্দ থাকবে। সুতরাং, সময় ব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে পারাটা অত্যন্ত জরুরী।

তোমাদের জন্য দুঃখের বিষয় এবার ‘খ’ ইউনিটে আসন সংখ্যা কমিয়ে ১৭৮৮ এ নামিয়ে আনা হয়েছে। তাই  এই ইউনিটে চান্স পাওয়া অনেকটা কঠিন ও খুবই প্রতিযোগিতামূলক হবে। কারণ, পরীক্ষার্থীকে এমসিকিউ ও লিখিত অংশে আলাদা আলাদাভাবে পাস করতে হবে ও মোট ৪০ নম্বর অবশ্যই পেতে হবে।

তবে, শুধু পাস করলেই হবে না মেধাক্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাস মার্কের থেকে আরো বেশি কিছু মার্কস অবশ্যই ভালো মেধাক্রম নিশ্চিত করবে। দিকনির্দেশনা পর্ব শেষে এখন প্রস্তুতি পর্বে যাওয়া যাক। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় প্রথমে আসে বাংলা, তাই বাংলা দিয়েই শুরু করি।

বাংলা

বাংলায় বহুনির্বাচনি ১৫টি প্রশ্নের জন্য ১৫ নম্বর এবং পাস মার্ক ন্যূনতম ৫। ‘খ’ ইউনিটের প্রশ্ন বরাবরই পাঠ্য বইয়ের ভেতর থেকে আসে এবং প্রশ্নগুলো কিছুটা অনুধাবনমূলক হয়। তাই ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে হলে পাঠ্য বইয়ের বিকল্প নেই।

পাঠ্য বই পড়ার সময় প্রথমে সংশ্লিষ্ট গদ্য বা পদ্যের লেখক পরিচিত অংশটা দাগিয়ে পড়বা, জন্ম মৃত্যু ও সাহিত্য কর্মগুলো দাগিয়ে রাখবা এবং শব্দার্থ-টিকা ও পাঠ পরিচিত ভালো করে পড়তে হবে যেটা তোমাকে লিখিত বিষয়েও সাহায্য করবে। কবিতার গুরুত্বপূর্ণ লাইন দাগিয়ে নেবে এবং গল্প বা কবিতায় ব্যবহৃত  বিদেশি শব্দ গুলোর উৎস লিখে রাখবে।

নাটক-উপন্যাস অংশটা তোমরা বরাবরই এড়িয়ে চলো কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার জন্য এই অংশটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তোমরা জানো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ২০২০-২১ সেশনে সহপাঠ অংশ থেকে ৪ টা প্রশ্ন করা হয়েছে তাই একটুও অবহেলা করা উচিত নয়। নাটক বা উপন্যাস পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ লাইন উদ্বৃতি নোট করে রাখবা কোন সংলাপটি কে করেছেন একটু খেয়াল করে পড়বা এবং ভূমিকা অংশ ও প্রত্যেকটি চরিত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।

আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে নেমেছেন, তথ্যগুলো নোট করছেন তো?

ব্যাকরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক থেকে প্রতি বছরই প্রশ্ন আসে। সমাস, সন্ধি প্রকৃতি ও প্রত্যয়, বাগধারা ও এককথায় প্রকাশ অন্যতম। এগুলোর উপরে ভালো দখল রাখতে হলে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ নামক বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বই থেকে ভর্তি পরীক্ষার টপিকগুলোর বেসিক ধারণা নেওয়ার সাথে সাথে উদাহরণগুলো ভালো করে দেখতে হবে।

ইংরেজি

বলা হয়ে থাকে ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ জন অংশগ্রহণ করলে তার ৯০ জন শুধুমাত্র ইংরেজিতে ফেল করে। তার কারণ হতে পারে এই বিষয়ের প্রতি ভীতি। তবে, ইংরেজিতে ভয়ের কোন কারণ নেই। একটু কৌশলী হলে তুমি শুধু ইংরেজি পাশ না ভালো নম্বর পেতে পার।

তোমরা জানো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা ২০১৯-২০ সেশনে ইংরেজি বহুনির্বাচনি অংশের ১৬টা প্রশ্নের মধ্যে ৮টা সরাসরি পাঠ্য বই থেকে করা হয়েছে এবং ২০২০-২১ সেশনেও ১৫টার মধ্য থেকে ৯টা এবং লিখিত অংশের সিংহভাগ পাঠ্য বই থেকে করা হয়েছে। তাই ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে হলে পাঠ্য বইয়ের বিকল্প কিছু  নেই।

