০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৬

এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান যেন পারিবারিক সম্পত্তি, ২৬ বছর ধরে চলছে ‘ভুয়া অধ্যক্ষ’ দিয়ে

চট্টগ্রাম শাহী কমার্শিয়াল কলেজ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

ভুয়া অধ্যক্ষ পরিচয়, ভুয়া পদবি ব্যবহার, আত্মীয়-স্বজনকে অবৈধ নিয়োগ ও শিক্ষকের স্বাক্ষর জালসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের শাহী কমার্শিয়াল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের এসব চিত্র উঠে এলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি। কারিগরি বোর্ড প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ এডহক কমিটি বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেও তা বোর্ডের এখতিয়ারে নেই বলে আটকে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬৬ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরের নুর আহমেদ সড়কে সরকারি ওয়াকফকৃত জমিতে টাইপ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। পরে একটি প্রকল্পের অধীনে ২০০০ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এতে এইচএসসি (বিএম) কোর্স চালু করা হয়। একই বছর এমপিওভুক্ত হয় উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলেও আগের টাইপ ও শর্টহ্যান্ড কোর্স চালু রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। এ ছাড়া কারিগরির এইচএসসির বোর্ড পরীক্ষার কেন্দ্রও এটি।

অভিযোগ, কলেজটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন একজন টাইপিস্ট। শিক্ষাগত যোগ্যতা মোতাবেক তিনি অধ্যক্ষ পদের যোগ্য নন, ফলে বিধি মোতাবেক নিয়োগ প্রাপ্ত হননি। যদিও তার বোন আকতার জাহানকে দিয়ে এবং ভাই এসএম মঈন উদ্দীনকে অধ্যক্ষ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত করা হয়, কিন্তু এমপিওভুক্ত কলেজটিকে এখনও পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করে পরিবারটি। এ ছাড়া ভাইয়ের অবর্তমানে প্রথমে জিয়াউদ্দিন ভুয়া অধ্যক্ষগিরি শুরু করলেও পরবর্তীতে প্রশাসনের তদরাকিহীনতা ও সহযোগিতায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ পরিচয় দিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে থাকেন। আত্মসাত করতে থাকেন প্রতিষ্ঠান তহবিলও। তার দুর্নীতি, জালিয়াতি, প্রতারণা, অনিয়ম নির্বিঘ্ন রাখতে এমপিওভুক্তির পর অধ্যক্ষসহ কোনো দাপ্তরিক পদেই নিয়োগ হতে দেননি।

১৬ বছর ধরে চলছে এডহক কমিটি
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি জায়গায় সরকারি অবকাঠামোযুক্ত এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানটিতে ২০০০ সাল থেকেই অধ্যক্ষসহ অফিসিয়াল সকল পদ শূন্য। অদ্যাবধি এতে কোনো নিয়োগ দিতে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এফিলিয়েশনপ্রাপ্ত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তবে সর্বশেষ ২০০৭ সালে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়েছিল এই প্রতিষ্ঠানে। পরবর্তীতে ২০১১, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০, ২০২২ ও ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ৮ বার এডহক কমিটি গঠিত হয়, যা কোন ভাবে কাম্য নয়।

বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ওই বছরের ২৪ আগস্ট এডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার জন্য ভুয়া অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে জালিয়াতি, প্রতারণা, দুর্নীতি ইত্যাদি চিরতরে বন্ধ করে সরকারি বিধি মোতাবেক কলেজ গভর্নিং বডি গঠন করার জন্য আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বোর্ড। ২০২৪ সালে ৫ ডিসেম্বর দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই তদন্ত কমিটিতে পরিদর্শন কর্মকর্তা ছিলেন উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভোকেশনাল) প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসী ও উপসচিব (প্রশাসন) মো. আব্দুল্লা আল মাবুদ। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগও হয়নি।

ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়াগিরি, ভুয়া পদ-পদবি ব্যবহার, জালিয়াতি, মিথ্যাবাজি, অনিয়ম, প্রতারণা, দুর্নীতি, হক আত্মসাৎ, নিয়োগে বাধা, এমপিওভুক্ত পদ শূন্য রাখা, বারবার ভুয়া এডহক কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা তহবিল আত্মসাৎ ও অন্যান্য সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি ভোগসহ সকল অভিযোগ সত্য। যিনি স্বঘোষিত অধ্যক্ষ এবং যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকও নন, অথচ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার গ্রহণ করে নিয়ম-বর্হিভূত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বারবার এডহক কমিটির অনুমোদন দেওয়া আইন-বর্হিভূত কাজ। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ডিজি কারিগরিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন স্থগিত রাখার জন্য পত্র মারফত অনুরোধ করা যায় মর্মে সুপারিশ করা হল।

