২৫ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৪৩

ম্যারাডোনাকে হারানোর তিন বছর

ম্যারাডোনাকে হারানোর তিন বছর  © সংগৃহীত

সর্বকালের সেরা ফুটবলার ব্রাজিলের পেলে নাকি আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা ফুটবলারের মধ্যে আলোচনাটা খুব বেশি সীমাবদ্ধ নেই। ১৯৮৬ সালের আগ পর্যন্ত আসনটা এককভাবে দখলে ছিল পেলের। কিন্তু ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে যে জাদু দেখিয়েছিলেন ম্যারাডোনা, তাতে করে সেই আসন ভাগাভাগি হয়ে যায়। এই দুইজনের বাহিরে ভবিষ্যতে আর কোনো দাবিদার আসবে কি না সন্দেহ।

কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। আজ থেকে ঠিক ৩ বছর আগে ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ফুটবল জগতে আছড়ে পড়ে শোকের কালো ছায়া। এ দিনই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ফুবলের অবিসংবাধিত নায়ক দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। ৬০ বছর বয়সে পৃথিবীর কাউকে কিছু না বলে ওপারে চলে গেলেও বিশ্ব ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়জুড়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল। 

১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস প্রদেশের লানুস শহরে জন্মগ্রহণ করেন আর্জেন্টাইন এই জাদুকর। সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটাই জীবনের বেশিরভাগ সময় বিশ্বকে মোহিত করেছেন। কখনো ফুটবলের সাহায্যে, কখনোবা মানবিক আচরণে আবার কখনো বিতর্কের শিরোনামে থেকে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে ম্যারাডোনা ছিলেন ফুটবলের মানুষ। 

ফুটবল ঈশ্বর আরমান্দো ডিয়াগো ম্যারাডোনা বিশ্বের শত কোটি ফুটবল ভক্তের চোখের আড়ালে চলে গেলেও তার নৈপুণ্যে ভরপুর জাদুকরি স্বপ্নিল ফুটবল স্মৃতি হৃদয়ে পরিপূর্ণ থাকবে কোটি কোটি ফুটবল দর্শকের। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল, এ ৭ বছর তিনি ফুটবলের আলো ছড়িয়েছেন ইতালির দল নাপোলিতে। ইতালি ও নাপোলির মানুষও তাকে চিরকাল ভালো বেসেছে নিজের ঘরের ছেলের মতো।

ডিয়েগো ম্যারাডোনা। চরম দারিদ্র থেকে উঠে আসা ছেলেটা আজ কিং অব ন্যাপলস।৫ জুলাই ১৯৮৪, ম্যারাডোনা যোগ দিলেন ন্যাপোলিতে ৭৫০০০ দর্শকের সামনে। প্রখ্যাত লেখক ডেভিড গোল্ডব্লাট বলেছিলেন সমর্থকরা প্রথম দিন থেকেই রক্ষাকর্তা বানিয়ে ফেলেছিলেন ম্যারাডোনাকে।

ম্যারাডোনা এমন সময়ে ন্যাপোলিতে আসেন যখন ইতালি ও বিশ্ব ফুটবল শাসন করছে চার ইতালিয়ান দৈত্য। এসি মিলান, ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস আর এএস রোমা। তবে ন্যাপোলিতে ম্যারাডোনার প্রভাব বাড়তে সময় লাগেনি। খুব দ্রুতই ব্রুসকোলোত্তির থেকে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড আসে ম্যারাডোনার হাতে। তাঁর অধিনায়কত্বেই প্রথম ইতালিয়ান লিগ আসে নাপোলির ঘরে। 

 

নাপোলি ছিল ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ। এই ক্লাবের হাত ধরেই উড়ান দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। এ ফুটবল তারকার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার গায়ে জড়ানো ১০ নম্বর জার্সি আর কোনো খেলোয়াড়কে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্লাব। তার মৃত্যুর পর নাপোলির ‘সাম পাওলো’ স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘দিয়েগো আরমানদো ম্যারাডোনা স্টেডিয়াম’।

১৯৮২ সালে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে নামেন ম্যারাডোনা। তবে, খুব বেশি আলো ছড়াতে পারেননি। ব্রাজিলের সঙ্গে লাল কার্ড দেখে দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। চার বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারো আর্জেন্টিনা। এবার আগের চেয়ে বেশি পরিণত ম্যারাডোনা। মেক্সিকোর সে বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই দুর্দান্ত খেলতে থাকে আলবিসেলেস্তেরা। 

কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। দু'দেশের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে খেলায় ছড়িয়ে পড়ে বাড়তি উত্তেজনা। ক্ষণে ক্ষনে রং বদলায় ম্যাচের ৫১ মিনিটে শূন্যে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে গোল করেন ম্যারাডোনা। হেডের ছলে তার হাতের টোকায় করা গোল এতটাই নিখুঁত ছিলো যে মাঠে থাকা রেফারি আলী বিন নাসেরও তা দেখতে পাননি। 

ইতিহাসে সে গোলেরই পরে নাম দেয়া 'হ্যান্ড অব গড'। ম্যাচে এরপর আরো একটি গোল করেন ম্যারাডোনা। যা ইতিহাসের গোল অব দ্য সেঞ্চুরি হিসেবে পরিচিত। সেমিফাইনাল ফাইনাল সব জায়গাতেই ম্যারাডোনা ছিলেন অনন্য। ফাইনালেতো পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা তাকে শুরু থেকেই কড়া মার্কিংয়ে রাখে।

কিন্তু তারপরও তার বাড়িয়ে দেয়া পাসে জয়সূচক গোল করেন বুরুচাগা। ৩-২ গোলের জয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। আসরে আর্জেন্টিনার ১৪টি গোলের ১০টিই অবদান ছিলো ম্যারাডোনার। আসরে সেরা ফুটবলারের পুরস্কার গোল্ডেন বলও জিতে নেন তিনি। ওই এক বিশ্বকাপ দিয়েই হয়ত আজীবন স্মরণ করা যায় ম্যারাডোনাকে। 

১৯৯৪ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা ও ম্যারাডোনার জন্য হয়ে থাকবে কলঙ্কময় এক অধ্যায়। নিষিদ্ধ মাদক এফিড্রিন নেয়ার দায়ে বিশ্বকাপ থেকে ম্যারাডোনাকে বহিস্কার করে ফিফা। দ্বিতীয় পর্ব থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। এ বিশ্বকাপের পর ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ম্যারাডোনা। পুরো ক্যারিয়ারে তিনি ৯১টি ম্যাচে ৩৪টি গোল করেন।

ফুটবলের দুনিয়ায় ম্যারাডোনা হলেন অবিনশ্বর এক ব্যক্তিত্ব। শুধু তিন বছর কেনো, প্রয়াণের শতবর্ষ পরও তার নাম জ্বলজ্বল করবে ফুটবল জগতে।