গৌরবের ইতিহাস থেকে কীভাবে ‘বিতর্কিত’ হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ?

লোগো
লোগো  © ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগেরও জন্ম হওয়ার এক বছর আগে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। তখন অবশ্য এই সংগঠনের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এর একবছর পরে জন্ম হয় আওয়ামী লীগের। ভাষা আন্দোলন, স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও বড় ভূমিকা রেখেছিল ছাত্রলীগ। তবে স্বাধীনতার পরে অনেকের মতে নানাভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি।

যেভাবে জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, ভারত ভাগ হওয়ার আগে এই অঞ্চলে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল ছাত্ররা। কিন্তু তারা ছিল গোঁড়া থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও বিপ্লবী উদ্দীপনায় ভরা ছাত্রদের সংগঠন। তাদের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, কারণ অবিভক্ত বাংলাদেশ থাকতেই এই সংগঠন কমিউনিস্টদের দ্বারা পরিচালিত বলে চিহ্নিত হয়ে পড়েছিল।

তিনি লিখেছেন, দেশ বিভক্ত হয়ে যে ছাত্র-সংগঠনটি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়, তা হচ্ছে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। কারণ যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কর্মসূচিকে ভিত্তি করে এরা ছাত্র রাজনীতি করে এসেছে, তারই ফসল হচ্ছে পাকিস্তান।

ছাত্র ফেডারেশনের মতো নিখিল পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম ছাত্রলীগের নতুন কোন কমিটি হলো না। বরং ৪৭-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্রিক নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের জাতীয় কমিটি ঢাকায় তার কার্যালয়টুকু মাত্র স্থানান্তর করলো। শুধুমাত্র নিখিল বঙ্গ স্থানে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান বসলো।

ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে ড. মোহাম্মদ হান্নান তার বইতে লিখেছেন, কিন্তু ১৯৪৭ এর পরে এই সংগঠনের নেতৃত্বে চরম কোন্দলের সৃষ্টি হয়। ইতোমধ্যে পাকিস্তানে ভাষা প্রশ্নের বিতর্কও শুরু হয়ে যায়।

ভাষা প্রশ্নে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এক ন্যক্কারজনক ভূমিকা পালন করতে থাকলে সংগঠনের বিদ্রোহী অংশ শুধুমাত্র ‘নিখিল’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে একটি ভিন্ন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে।

‘১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি এই বিদ্রোহী ছাত্রলীগের অস্থায়ী সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল মিলনায়তনে নাজমুল করিমের সভাপতিত্বে বিদ্রোহী ছাত্রলীগ কর্মীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রনেতা অলি আহাদ সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন।’

তিনি লিখেছেন ‘সম্মেলনে নইমুদ্দিন আহমদ (রাজশাহী) কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক এবং অলি আহাদ ঢাকা শহর শাখার ছাত্রলীগের আহবায়ক নির্বাচিত হন। তবে পুনর্গঠিত এই নয়া আন্দোলন ছাত্রলীগ গঠনে মূল উদ্যোগ গ্রহণ করেন ছাত্ররাজনীতি থেকে প্রায় বিদায় গ্রহণকারী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’

ড. হান্নান লিখেছেন, ‘বস্তুত ভাষা আন্দোলনের পর অসম্প্রাদায়িক ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হতে থাকে। এর আগে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারিতে সলিমুল্লাহ হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির সভায় এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়।  তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আরও কয়েক বছর চলে যায়।’

অবশেষে ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী আন্দোলনের  ১৯৫৫ ছাত্রলীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সরকার বিরোধী আন্দোলনে বড় একটি ভূমিকা রেখেছিল ছাত্রলীগ ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠন।

ড. মোহাম্মদ হান্নান বলছেন, ‘‘বর্তমানে ক্ষমতায় আছে, এমন একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হিসাবে এখন ছাত্রলীগকে যেভাবে গণমাধ্যমে মানুষ দেখছে, কিন্তু এটাই তো ছাত্রলীগের পুরো ইতিহাস না।..আমরা ছাত্রলীগকে বরাবর দেখেছি তার সংগ্রাম মুখর ভূমিকার জন্য। সেই ১৯৪৮ সালের পর থেকে যখন পূর্ববঙ্গে বা পূর্ব পাকিস্তানে কোন বিরোধী দল ছিল না, তখন ছাত্রলীগ ছিল। সেটাই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে।’’

তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল ছাত্রলীগ।

‘‘তারপরে ছাত্রলীগের মূল ভূমিকা আমরা দেখেছি ষাটের দশকে। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র শক্তি নামের নানা সংগঠন ছিল, কিন্তু মূল ছিল ছাত্রলীগ।’’

‘‘তবে ছাত্রলীগ বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে। ইতিহাসে দেখা গেছে, ছয় দফা নিয়ে সারা পাকিস্তানেই নয়, বরং আওয়ামী লীগের মধ্যেই বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছয় দফাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ তখন প্রায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল।’’

‘‘কিন্তু ছয় দফাকে পুরোপুরি সমর্থন দান করে ছাত্রলীগ। ছয় দফাকে সারাদেশে জনপ্রিয় করে তুলেছিল ছাত্রলীগ। তারাই প্রথম এই ছয়দফার সঙ্গে 'জয় বাংলা' ধ্বনি তোলে।’’

