খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আর কখনও ক্যাম্পাসে ফিরবেন না তারা

না ফেরার দেশে চলে গেছেন খুুবির ছয় প্রিয় মুখ
করোনার দীর্ঘ বন্ধে না ফেরার দেশে চলে গেছেন খুুবির ছয় প্রিয় মুখ  © টিডিসি ফটো

‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে..., আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে, তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।’ রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের এই কবিতার মত তারা অভিমান করে কখনো বলতে পারবেন না যে, বেঁচে থাকতে যাদের সাথে সময় কাটতো, না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর তারা ভুলে গেছে।

বলছিলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ছয়টি প্রিয় মুখের কথা, যারা গত দেড় বছরে করোনার বন্ধে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকার সময়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। করোনার এই দীর্ঘ বন্ধে মারা গেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষক এবং চারজন শিক্ষার্থী। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে সশরীরে খুলছে ক্যাম্পাস, কিন্তু তারা আর ফিরবেন না। আর তাই এই প্রিয় মানুষদের স্মৃতিচারণ করে এখনও কষ্ট পান বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা। 

বন্ধু, সহপাঠী, সহকর্মী, স্বজন এবং শিক্ষক- সবাই তাদের মনে রেখেছেন। এখনও অবসর সময়ে স্মৃতিচারণ করেন। মনের আবেগ আর ভালবাসা প্রকাশ করেন কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কখনওবা একান্তে নিজেদের প্রার্থনায়। তারা জানান, হাসি খুশি, আড্ডা দিয়ে যাদের সাথে আগে সময় কাটিয়েছি ক্যাম্পাস খুললে তাদেরকে আর চিরচেনা আড্ডায় ফিরে পাবো না।

শারীরিক অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন দুই শিক্ষক:

বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শামীম মাহবুবুল হক গত ১৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯টায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট ও বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. শামীম আখতার (৪৫) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গত ৯ জুলাই রাতে। তিনি খুলনার সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

আত্মহত্যা করে মারা গেছেন দুই শিক্ষার্থী:

ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিসিপ্লিনের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আফসানা আফরিন সুমি (১৯)। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নিজ বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। সুমি খুলনার ফুলবাড়ি গেট মিরেরডাঙ্গা এলাকার ইউনুচ আলীর মেয়ে।

চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিনের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম। গত ৩ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জ জেলা শহরের দক্ষিণ সেওতা এলাকায় নিজ বাড়িতে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেন তিনি। প্রেমঘটিত সম্পর্কে অবনতির কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে জনা গেছে। মৃত্যুর আগে এক চিরকুটে তিনি লিখে গেছেন, ‘আমার পরিচিত মানুষগুলোকে আমার মৃত্যুর খবরটা জানিয়ে দিও।’

শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু:

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী (১৯ ব্যাচ) মো. রিফাত হোসেন গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা যান। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিন সাবেক ছাত্র এস এম ফরহাদ হাফিজ নিশু (১৫ ব্যাচ) মারা যান গত ৫ জুন সকালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরসায়েন্সেস ও হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই শিক্ষার্থী অসুস্থ থাকাকালীন তার মা মারা যান এবং একই সাথে তার বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সব মিলিয়ে মৃত্যুর আগে তিনি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েন। 

তাদের স্মৃতিচারণায় সহপাঠীরা:

মো. রিফাত হোসেনের সহপাঠী সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী পিংকি বাইন। তিনি বলেন, যাদের হারিয়েছি তাদের মধ্যে খুব কাছের একজন মানুষ ছিল রিফাত। বড্ড অসময়ে চলে গেছে সে। যখনই ক্লাসরুমের কথা ও আড্ডার কথা মনে পড়ে, তখন কেন জানি শূন্যতা অনুভব করি। কেন জানি বিশ্বাস হয় না রিফাত আর নেই আমাদের মাঝে।

পিংকি বলেন, বহু কথা তাকে বলা হয়নি। রিফাত আর ফিরে আসবে না কথাটি ভাবতেই অনুভব করি এক অন্যরকম কষ্ট, হাহাকার। একইসাথে অভাববোধ করি ‘এই বুন্ডি’ বলে ডাকা ভাইয়ের আকর্ষণীয় কণ্ঠের। দুঃখিত বন্ধু! মৃত্যুর পরে আর কিছু আছে কি না জানি না, যদি থাকে অবশ্যই ভালো থাকবে রিফাত।

ভাষ্কর্য ডিসিপ্লের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী খান মেহতা স্মৃতিচারণ করেন তার বন্ধু আফসানা আফরিন সুমির। মেহতা  বলেন, গত ৬ ফাল্গুনটা অন্যদিনের থেকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ছিল, আকাশে ছিল ঝলমলে রোদ। কিন্তু এর মাঝে যে বিষাদের সুর নেমে আসবে কে জানতো? প্রিয় বন্ধু আফসানা সুমির সুইসাইডের খবর পেলাম। এক মূহুর্তে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।

সদা হাস্যোজ্জল আফসানা সবার বিপদে এগিয়ে আসতো কোনো স্বার্থ ও কারণ ছাড়াই। এজন্য তাকে বেশি ভাল বন্ধু ভেবে আপন করে নিয়েছিলাম। দীর্ঘ করোনাকালীন সময়ে সবাই দূরে থাকায় অনলাইনে আড্ডা দিতাম। এভাবেই আমাদের সময় কাটতো। তবে মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করি। ব্যক্তিগত কারণকে কখনো সে সামনে নিয়ে আসেনি। যার ফলে সব কষ্ট, অভিমান নিয়েই চলে গেল না ফেরার দেশে।

করোনা না থাকলে সম্ভবত এমন হত না। অথচ করোনা শেষে যখন ক্যাম্পাস খুলছে আমাদের আড্ডা, গল্প করার কথা ছিল। হাসিখুশিতে পুরো ক্যাম্পাসে পূর্বের মত ঘোরাঘুরি করতাম। এখন আর সেটা সম্ভব নয়। তাকে ছাড়াই ফিরতে হবে। যেখানেই থাকিস, ভাল থাকিস। তোকে কখনো ভুলে যাবো না, বলেন মেহতা।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