গাড়ি চালিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দুই নারী

গাড়ি চালিয়ে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দুই নারী
কলকাতা শহরের বুকে ট্যাক্সি চালান বিজয়গড়ের শম্পা নন্দী  © সংগৃহীত

করোনা বিধ্বস্ত দেশ যখন থমকে গিয়েছিল, তখনও গতি রুদ্ধ হয়নি কলকাতার দুই নারীর। পিপিই পোশাক পরে ক্যাব চালিয়ে তারা কোভিড রোগীদের পৌঁছে দিয়েছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে।

ভারতে করোনা সংক্রমণ এখন নীচের দিকে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগেও ছবিটা এমন ছিল না। সংক্রমণের প্রকোপে মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। কিন্তু শম্পা নন্দী আর টগরী শীল এসবের পরোয়া করেননি। কোভিড রোগীদের সেবা দিতে তারা প্রথম সারিতে নেমে কাজ করেছেন। সেবা দিয়ে চলছেন এখনও।

মা-মেয়ের একই কক্ষপথ

কলকাতা শহরের বুকে পিঙ্ক ট্যাক্সি চালান বিজয়গড়ের শম্পা নন্দী। কোভিডের অনেক আগেই তার গাড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল। কোভিডের সময় শহর কলকাতা দেখল তার অন্য রূপ। পিপিই পোশাক পরে তিনি প্রথম ঢেউ থেকেই কোভিড আক্রান্তদের ট্যাক্সি পরিষেবা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, যেদিন প্রথম বলা হয়েছিল কোভিড ডিউটি করতে, আমি রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো ভয় বা নার্ভাস লাগেনি। মানুষের দরকার, মানুষের পাশে দাঁড়াব। তাই আমি আর কিছু ভাবিনি।

নারী হিসেবে পিছিয়ে থাকতে রাজি নন তিনি। তাই নিরাপত্তা নিয়ে আপোস না করেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন কলকাতার অন্যান্য নারী গাড়িচালকদের সঙ্গে। আবার পেশাদার ক্যাব পরিষেবার বাইরে একজন মা তিনি। কোভিড ডিউটি করে মেয়ের রান্না থেকে সংসারের যাবতীয় তাকেই দেখতে হয়।

কখনো রান্না করতে করতে কোভিড রোগীর অনুরোধ এলে তাকে সব ফেলে বেরোতে হন। হয় না রান্না। প্রতিবেশী আর মেয়ে সামলে নেন সবকিছু। বয়সে ছোট হলেও নবম শ্রেণীর ছাত্রী অনন্য কুন্ডু বোঝে তার মায়ের দায়িত্ব। তাই মায়ের জন্য সে গর্বিত। তবে যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক ছিল, তখন শঙ্কিতও ছিল।

শম্পা বলেন, মেয়ের মনে তখন ভয় ছিল। কিন্তু আমি বুঝিয়েছি, প্রোটেকশন নিয়ে বোরোচ্ছি তো। ভয় করে লাভ নেই। সবাই ঘরে বসে থাকলে কাজ এগোবে কী করে?

শম্পা খেয়াল করেছেন, চিকিৎসাকর্মীদের মতোই কোভিডের সঙ্গে গাড়িচালকদেরও লড়াই কতটা কঠিন! প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে ভ্যাকসিনের জন্য তারাও অগ্রাধিকার পেলে ভাল হতো।

শিক্ষিকা যখন গাড়িচালক

ট্যাংরার বাসিন্দা টগরী শীল গাড়ি চালাচ্ছেন মাত্র সাত-আট মাস। তার মধ্যেই কোভিড রোগীদের বাহন চালানোর গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। জরুরি পরিষেবার কাজের সূত্রে যখনই ফোন আসে, বেরিয়ে পড়েন। এভাবেই রোজ কত অসহায় মানুষকে তার গাড়ি করেই পৌঁছে দিচ্ছেন হাসপাতালের দরজায়। কয়েক সপ্তাহ আগেও হাসপাতালে অক্সিজেন-ওষুধের পাশাপাশি বেডের সংকট আতঙ্কে ফেলেছিল সবাইকে।

ছাব্বিশ বছরের টগরী সেই সময়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান। ঢাকুরিয়ার এক নব্বই বছরের কোভিড আক্রান্ত বৃদ্ধকে নিয়ে সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটি শুরু হয়। কোথাওই বেড না মেলায় দিনভর চালক টগরীর ক্যাবেই তিনি অক্সিজেন নিতে থাকেন। একসময় মেডিকেল কলেজের ডাক্তাররাও টগরীর গাড়িতেই বৃদ্ধের চিকিৎসা করেন। এমন বহু ঘটনার সাক্ষী তিনি।

টগরী বলেন, একবার যখন ওই পিপিই কিটটা পরে ফেলি, তখন মাথায় আর কিছু থাকে না। এটা যুদ্ধক্ষেত্র আর আমি যোদ্ধা। রোগীকে বাঁচানো ছাড়া আর কোনো কিছুই ভাবতে পারি না।

ড্রাইভিং-এর পাশাপাশি টগরী একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলেও খণ্ডকালীন শিক্ষকটা করেন। সেখানে মিড-ডে-মিল দেওয়া থাকে। প্রশাসনিক কাজের দায়িত্বও পড়ে। তাই কখনো কখনো অনলাইনে স্কুলের ছাত্রীদের ‘হোম টাস্ক’ করাতে করাতেও কোভিড রোগীদের ট্যাক্সি পরিষেবা দিতে পারেন।

টগরী বলেন, এখন অনলাইন ক্লাস চলছে। ফলে আমি নোটস রেডি করে বেরিয়ে যাই। এমনও হয় গাড়ির মধ্যে থাকতে থাকতেই ছাত্রীদের সঙ্গে নোটস আদানপ্রদান করি, কথা বলে নেই।

কাজের মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভাল লাগে। তিনি বলেন, অনেক অসহায় পরিবারের ঔষধ কেনার টাকা থাকে না। তারা ক্যাবের ভাড়া দেবেন কী করে? মাঝেমাঝে তাদের পারিশ্রমিক ছাড়াই পৌঁছে দেই। তাতে অসুবিধা হয় না। এটুকু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে ভালই লাগে। [সূত্র: ডয়চে ভেলে বাংলা]


মন্তব্য