আনোয়ারা থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়, স্বপ্ন ছুঁলেন একঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থী
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা থেকে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে একঝাঁক মেধাবী শিক্ষার্থী পরিবার ও এলাকার গর্বে পরিণত হয়েছেন। সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম, ইউনিয়ন ও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীরাও দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করছে। মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা তিন বিভাগেই শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করেছে, যা এই উপজেলার শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের বাড়তি আগ্রহের প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলার বটতলী ইউনিয়নের এয়াকুব আলী চৌধুরী বাড়ির ইমতিয়াজ আহমেদ চৌধুরীর কন্যা উম্মে সাওদা চৌধুরী সুবাহ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটে ৬৩১তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২হাজার ৬০০তম স্থান অর্জন করেছেন।
বরুমছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও আনোয়ারা সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটে ৪৪৫তম এবং ঘ ইউনিটে ৫৮২তম স্থান অর্জন করে নিজ এলাকায় অনুপ্রেরণার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। একই এলাকার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবরিনা মুহীব, আরফাত হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুনতাসির মাহিন সুযোগ পেয়েছেন। যদিও তাদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
চাতরী ইউনিয়নের ডুমুরিয়া-রুদুরা গ্রামের সাইমাতুন্নিছা ইমা আনোয়ারা সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ৮৯৬তম স্থান অর্জন করেছেন।
আনোয়ারা সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করা এই শিক্ষার্থীর এমন ফলাফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি এবং স্থানীয়রা তার এমন অর্জনে গ্রামাঞ্চলের মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও নতুন প্রজন্মের জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন।
পরৈকোড়া ইউনিয়নের দেওতলা গ্রামের মোহাম্মদ মাসুদ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ ইউনিটে ২০৭তম, একই ইউনিটে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিটে ১৪০তম এবং ঘ ইউনিটে ৯৩৮তম স্থান অর্জন করে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
মাহাতা পাটনীকোটা উচ্চ বিদ্যালয় ও সরকারি কমার্স কলেজ থেকে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করা মাসুদ আলম বলেন, ‘তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর মা। সীমিত সুযোগের মাঝেও চেষ্টা করলে সাফল্য আসে, এ বিশ্বাস থেকেই তিনি কখনো স্বপ্ন ছাড়েননি।’
বারখাইন ইউনিয়নের উত্তর হাজীগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ জিসান মোবারক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ ইউনিটে ৪৩৮তম স্থান অর্জন করে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ই ইউনিটে ৬৪তম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ ইউনিটে ৬৪৯তম এবং ঘ ইউনিটে ১৪৮৯তম স্থান অর্জন করেন।
জিসান মোবারক বলেন, ‘পরিবারের ত্যাগ ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাই তাঁকে এই সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তিনি পরিবার ও গ্রামের জন্য গর্বের কারণ হতে চান।’
বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ গ্রামের নাঈমুল হুদা আসাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগে ২৪৪তম স্থান অর্জন করেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ ইউনিটে ২৫৩তম এবং ঘ ইউনিটে ৪৮৭তম স্থান অর্জন করে ধারাবাহিক মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতা ও খেলাধুলায় সক্রিয় এই শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে আনোয়ারার মামুরখাইন গ্রামের ইসরাত জাহান তুহিনের সাফল্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নিরাপত্তাপ্রহরী বাবার মেয়ে ইসরাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে ৩৩৪তম স্থান অর্জন করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ, গ ও ঘ ইউনিটেও তিনি কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করেন। তাঁর বাবা আবু বক্কর রাতে ব্যাংকের নিরাপত্তায় পাহারা দিতেন, আর সেই রাতেই মেয়ে ইসরাত ডুবে থাকতেন বইয়ের পাতায়। রাতের পাহারা আর দিনের স্বপ্নের এই সংগ্রামই আজ তাঁকে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। ইসরাত বলেন, অভাব কখনোই স্বপ্নের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না, এই বিশ্বাস থেকেই তিনি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।
এছাড়া আরও ৪-৫জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। যদিও তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষক-শিক্ষিকারা বলছেন, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে গ্রাম থেকেও দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো সম্ভব। পরিবার ও শিক্ষকের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা শিক্ষার্থীদের জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। গ্রামের শিক্ষার্থীরাও সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। এই শিক্ষার্থীদের অর্জন নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার জন্য অনুপ্রাণিত করবে এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সাহস করে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেবে।
এ বিষয়ে আনোয়ারা সরকারি কলেজের শিক্ষক মীর কাশেম চৌধুরী বলেন, ‘আনোয়ারা থেকে এত শিক্ষার্থীর শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া গর্বের বিষয়। গ্রামীণ শিক্ষার্থীরাও সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পেলে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে, এই সাফল্য তার প্রমাণ।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মুহাম্মদ আবু তাহের বলেন, এই শিক্ষার্থীদের অর্জন শুধু তাদের পরিবারের নয়, পুরো আনোয়ারার। এটি নতুন প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে বড় অনুপ্রেরণা দেবে।
এই শিক্ষার্থীদের সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে। সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিয়মিত অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নেওয়া এই শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন দেখার সাহস থাকলে গ্রাম থেকেও দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পৌঁছানো সম্ভব।