তবে সুপারিশের বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ নেই মর্মে জানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শিক্ষা বিভাগ। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর উপসচিব ড. শাহেদুল আকবর খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই তথ্য জানানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, প্রকৃত সদস্য সচিব, প্রকৃত অভিভাবক ইত্যাদি সহকারে গভর্নিং বডি গঠন করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড শুধু গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটি অনুমোদন দিয়ে থাকে। কমিটি গঠনের বিষয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ নেই।

১৪ বছরের এডহক কমিটির পাশাপাশি আগের পরিচালনা কমিটি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। কলেজটির প্রভাষক (কম্পিউটার) শাহ আলম চৌধুরী বলেন, ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জিয়াউদ্দিনের একাধিক স্বাক্ষরে তার মা, ভাই, আত্নীয় সহকারে ৯ জন দিয়ে ১০ জনের কলেজ পরিচালনার ভুয়া কমিটির প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০১০ সালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে তিনি ভুয়া অধ্যক্ষ হিসেবে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে অভিযোগের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্তে ভুয়া অধ্যক্ষ ও ভুয়া কমিটি গঠন সংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণ হলে তাকে রাতারাতি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাজিয়ে ভুয়া সদস্য সচিব, ভুয়া অভিভাবক ও তার আদিষ্টদের নিয়ে এডহক কমিটি গঠন করা হয়। ১৬ বছর ধরে বারবার এডহক কমিটি গঠন করা হলেও সরকারি বিধি মোতাবেক ৬ মাস মেয়াদি প্রকৃত এডহক কমিটি হতে পারে সর্বোচ্চ ২ বার।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক না হয়েও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বলছে, কলেজটির অধ্যক্ষ ছিলেন এসএম মঈন উদ্দীন। তার অবর্তমানে পরিচালনা কমিটি মারফত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন। যদিও তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক নন। তার এবং তার ভাই মঈন, দুজনের কারোরই নিয়োগের দলিল ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র পায়নি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটি। ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের এক তদন্ত প্রতিবেদনেও এমন তথ্য উঠে আসে।

২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের অবর্তমানে সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকলে জ্যেষ্ঠতম সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার পালন করবেন। জ্যেষ্ঠতম সহকারী শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমপিওভুক্তির তারিখ, একই তারিখে এমপিওভুক্ত হলে যোগদানের তারিখ এবং যোগদানের তারিখ একই হলে বয়সের দিক হতে বয়োজ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। একইভাবে একই বয়সের দু’জন হলে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষককে জ্যেষ্ঠ গণ্য করা যাবে। ২০১২ সালের অপর এক পরিপত্রে বিষয়টি সর্বস্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। পরিপত্রে ‘এমপিওভুক্তি’ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘন হওয়ায় এমপিওভুক্তি বাতিলের নিদর্শনও রয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের।

অপরদিকে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বয়স ৬০ বছর পূর্তিতে বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে সংশ্লিষ্ট অবসরপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রধানের কল্যাণ ও অবসর সুবিধা বাতিল এবং জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ এর ১৮.১(খ) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি, ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির পদ শূন্য ঘোষণাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। অভিযোগ, শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বর্তমানে ৬৩ বছর বয়সী হলেও কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