প্রতিটা passage এর প্রথম লাইন শেষ লাইন ভালো করে দেখবা এবং passage পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ vocabulary এর Synonym-Antonym নোট করে রাখবা। কবিতার figure of speech গুলো লিখে রাখবা এবং প্রতিটি লাইনের ব্যাখ্যা বুঝে বুঝে পড়তে হবে যেটা তোমাকে লিখিত বিষয়ে সহায়তা করবে।

এবার গ্রামার অংশ বলতে গেলে  parts of speech , Right form of Verb, Tense, Conditional sentence, Subject-Verb agreement, Voice এবং Narration এগুলো প্রাধান্য পাবে। এগুলো অনুশীলনের জন্য বাজারে যেকোনো একটা ভালো বই সহায়ক হিসেবে নিতে পারো।

সাধারণ জ্ঞান

সাধারন জ্ঞান নামটা খুব সাধারণ হলেও জিনিসটা খুবই অসাধারণ। কারণ আমাদের চারপাশে তো অনেক সাধারণ জ্ঞান আছে যেমন: তোমরা জানো বিল গেটসের ডিভোর্স হয়েছে, আলিয়া রণবীরের বিয়ে, ইমরান খানের পতন, ভাইয়া এগুলোও কি আমাকে জানতে হবে?

আমি বলে রাখি তোমাকে ভর্তি পরীক্ষায় সবগুলো টপিক পড়ার আগে ভাবতে হবে কোনগুলো আমার পড়ার দরকার নাই। কারণ তোমার টার্গেট ভর্তি পরীক্ষা, বিসিএস নয়। ভর্তি পরীক্ষায় তোমার কখনও শতভাগ কমন পড়বে না। তাই আমাদের ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করতে হলে টেকনিক্যালি পড়তে হবে।

তোমাকে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটের বিগত ১০ বছরের একটা প্রশ্ন ব্যাংক নিতে হবে। এ প্রশ্ন ব্যাংকটা পড়লে তখন তুমি নিজেই বুঝতে পারবে যে কোন কোন টপিক গুলো থেকে প্রতিবছর প্রশ্ন থাকে।

‘খ’ ইউনিটে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে অধিক প্রশ্ন আসতে দেখা গিয়েছে। তাই এই বছরেও সাম্প্রতিক থেকে বেশি প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রস্তুতি ভালোভাবে নিতে হলে প্রত্যেক মাসের কারেন্ট এফেয়ার্স সংগ্রহ করবা এবং গুরুত্বপূর্ণ নিউজগুলো শর্ট নোট করে লিখে রাখবা।

সাম্প্রতিক বিষয়ে ভালো করতে হলে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট পত্রিকা পড়বা। পরীক্ষার কিছুদিন আগের পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখবে খাতায় ও আগের দিন দেখে যাবে। সাধারণ জ্ঞানের জন্য   কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক হলো বাংলাদেশ বিষয়াবলি, মুদ্রা, ভাষা, আইনসভা, উপজাতি, বিখ্যাতস্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে, গুরুত্বপূর্ণ দিবস, খেলাধুলা, পুরস্কার চুক্তি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সংগঠন ও সংস্থা, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, নদী-সমুদ্র-বিল-চর, বিখ্যাত উক্তি, বিখ্যাত গ্রন্থ ও লেখক, ভাস্কার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এবং মৌলিক বিষয়সমূহ যেমন একাদশ দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস, ভুগোল, অর্থনীতি, পৌরনীতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইত্যাদি ভালো করে পড়তে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কঠিন নয়; তবে প্রস্তুতি হতে হবে গোছানো। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বাড়তি ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই। নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করবা। মনে রাখবা, গতকালের চেয়ে আজকে দশ মিনিট বেশি পড়তে হবে, কিন্তু কম নয়। সাথে মা-বাবার দোয়া এবং সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করবা। সব মেধাবীরা চান্স পায় না, কিন্তু কোন পরিশ্রমীই ব্যর্থ হয় না। সকলের জন্য শুভকামনা রইলো।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


x