২৯ জানুয়ারি ২০২৫, ১৭:৩৮

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননাকর লেখা, ‘লেখকের দায়’ বলল ছাত্র সংবাদ কর্তৃপক্ষ

বির্তকিত সেই লেখাটি  © সংগৃহীত

‘ছাত্র সংবাদ’ নামে ছাত্রশিবিরের মাসিক একটি প্রকাশনার একটি প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অবমাননাকর লেখা ছাপানো হয়েছে। গত ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত ওই প্রবন্ধে ‘সে সময়ের অনেক মুসলিম না বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো এটা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল’ বলে উল্লেখ করা হয়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদও।

মাসিক এই প্রকাশনার পক্ষ থেকে লেখাটাকে ‘লেখকের দায়’ বলে বর্ণনা করা হয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই মন্তব্যটি একান্তই লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী আমরা প্রত্যেকের যেকোনো ইতিবাচক মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। অন্যদিকে, প্রবন্ধের লেখক আহমেদ আফগানী বলেছেন, গবেষণার ভিত্তিতে তিনি সঠিক লিখেছেন। লেখা প্রত্যাহার নিয়ে ভাবছেন না। 

মঙ্গলবার ছাত্র সংবাদ-এর পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ছাত্র সংবাদ’ একটি মাসিক পত্রিকা, যা দীর্ঘদিন থেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস ও চর্চা করে আসছে। পত্রিকাটির ডিসেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় ইতিহাস-গবেষক আহমেদ আফগানীর লেখা 'যুগে যুগে স্বৈরাচার ও তাদের করুণ পরিণতি' শীর্ষক একটি লেখা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার লেখার একটা অংশে বলতে গিয়ে লিখেছেন— ‘সে সময়ের অনেক মুসলিম না বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, এটা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন।’ 

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ছাত্র সংবাদ’ মনে করে— একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ছিল, ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়। মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে সারিবদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করছে, এমন অসংখ্য দৃশ্য এবং বর্ণনা ইতিহাসে সমুজ্জ্বল। মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানীদের লড়াই ছিল পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের জন্য। মুক্তিযুদ্ধে ইসলাম কোনো পক্ষ ছিল না। 

বিবৃতিতে বলা হয়, বরং তৎকালীন শাসক-শ্রেণি মুক্তিযুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইসলামকে টেনে তাদের অপকর্মকে জায়েজ করতে চেয়েছিল। সেই সাথে আমাদের দেশেও একটি পক্ষ মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বারবার ইসলামকে টেনে জাতিকে বিভক্ত করার হীন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীন বাংলা বেতার "আল্লাহর পথে জেহাদ" বলে পরিচয় করিয়েছিল, যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়— মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার মূলে ছিল 'ইসলাম'।

‘‘অধিকার আদায়ের প্রতিটি সংগ্রামে অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের পাশে 'ছাত্র সংবাদ'-এর অবস্থান প্রশ্নাতীত এবং দৃঢ়। 'ছাত্র সংবাদ' সচেতন শিক্ষিত সমাজের যৌক্তিক সমালোচনা ও পরামর্শ গ্রহণে আন্তরিক।’’

এদিকে, ফেসবুক পোস্টে আহমেদ আফগানী লেখেন, ছাত্র সংবাদ ডিসেম্বর সংখ্যায় ‘যুগে যুগে স্বৈরাচার ও তাদের করুণ পরিণতি’ শীর্ষক লেখা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে আমার ব্যাখ্যা– এক. এ লেখার দায় সম্পূর্ণ আমার এবং আমি মনে করি লেখাটি সঠিক। দুই. স্বৈরাচার মুজিবের ভয়ংকর ইসলাম-বিদ্বেষ নিয়ে তথ্যবহুল ও রেফারেন্সভিত্তিক লেখা লিখে আমি একটি মন্তব্য করেছি।

মন্তব্যটা এরূপ– ‘সে সময়ে অনেক মুসলিম না বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, এটা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন।’ এ বক্তব্য নিয়ে মূলত বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আমার এ মন্তব্য নতুন নয়। বহু মুক্তিযোদ্ধা, বহু গবেষক, বহু বিশ্লেষক স্বীকার করেছেন, তারা যদি এ ইসলাম-বিদ্বেষ সম্পর্কে আগে বুঝতে পারতেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধে জড়াতেন না।

গবেষণা কাজের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ১৫৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়ে তাদের থেকে এ ধরনের মন্তব্য পেয়েছেন বলে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘অতএব আমি আমার মন্তব্যের জন্য বিব্রত নই।’ আহমেদ আরও লেখেন, ‘আমার স্ট্যান্ড ও ছাত্র সংবাদের স্ট্যান্ড একই না হতে পারে। আমার লেখা ও মন্তব্যের দায় আমার। অন্য কারও নয়। আমার লেখা কেউ ছাপাতে চাইলে আমার শর্ত থাকে যে, আমার লেখা বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে ছাত্র সংবাদও আমার লেখায় সম্পাদনা করেনি বা করতে পারেনি।’ তার লেখার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে তার লেখা আরেকটা বই ‘বঙ্গকথা’ পড়ার অনুরোধ জানান তিনি। এতে সবার ‘জ্ঞানের দরজা নতুনভাবে বিকশিত হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।