‘অবৈধ’ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পূর্ণ অধ্যক্ষ পরিচয়
বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বিভিন্ন সময়ে নিজেকে অধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। ২০১০ সালের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও কলেজ পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতিকে দেওয়া বেতন-বোনাস প্রসঙ্গে দেওয়া একটি চিঠিতে নিজেকে ‘পরিচালক/অধ্যক্ষ’ পরিচয় দেন শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন। এ ছাড়া ২০০৩ সালের ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পরিচালনা কমিটির সভার পর নিজ হাতে লেখা কার্যবিবরণীতেও নিজেকে ‘অধ্যক্ষ’ পরিচয় দেন তিনি। যদিও ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের পক্ষে তদন্তকারী সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অধ্যক্ষ পরিচয় দেননি তিনি। এ ছাড়া এমপিওভুক্ত কলেজে পরিচালকের কোনো পদ নেই বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৬ সালে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষক থাকাকালে পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনের বিরুদ্ধে। ওই সময় তাকে কলেজের ইন্টারন্যাল (অন্তঃপরীক্ষক) পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জানা গেছে, সাচিবিক বিদ্যা ও অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক জিয়াউদ্দিন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের ওই বিষয়ের পরীক্ষায় পাশ করানোর শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বছরের প্রথম মাস থেকে কোচিং করাতেন। সে বছরের ৫ জুলাই এই বিষয়ের পরীক্ষায় বোর্ডের কড়াকড়ির কারণে তিনি তার কোন ছাত্রকে সাহায্য করার সুযোগ পাননি। ফলে তাদের পরীক্ষা খারাপ হয়।

২০০৩ সালের ওই সভার কার্যবিবরণীতে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর অংশে ১০ নং ক্রমিকে অধ্যক্ষ হিসেবে স্বাক্ষর করেন তিনি। আবার ৬ নং ক্রমিকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে ‘শাহ মো. জিয়াউদ্দিন চৌধুরী’ নামে পৃথক স্বাক্ষর করেন। অর্থাৎ ১০ সদস্যের ওই কমিটিতে নিজেই ২ বার ছিলেন তিনি। ওই কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পরিচালনা কমিটিতে জিয়াউদ্দিনের বাবার টাইপের ছাত্র, নিয়োগ ও এমপিওবিহীন তার ব্যক্তিগত হিসাবরক্ষক, তার ফুফাত ভাই ও তার মা ছিলেন।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভোকেশনাল) প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসী ও উপসচিব (প্রশাসন) মো. আব্দুল্লা আল মাবুদের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে জিয়াউদ্দিনের নিয়োগ ও অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে বলা হয়, অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো সনদপত্র দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া তার নিয়োগসংক্রান্ত কোনো আদেশও নেই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি এডহক কমিটি দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় কোনো প্রকার নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। নীতিমালার আলোকে এর অবকাঠামোও নিম্নমানের। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি এমপিওর নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত অধ্যক্ষ নিয়োগ হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম এবং পরীক্ষা পরিচালনা করা হয় না। প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যাংক হিসাব নাই, ফলে আয়-ব্যায়ের যথার্থ হিসাব সংরক্ষণ করা নাই।

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হলেও নিজেকে অধ্যক্ষ পরিচয় দেন শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিচালক পদ নেই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের

ওই তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ভুয়াগিরি, ভুয়া পদ-পদবি ব্যবহার, জালিয়াতি, মিথ্যাবাজি, অনিয়ম, প্রতারণা, দুর্নীতি, হক আত্মসাৎ, নিয়োগে বাধা, এমপিওভুক্ত পদ শূন্য রাখা, বারবার ভুয়া এডহক কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা তহবিল আত্মসাৎ ও অন্যান্য সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি ভোগসহ সকল অভিযোগ সত্য। যিনি স্বঘোষিত অধ্যক্ষ এবং যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকও নন, অথচ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার গ্রহণ করে নিয়ম-বর্হিভূত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। স্বঘোষিত অধ্যক্ষকে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িতকরণ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, প্রতিষ্ঠান প্রধান (অধ্যক্ষ) নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের কাম্য সংখ্যাক শিক্ষার্থী বৃদ্ধির জন্য এডহক কমিটির সভাপতিকে পত্র মারফত ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ করা যায়। 

