জার্মানিতে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে কীভাবে পড়বেন

স্কলারশিপ
জার্মানিতে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে কীভাবে পড়বেন?  © সংগৃহীত

জার্মানিতে পড়ার জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এখানে পড়াশোনার জন্য আসতে পারেন কয়েকভাবে। প্রথমেই www.daad.de/deutschland/studienangebote/studiengang/en ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারতে হবে। ওয়েবসাইটের বাঁ পাশের ঘরগুলোয় নিজের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শব্দ ইংরেজিতে বসিয়ে দিলে পছন্দের সাবজেক্টগুলো ডান পাশের ঘরে চলে আসবে। যে বিষয়টি পছন্দ হবে, সেখানে ক্লিক করলে বিস্তারিত সবকিছু চলে আসবে। সেখানে নিজের যোগ্যতা যাচাই করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় কী চাইছে, শিক্ষার্থীর কতটুকু যোগ্যতা আছে, সে বিষয়গুলো বিস্তারিত জানা যাবে। এ ক্ষেত্রে কোর্স কো-অর্ডিনেটরকে ই–মেইল করেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

জার্মানিতে ভর্তির জন্য দুই ধরনের পদ্ধতি চালু আছে। একটি হচ্ছে ওপেন অ্যাডমিশন, অন্যটি অ্যাপটিউড টেস্ট। প্রথমটির ক্ষেত্রে শুধু ব্যাচেলরের ফলাফল ও অন্য কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করে ভর্তি নেওয়া হয়। অন্যটিতে কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি অনলাইনে পরীক্ষাও দিতে হয়। তাই চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ওপেন অ্যাডমিশন পদ্ধতিটিই ঝামেলামুক্ত।

পড়ার ভাষা
জার্মানিতে সাধারণত দুই ভাষাতে পাঠ দান করা হয়ে থাকে—জার্মান ও ইংরেজি। যদি কেউ জার্মান ভাষায় মাস্টার্স করতে চান, সে ক্ষেত্রে বি১ পর্যন্ত ভাষা কোর্স সম্পন্ন রাখা বাধ্যতামূলক। এই কোর্স ঢাকা (জার্মান ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র) থেকে করা যায়। তবে কেউ ইংরেজিতে মাস্টার্স করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ইংরেজি ভাষার সনদপত্র বিভিন্ন রকম চেয়ে থাকে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় যদি দেখে শিক্ষার্থীর ব্যাচেলরের পাঠদানের মাধ্যম ইংরেজি, তখন অনেক সময় আইইএলটিএস চায় না। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আইইএলটিএস বা টোয়েফলের উচ্চ স্কোরের সঙ্গে সঙ্গে জিআরই-ও চায়। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ঢুকে (Requirements for admission সেকশনে) যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিষয়ে মাস্টার্স করার জন্য আবেদন করছেন, তা যেন আপনার ব্যাচেলরের অধ্যয়িত বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এর জন্য আপনি আবেদন করার আগে কোর্স কো-অর্ডিনেটরকে একটি ই–মেইল করে আপনার ব্যাচেলরের অধ্যয়িত বিষয় নিয়ে একটু ধারণা দিতে পারেন। যেমন আপনি ব্যাচেলরে কী কী বিষয় পড়েছেন, সঙ্গে আপনার অর্জিত সিজিপিএ উল্লেখ করে দেবেন। তাঁর কাছে আরও জানতে চাইবেন, তাঁর ওই বিভাগে আপনি মাস্টার্স করার জন্য উপযুক্ত কি না। দেখবেন তিনি দু-এক কর্মদিবসের মধ্যেই ই–মেইলের রিপ্লাইয়ে বলে দেবেন কী কী করতে হবে বা আপনি আবেদন করার যোগ্য কি না।

আবেদনের পদ্ধতি
জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত দুভাবে আবেদনের পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকে—

১.
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বয়ং কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে আবেদন করা যায়।

২.
ইউনি অ্যাসিস্ট নামের সংস্থা শিক্ষার্থীর কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করে এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য খরচ করতে হয় ৭৫ ইউরো (আনুমানিক সাড়ে সাত হাজার টাকা)। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ক্ষেত্রে পরের প্রতিটির জন্য ৩০ ইউরো (আনুমানিক তিন হাজার টাকা) করে দিতে হয়। বর্তমানে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই এই সংস্থার মাধ্যমে ভর্তি প্রসেস করে থাকে। জার্মানির কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার জন্য প্রসেসিং ব্যবস্থা মূলত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়—

অ্যাডমিশন লেটার প্রাপ্তি
আপনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডমিশন লেটার পেয়েছেন মানে এই নয়, আপনি জার্মানিতে আসতে পারবেন। আপনাকে এরপর পরবর্তী ধাপের জন্য অর্থাৎ জার্মান ভিসার ধাপটিও পাড়ি দিতে হবে। ভিসা প্রাপ্তি হচ্ছে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আসার শেষ ধাপ। ভিসা পেয়ে গেলেই জার্মানিতে আসার সব পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল।
প্রথমেই আসা যাক অ্যাডমিশন লেটার প্রাপ্তির জন্য কী কী করণীয়—

১.
প্রথমেই ইউনি অ্যাসিস্ট ওয়েবসাইটে ঢুকে নিজের নামে একটি আইডি খুলতে হবে। তারপর যেখানে আবেদন করবেন সেই বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবজেক্ট সেকশনে ঢুকে নির্ভুল তথ্যগুলোই ফরমে লিপিবদ্ধ করতে হবে। এখানকার আপলোড সেকশনে নিজের যাবতীয় সনদ, ভাষার সনদ, মোটিভেশন লেটার সংযুক্ত করতে হবে। ফরমটি অনলাইনে সাবমিট করলে অটো পিডিএফ কপি জেনারেট হবে। সেই ফরম প্রিন্ট করে নির্ধারিত জায়গায় স্বাক্ষর করতে হবে।