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে সারা দেশে যে আন্দোলন হয়েছে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে - ছাত্রলীগ সারা দেশে সেই আন্দোলন জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রধান সহায়ক হয়েছিল ছাত্রলীগ।

দোসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল ছাত্রলীগ। জাতীয় সঙ্গীত কি হবে, পতাকা কি হবে, সেটার পেছনেও ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল। তারাই প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতেও শুরু করেছিল। পরবর্তীতে মুজিব বাহিনী নামে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নেয়। তিনি বলছেন, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ আন্দোলনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

যেভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগ ছিল একটি সরকার বিরোধী ছাত্র সংগঠন। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হলেও ছাত্রলীগের মধ্যে এক ধরনের স্বাতন্ত্র্য কাজ করছিল। তাদের মধ্যে স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ছিল। প্রায় প্রতিবছর কাউন্সিল হতো, নেতৃত্বের পরিবর্তন হতো।

‘‘কিন্তু একাত্তর পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম, আওয়ামী লীগ সরকারে গেল আর সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন হলে যা হয়, যেটা আমরা পাকিস্তান আমলে এনএসএফের (তখনকার সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন) মধ্যেও দেখেছি, সেই  চরিত্র আস্তে আস্তে ছাত্রলীগের মধ্যে প্রবিষ্ট হতে থাকলো। ধীরে ধীরে একটা লড়াকু ছাত্র সংগঠন আস্তে আস্তে তার চরিত্র বদলে একটা ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়াল সংগঠনের দিকে যাত্রা শুরু করলো।’’

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন মহিউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলছেন, সেই সময় সংগঠনের মধ্যেই পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম বিভক্তির শুরু হয়। এক দল মনে করলো সরকারের পক্ষে থাকবে, আরেকদল মনে করলো তারা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবে। এভাবে ছাত্রলীগের বিভক্তি ১৯৭২ সালে শুরু হয়। এরপর আওয়ামী লীগ ভাগ হয়েছে, ছাত্রলীগও ভাগ হয়েছে। একসময় তারা ছত্রখান হয়ে গেছে।

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, 'আশির দশকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি- বিরোধী দলে ছিল। ফলে তাদের ছাত্র সংগঠনকেও সরকার বিরোধী ভূমিকা দেখা গেছে। কিন্তু সেই আন্দোলনেও ছাত্রদল বা জাসদের ছাত্রলীগ যতটা ভূমিকা রেখেছিল, প্রথম দিকে ছাত্রলীগকে তা দেখা যায়নি। কারণ আওয়ামী লীগ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে গিয়েছিল। ফলে সেই আন্দোলনে ছাত্রলীগের তুলনায় ছাত্রদল আগ্রাসী ভূমিকা রেখেছিল। ডাকসুতেও বাসদ এবং জাসদের ছাত্রলীগের প্রাধান্য দেখা গেছে।

গত কয়েক বছরে দেশের নানা এলাকায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল।

এরপরেও বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অর্থের বিনিময়ে কমিটি গঠনের মতো অভিযোগ ওঠে। যেমন ২০১৯ সালে সিলেটের এমসি কলেজে তরুণীতে ধর্ষণের অভিযোগে ছয় ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সেই বছর বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচার চলছে বুয়েট ছাত্রলীগের ১৯ নেতাকর্মীর।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎ দাসকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তাদের আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা বিরোধী আন্দোলনের মতো একাধিক ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও মারধর করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে।

ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ইতিহাস গ্রন্থের লেখক ড. মোহাম্মদ হান্নান বলছিলেন, যে সংগঠন ক্ষমতার স্বাদ পায়, তারা তখন তাদের বিপ্লবী চরিত্র হারিয়ে ফেলে। তখন নানারকম সুবিধাবাদ এবং সুবিধাবাদী লোকজন যুক্ত হয়। তখন সংগঠন বিতর্কিত হয়ে যায়।

ছাত্রলীগের এক সময়ের নেতা এবং বর্তমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও মন্তব্য করেছেন, অপকর্ম করবে, এমন ছাত্রলীগ চাই না। দুর্নামের ধারা থেকে সুনামের ধারায় ছাত্রলীগকে ফিরিয়ে আনতে হবে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ছাত্রলীগের কোন স্বাধীন সত্ত্বা নেই। তিন-চার বছর পরে ছাত্রলীগের কাউন্সিল হয়, নিয়মিত হয় না। কাউন্সিলে কোন নেতা নির্বাচিত হন না, নেতা নির্বাচন করে দেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে এটাকে কোন অর্থেই একটি ছাত্র সংগঠন আর বলা যায় না, কারণ এটা ছাত্রদের আর প্রতিনিধিত্ব করে না, এটা প্রতিনিধিত্ব করে ক্ষমতাসীন দলকে।

তিনি বলেছেন, এটাকে বলা যায় ক্যাম্পাস-ভিত্তিক  আওয়ামী লীগের সংগঠন। ফলে ছাত্রলীগের যে ঐতিহ্য আমরা ৫০/৬০ এর দশকে দেখেছি, সেটা এখন পুরোপুরি অনুপস্থিত। তাদের এই ভূমিকার কারণে ছাত্র রাজনীতি পুরোপুরি তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]


সর্বশেষ সংবাদ