আত্মীয়-স্বজনের ভুয়া পদ-পদবী
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর থেকে ২০২৩ সালে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ‘আইসিটি ইন এডুকেশন লিটারেসি, ট্রাবলস্যুটিং ও মেইনটেনেন্স’ বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণে শাহী কমার্শিয়াল কলেজ থেকে মোহাম্মদ কামরুদ্দিন চৌধুরীকে ইন্সট্রাক্টর, নয়নরায় চৌধুরীকে প্রভাষক, চৌধুরী মো. রেদোয়ানকে ইন্সট্রাক্টর দেখিয়ে পাঠানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে কামরুল অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন চৌধুরীর ছোট ভাই, তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন। রেদোয়ান তার বড় ছেলে, তিনি মজুদ-সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করেন। এদের পাশাপাশি নয়নরায় চৌধুরীও নিয়োগপ্রাপ্ত নন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোতে (ব্যানবেইস) প্রতি বছর ভুয়া পদবী দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে নয়ন রায় চৌধুরীকে ২০২০ সালে Teaching Assistant, ২০২১ ও ২২ সালে Teacher in Charge, ২০২৩ সালে DEMONESTRATOR এবং ২০২৪ সালে PART-TIME TEACHER দেখানো হয়েছে। আর চৌধুরী মো. রেদোয়ানকে ২০২০ সালে Assistant Co-ordinator, ২০২১ ও ২২ সালে Assistant Teacher Business Education/Commerce এবং ২০২৩ ও ২৪ সালে  Assistant Director পদে দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বিধি মোতাবেক কলেজের নিয়োগপ্রাপ্ত ডেমােনেস্ট্রেটর সুমতি রানী দাস। অন্যান্য পদ-পদবি এমপিওভুক্ত কলেজে নেই।

এইচএসসির কেন্দ্র পরিচালনায় অনিয়ম
প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্র পরিচালনার অনিয়ম যাচাইয়ে ২০২৪ সালে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। এতেও প্রধান করা হয় উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভোকেশনাল) প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসীকে। কমিটির অপর সদস্য ছিলেন কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স অফিসার মো. মওদুদ আহমেদ। তাদের কমিটি ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই তদন্তে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বেশ কিছু অসঙ্গতি উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত কোন কমিটি নেই। শিক্ষার্থীদের টেবিলে রোল নং সম্বলিত টোকেনও লাগানো হয় না। এ ছাড়া 
টেবিলের সিট অনুসারে সিট প্ল্যান রুমের বাইরে সাঁটানো পায়নি তদন্ত কমিটি। এর বাইরে কেন্দ্রে প্রবেশের পূর্বে মূল গেটে দেহ তল্লাশি করে না এবং পরীক্ষার কক্ষে পরীক্ষার্থীর মোবাইল জমা রাখা হয়। চারটি প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী একটি মাত্র কক্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

এ ছাড়া কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের ব্যবস্থা নাই। কেন্দ্রের বিভিন্ন কাজ করার জন্য কোন কর্মচারীও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরীক্ষা পরিচালনা কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্ব বণ্টনের কোন অফিস অর্ডার নেই। অপরদিকে হল পরিদর্শক শিক্ষকদের রেজিস্ট্রারে শুধু নাম লেখা থাকলেও নামের পরে পদবি এবং প্রতিষ্ঠানের নাম পায়নি কমিটি। নামের তালিকায় কাটাকাটিও পাওয়া গেছে। পরীক্ষার কেন্দ্রে লজিস্টিক সার্পোটও পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বিটিইবি সার্ভারে শিক্ষার্থীর তথ্য এন্ট্রি দিয়ে শিরোনামপত্র প্রিন্ট করার ব্যবস্থা নাই।

ভুয়া অধ্যক্ষ, তার সন্তান আর ঘনিষ্ঠদের হুমকি-ধামকির ফলে নিরাপত্তা হুমকির কারণে আমি এখন কলেজে যেতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। বলেছি, নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে আমাকে প্রয়োজনে ছুটি দেওয়া হোক অথবা অন্য কোথাও বদলি করা হোক অথবা এখানে বিধি মোতাবেক অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হোক। অথবা আমাকে এখানে পরিবেশ দেওয়া হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। এটা আবেদন করেছি— শাহ আলম চৌধুরী, প্রভাষক (কম্পিউটার), শাহী কমার্শিয়াল কলেজ

এতে আরও উঠে আসে, শাহী কমার্শিয়াল কলেজ এইচএসসি (বিএম/বিএমটি) চুড়ান্ত পরীক্ষায় কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নাই এবং এইচএসসি (বিএম/বিএমটি) চুড়ান্ত-২০২৩ ও তার পূর্ববর্তী কোন পরীক্ষা সংক্রান্ত কোন রেকর্ডপত্র প্রদর্শন করতে পারেনি।
পরীক্ষা পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসারে পরীক্ষা পরিচালনা করা হয় না। যিনি কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন তিনি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রাপ্ত কোন শিক্ষক নন। পরীক্ষা কেন্দ্রে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ব্যতীত কোন কর্মচারি বা শিক্ষক উপস্থিত নাই। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত বছরের পরীক্ষা পরিচালার আয়-ব্যয় হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি।