২.
বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটে ক্লিক করে পছন্দের সাবজেক্টের পেজে ঢুকে আবেদনপত্র ডাউনলোড করে প্রিন্ট দিতে হবে। সেটা নিজ হাতে পূরণ করতে হবে অথবা অনলাইনে পূরণ করে অটো জেনারেটেড পিডিএফ কপি প্রিন্ট করে নির্ধারিত স্থানে স্বাক্ষর করতে হবে।

৩.
যেখানে ব্যাচেলর সম্পন্ন করেছেন, সেই বিভাগের দুজন, ক্ষেত্রবিশেষে তিনজন প্রফেসরের (সহযোগী বা সহকারী প্রফেসর হলেও হবে) থেকে রিকমেন্ডেশন লেটার নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অফিশিয়াল প্যাড ব্যবহার করতে হবে। রিকমেন্ডেশন লেটারে অবশ্যই সিলেক্টেড সাবজেক্টের নাম ও কোথায় পড়তে যাবেন, সেটা উল্লেখ থাকতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক তাঁকে সেখানে পড়তে যেতে উৎসাহ প্রদান করছেন, সে বিষয়টিও লক্ষ রাখতে হবে।

৪.
ব্যাচেলরের সার্টিফিকেট, ট্রান্সক্রিপ্ট, আইইএলটিএস সার্টিফিকেট ও এসএসসির সার্টিফিকেট কোনো সরকারি উকিল থেকে নোটারি করতে হবে অথবা জার্মান দূতাবাস থেকে সত্যায়িত করিয়ে নিতে হবে।

৫.
একটি মোটিভেশনাল লেটার লিখতে হবে। স্যাম্পল কপি গুগলে সার্চ দিলেই পাওয়া যায়। এখানে যে বিষয়ে পড়তে যাবেন, সেই বিষয়টার ভালো লাগা–ভালোবাসার কথাগুলো সাজিয়ে–গুছিয়ে লিখতে হবে। লেখাগুলো যেন তৈলাক্ত না হয় এবং অনুপ্রেরণামূলক হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

৬.
ইউনি অ্যাসিস্ট ওয়েবসাইটে টাকা পাঠানোর জন্য ওয়েবসাইটে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ডিটেইল উল্লেখ করা আছে। আবেদনপত্রসহ পাসপোর্ট নিয়ে যেকোনো ব্যাংকের বৈদেশিক বিনিময় শাখায় যেতে হবে। সেখান থেকে ৭৫ ইউরোর সমপরিমাণ টাকা ইউনি অ্যাসিস্টের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে। একটা প্রুফ কপি সেখান থেকে নিয়ে নিতে হবে। এখানে টাকা পাঠানোর দিকনির্দেশনা ব্যাংক কর্তৃপক্ষই দিয়ে দেবে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট কার্ড (মাস্টার কার্ড, ভিসা কার্ড, পেপল) থাকলে সহজেই এই টাকা ট্রান্সফারের জটিলতা অবশ্য এড়ানো যায়।

৭.
কাগজগুলো নিচের সিরিয়াল অনুযায়ী সাজাতে হবে।
ক. টাকা পাঠানোর প্রুফ কপি।
খ. ইউনি অ্যাসিস্টের আবেদনপত্র।
গ. বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনপত্র।
ঘ. ব্যাচেলরের সনদপত্র, ট্রান্সক্রিপ্ট ও এসএসসির সনদপত্রের নোটারাইজড বা সত্যায়িত কপি।
ঙ. মোটিভেশন লেটার।
চ. রিকোমেন্ডেশন লেটার দুটি বা তিনটি।
ছ. বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইংরেজি মাধ্যমের কপি (যদি থাকে)।
জ. আইইএলটিএসের নোটারাইজড বা সত্যায়িত কপি।

কাগজগুলো স্ট্যাপল বা জেমসক্লিপে আটকে একটি এ৪ সাইজের মোটা খামে ভরে ইউনি অ্যাসিস্টের নির্ধারিত ঠিকানায় (ইউনি অ্যাসিস্টের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে) পাঠাতে হবে। তবে সরকারি পোস্ট ব্যবহার না করে ডিএইচএল বা ফেডএক্সে কুরিয়ার করলে আবেদনপত্র কখন কবে পৌঁছাল, সেটা ট্র্যাক করে জেনে আশ্বস্ত হওয়া যায়। আপনার লেটার ও টাকা ইউনি অ্যাসিস্টে পৌঁছানো মাত্র আপনাকে ই–মেইল করে ইউনি অ্যাসিস্ট নিশ্চিত করবে।

তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ইউনি অ্যাসিস্ট আপনাকে দুটি ই–মেইল করে আবেদনের ব্যাপারে আপডেট দিয়ে আশ্বস্ত করবে। প্রথম ই–মেইলটি ব্যাচেলরের ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট অর্থাৎ জার্মান গ্রেডে আপনার রেজাল্ট কেমন। দ্বিতীয় ই–মেইলটি বলবে যে আপনার কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর সব ঠিক থাকলে দু-এক মাসের মধ্যেই আপনি অ্যাডমিশন লেটারটি পেয়ে যাবেন।

লেখক: গবেষক (প্রফেসরশিপ), মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স, হালে, জার্মানি। [email protected]


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