এই প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিতে এইচএসসি (বিএমটি) কোর্সের ৩টি স্পেশালাইজেশন এবং জাতীয় দক্ষতামান বেসিক ৩৬০ ঘন্টা কোর্সের ২টি ট্রেড চালু আছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো অপ্রতুল। কেন্দ্র পরিচালনার সক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানে নাই। শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ২১ জন (একাদশ-দ্বাদশ)। নীতিমালা অনুসারে এই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্র প্রাপ্তির সুযোগ নাই। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করেন না, নিজের ইচ্ছা মতো খরচ করে থাকেন। যেহেতু আয়-ব্যয়ের হিসাব নাই তাই আর্থিক দুর্নীতির তথ্য উপস্থাপন করা গেল না।

তাতে আরও বলা হয়, যেহেতু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জিয়াউদ্দিন এই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক নন, তাই নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্য থেকে সিনিয়র কাউকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া যায়। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা নাই এবং কেন্দ্র পরিচালনার শর্ত পূরণ করে না বিধায় কেন্দ্র বাতিলের সুপারিশ করা হল।

পরীক্ষায় দুর্নীতির দায়ে আরেক কলেজ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন জিয়াউদ্দিন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৬ সালে চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষক থাকাকালে পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনের বিরুদ্ধে। ওই সময় তাকে কলেজের ইন্টারন্যাল (অন্তঃপরীক্ষক) পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জানা গেছে, সাচিবিক বিদ্যা ও অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষক জিয়াউদ্দিন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের ওই বিষয়ের পরীক্ষায় পাশ করানোর শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বছরের প্রথম মাস থেকে কোচিং করাতেন। সে বছরের ৫ জুলাই এই বিষয়ের পরীক্ষায় বোর্ডের কড়াকড়ির কারণে তিনি তার কোন ছাত্রকে সাহায্য করার সুযোগ পাননি। ফলে তাদের পরীক্ষা খারাপ হয়। ছাত্ররা তাদের এই পরিণতির কথা অভিভাবকদের জানালে অভিভাবকরা শিক্ষা বোর্ডে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা বোর্ড তৎকালীন উপ-শিক্ষা পরিদর্শক আবুল হোসেন ও সহকারী হিসাব কর্মকর্তা জামাল উদ্দিনকে সদস্য করে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির তদন্তে জিয়াউদ্দিন দোষী প্রমানিত হওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

শিক্ষক নিয়োগ-পদোন্নতি আটকে দেওয়া ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ
কলেজের এমপিওভুক্ত প্রভাষক (কম্পিউটার) শাহ আলম চৌধুরী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে অভিযোগ করে বলেন, আমি ২০০৩ সালে শূন্য পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হই। ২০০৪ সালের জুন মাসে আমার এমপিওভুক্ত হয়। কিন্তু ওই সাত মাস আমি সরকারের বা প্রতিষ্ঠান, কোন জায়গা থেকে বেতন পাইনি। ২০০৪ সালের জুন মাস থেকে আমার এমপিওভুক্তির বেতন আসে। কিন্তু আমি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠান অংশের কোন টাকা-পয়সা, কোন বেতন, কিছুই পাইনি। ২০১২ সালে বিধি অনুযায়ী আমি পদোন্নতি পাওয়ার কথা। যদি এখানে প্রভাষক সবগুলো থাকত, তাহলে আমি সহকারী অধ্যাপক হতাম। নিয়োগ না দেওয়ার কারণ হল উনি মহিলা ছাড়া নিয়োগ দেন না। আমি ছাড়া যে চারজন আছে, তারা সবাই মহিলা।

তিনি বলেন, ২০২৩ সালে উনি ইনক্রিমেন্টের ফাইল অধিদপ্তরে পাঠান। আমি বলেছিলাম, আমি সহকারী অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করব, ইনক্রিমেন্ট নিব না। এখন সহকারী অধ্যাপকের জন্য প্রয়োজনে শূন্য পদে নিয়োগ দিতে হবে। জেনারেল, মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) এবং মাদ্রাসা অধিদপ্তরে ১৬ বছর পরে সবাইকে কোনরকম রেশিও ছাড়া ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কারিগরি অধিদপ্তরে ২০ বছর হওয়ার পরও রেশিওটা রেখে দিয়েছে। আগে ছিল ৫:২, এখন ১:১। ফলে এটার কারণে আমার এমপিওভুক্তির ২২ বছর পরেও আমি অধ্যক্ষ পদে আবেদন করতে পারব না। কারণ এখানে উনারা শর্ত রেখেছেন মিনিমাম এমপিওভুক্তির ১২ বছর লাগবে এবং তিন বছরের সহকারী অধ্যাপক পদের অভিজ্ঞতা লাগবে। এখন আমার ২২ বছরেও যদি আমাকে সহকারী অধ্যাপক না দেয়, তাহলে আমি আর পাব কখন? এটা পাওয়ার সুযোগ নাই। আমি ১২ বছর পরে পাওয়ার কথা, সেটা এখন ২২ বছর পরেও আমাকে দিচ্ছে না। সে বছর আমার নামে ভুয়া তথ্য সহকারে টাইমস্কেল ফরম পূরণ করে আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে জমা দেন এই ভুয়া অধ্যক্ষ।

সরকারিভাবে তিনটা লেকচারার দেওয়া, আগে তো সাতজন পেয়েছিলাম। এখন মাত্র একজন পুরুষ আর চারজন মহিলা আমাদের এখানে সরকারিভাবে। তো আমার শর্ট কোর্স আছে, আমার শর্টহ্যান্ড টাইপ আছে, আবার ১০টা সাবজেক্ট (এইচএসসি)। আমি যদি ওদেরকে দিয়ে ক্লাস না চালাই, তাহলে শিক্ষার্থীরা ফেল করবে না? ওরা তো পয়সা নিয়ে করছে না— শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শাহী কমার্শিয়াল কলেজ

প্রভাষক শাহ আলম চৌধুরী বলেন, বাংলা, ইংরেজি, ম্যানেজমেন্ট, কম্পিউটার— এই চারটা প্রভাষক এবং কম্পিউটারের ডেমনস্ট্রেটর, এই কয়টা পদ ছাড়া বাকি পদগুলোতে নিয়োগ দিতে দেয়নি। ২৬ বছর ধরে কোনো পদেই নিয়োগ হচ্ছে না। অধ্যক্ষ এমপিওভুক্ত না, উনার নিয়োগও নাই, যোগ্যতাও নাই।

অনিয়মের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলায় নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন শাহ আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ভুয়া অধ্যক্ষ, তার সন্তান আর ঘনিষ্ঠদের হুমকি-ধামকির ফলে নিরাপত্তা হুমকির কারণে আমি এখন কলেজে যেতে পারছি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। বলেছি, নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণে আমাকে প্রয়োজনে ছুটি দেওয়া হোক অথবা অন্য কোথাও বদলি করা হোক অথবা এখানে বিধি মোতাবেক অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হোক। অথবা আমাকে এখানে পরিবেশ দেওয়া হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। এটা আবেদন করেছি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি অনেক আগের। ২০০০ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এটিকে এমপিওভুক্ত হয় এবং বাংলা, ইংরেজি ও ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা চালু করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়। তখন আমাদের জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি আমাদের সভাপতি ছিলেন। যেহেতু চলমান ভিন্ন একটা প্রতিষ্ঠানে এটা (প্রকল্প) আসছে, তো যেহেতু এটা পরিচালনা করে যাচ্ছিলাম, ওই মুহূর্তে বলা হল— যতক্ষণ পর্যন্ত সরকারি নিয়োগ না হবে, ততক্ষণ আপনি এটা পরিচালনা করবেন। সেই সুবাদে চালাচ্ছি।

তিনি বলেন, আজ অবধি আমাদের ছাত্রও বাড়ছে না, কোনভাবেই আমরা আগাতে পারছি না। সরকারের নিয়োগ দেওয়া যে চারজন লেকচারার আছেন, সরকার যে টাকা দিচ্ছে— এটাও আমার মনে হচ্ছে আমার জন্য একটা কাল হয়ে আছে। কারণ এই লোকটা (প্রবাষক শাহ আলম চৌধুরী), হঠাৎ করে ২০২৩ সালে পরীক্ষা চলাকালীন ওনাদের ইনক্রিমেন্ট হয়, ইনক্রিমেন্টটা দেওয়ার জন্য আমরা কাগজপত্র জমা দিয়ে আসলাম। এখন কলেজে ছাত্রছাত্রী আছে কিনা, এটার উপরে এই ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হবে। কিন্তু এই মিটিংয়ের পরে উনি যে বাহিরে গেলেন, যাওয়ার পরে ওই কলেজের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য...।

অধ্যক্ষ ও পরিচালক পরিচয়ের জন্য তিনি বলেন, সরকার আমাকে মাত্র ৩টা লেকচারার দিয়েছে। কিন্তু আমার তিনটা শাখা। তিনটা শাখার জন্য কি তিনটা প্রতিষ্ঠান প্রধান থাকবে? আমার একটা শর্ট কোর্স আছে, একটা শর্টহ্যান্ড টাইপ আছে। আমার অন্য কোর্সগুলো চলছে, আমি শুধু ইন্টারের দায়িত্বে আছি এটা বলেছি কখনও? এখানে আমি ভারপ্রাপ্ত। পরিচালক পরিচয় দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারিগরিতে সবই আছে। আমি নিয়োগ দিতে হলে আমাকে ছাত্র দেখাতে হবে। আমার তো শাখা তিনটা।

আত্মীয়-স্বজনকে নিয়োগ দেওয়ার ও ভুয়া পরিচয় দেওয়ার প্রসঙ্গে শাহ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, ওরা কিছু নাই। কিন্তু সরকারিভাবে তিনটা লেকচারার দেওয়া, আগে তো সাতজন পেয়েছিলাম। এখন মাত্র একজন পুরুষ আর চারজন মহিলা আমাদের এখানে সরকারিভাবে। তো আমার শর্ট কোর্স আছে, আমার শর্টহ্যান্ড টাইপ আছে, আবার ১০টা সাবজেক্ট (এইচএসসি)। আমি যদি ওদেরকে দিয়ে ক্লাস না চালাই, তাহলে শিক্ষার্থীরা ফেল করবে না? ওরা তো পয়সা নিয়ে করছে না। স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন কাগজপত্র যায়, এখানে তখন কাগজগুলো সবাই সাইন দিয়ে চলে গেছে। উনি ভাগ্যবান যে উনার কাগজপত্রগুলো যাচাই-বাছাই হয় নাই, কিন্তু জমা হয়ে গেছে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম নিয়ে গত বছর একটি তদন্ত করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কার্যালয়। ওই বছরের ১৭ মার্চ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার ফারজানা নাজনীন সেতুর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকালীন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ/পরিচালকের বিরুদ্ধে আনীত জাল-জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ২০১০ সালের একটি তদন্তে অধ্যক্ষের পদ ও এডহক কমিটি নিয়ে অভিযোগের সত্যতা মেলে।

এ বিষয়ে গত বছরের তদন্তকারী ও তৎকালীন সহকারী কমিশনার (শিক্ষা শাখা, তথ্য ও অভিযোগ শাখা) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার ফারজানা নাজনীন সেতু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, প্রায় ৯ মাস আগে তিনি বদলি হয়েছেন। বলেন, ওখানে এডহক কমিটি নিয়ে সমস্যা ছিল। সচিবালয় থেকে সিনিয়র স্যাররা তদন্ত করতে এসেছিলেন। শাখা অফিসার হিসেবে আমি দেখেছিলাম। এডহক কমিটিসহ আরও কিছু বিষয়ে সমস্যা ছিল।

তবে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি। তিনি তথ্য ও অভিযোগ শাখার বর্তমান কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। যোগাযোগ করা হলে বর্তমান সহকারী কমিশনার (তথ্য ও অভিযোগ শাখা) মো. আসিফ জাহান সিকদার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এখন কোন অভিযোগ নেই, আগে একটা অভিযোগ ছিল। ওই সময়ে যিনি ছিলেন দায়িত্বে, উনি একটা রিপোর্ট দিয়েছিলেন। ওইটার প্রেক্ষিতে হয়তো তখন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না।

এ বিষয়ে বোর্ড গঠিত উভয় তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভোকেশনাল) প্রকৌশলী জাকারিয়া আব্বাসীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। উপসচিব (প্রশাসন) আব্দুল্লা আল মাবুদ এ বিষয়ে পরিদর্শন বিভাগে যোগাযোগ করতে বলেন। বোর্ডের পরিদর্শক বিএম আমিনুল ইসলামের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদনের জন্য যোগাযোগের সময় অফিস বন্ধ থাকায় উপপরিদর্শক (বিএমটি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুনুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি। অপরদিকে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা  কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (এমপিও) মো. খোরশেদ আলম মুঠোফোনে কথা বলতে রাজি হননি।