০৬ মে ২০২০, ১৪:০৬

করোনায় ঘরবন্দি দিনগুলো যেমন কাটছে চবি শিক্ষার্থীদের

  © টিডিসি ফটো

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে লকডাউন অবস্থা বিরাজ করছে বিশ্বে। এই ভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে নিষ্কৃতি পায়নি বাংলাদেশও। দিন দিন বেড়েই চলেছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। ঘরবন্দি অবস্থায় শিক্ষার্থীদের এই দিনগুলো কেমন কাটছে- এ নিয়ে চবির কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস। লিখছেন রোকনুজ্জামান-

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এজাজ আহমেদ নিশান। ঘরবন্দি হয়েও অব্যাহত রেখেছেন তার সাংস্কৃতিক চর্চা। তিনি বলেন, আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এখন অনলাইনেই করতে হচ্ছে। সাংস্কৃতিক দলের সদস্যদের সাথে কথা হচ্ছে। অনলাইনেই গান, আবৃত্তি, আড্ডা সবই চলছে।

পরিবারের সাথে বাসায় বন্দি দিনগুলো বেশ ভালো কাটছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে নির্ধারিত ছুটির দিনগুলো ছাড়া খুব একটা বাসায় আসা হয়নি। করোনার কারণে বাসায় থেকে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের জায়গা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মায়ের সাথে। মাকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করছি। যান্ত্রিকতার বেড়াজাল থেকে একদম বের হয়ে এসেছি। বন্দি দিনগুলো পরিবারের সদস্যদের আরও কাছে এনেছে যেটা ক্যাম্পাসে থাকাকালীন বুঝতে পারতাম না।

তবে এই অবসর সময়টাকে বিভিন্ন উৎপাদনশীল কাজে লাগাচ্ছি। বিভিন্ন রকম বই পড়ার পাশাপাশি বাড়ির আশেপাশের পতিত জমিতে শাক সবজির বীজ বুনেছি, মরিচের চারা, বেগুনের চারা, পুঁইশাকসহ বেশ কয়েকটি সবজির চারা রোপণ করেছি। এই মহামারীর ব্যাপ্তিকাল এখনও বলা যাচ্ছে না। তাই এই সময়ে যাদের সুযোগ রয়েছে অন্তত তারা যেন তাদের পতিত জায়গাগুলো ফেলে না রাখে। অন্তত এসব করলেও খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে না।

তিনি আরও বলেন, এই সময়টা শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। সময়গুলোকে কাজে লাগানোর সঠিক সময়। পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক হবে তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে পরীক্ষার জন্য যেন বাড়তি চাপ না নেওয়া লাগে, তাই এই সময়ে একাডেমিক পড়ালেখা গুছিয়ে রাখাটা জরুরি। যেহেতু অনেক সময় পাওয়া যাচ্ছে, বিভিন্ন চাকরি সম্পর্কিত বই পড়া যেতে পারে। ভালো ক্যারিয়ারের জন্য এই সময়টা অবশ্যই আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

এরূপ পরিস্থিতিতে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সাহায্য-সহায়তা ও সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী। এলাকায় করোনাভাইরাস সচেতনতায় প্রচারে মাইকিং, পাড়ার যুবকদের সাথে নিয়ে ইউনিয়নের হাট-বাজারগুলোতে জীবাণুনাশক ঔষধ ছিটানো, জনসাধারণের মধ্যে মাস্ক বিতরণ, দরিদ্র পরিবারের মাঝে ইফতার সামগ্রী বিতরণ ও অসহায় পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণও করছেন।

করোনাভাইরাসের সময়গুলো দ্রুত কেটে যাবে প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, মানুষ আবার প্রাণ ভরে শ্বাস নিক, মাস্কের বদলে আবার রাস্তার মোড়ে মোড়ে গোলাপ বিক্রি হোক। খুব দ্রুত যেন আমরা সবাই আবার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসি এটাই সৃষ্টিকর্তার কাছে চাওয়া।

করোনার ভয়ার্ত থাবার কথা উল্লেখ করে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আইনুন নাহার বলেন, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী চলছে নিস্তব্ধ প্রাণের ভাটা। সেই সাথে বেড়ে যাচ্ছে মৃত্যুর আলোক বার্তা। সে বার্তায় আজ কানে আসছে, আমার মাতৃভূমিরও অসহায়ত্ব মনোভাব। যেখানে অগণিত মানুষের কোলাহল বিরাজ করেছিল, সেখানে আজ নিস্তব্ধতার বরফ। এই বরফ এতোই কঠিন আকার ধারণ করে বসে আছে, তাকে স্থানচ্যুত করা কিংবা ভেঙ্গে ফেলা এক প্রকার আকাশ কুসুম কল্পনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে সেখানকার প্রাকৃতিক মনরম পরিবেশ আমাকে মুগ্ধ করে রাখতো প্রতিটা মুহূর্ত। আর কিছুদিনের পার্থক্য কেমন ব্যবধান করে দিলো। এখন ভাবতে গেলেও হৃৎপিণ্ডে খানিকটা আঘাত পায়।

তিনি আরও বলেন, এই লকডাউনে পরিবারের কাছে থেকেও এতোটা নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আটকে থাকতে হবে, তা ভাবিনি। প্রতিটা বিকাল এখন একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে নেমে যায়। এই সময়ই দেখতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে পাহাড়ের চূড়া স্পর্শ করে ডুবে যাওয়া সূর্যের রক্তিম আভা। কিন্তু এই কয়েক দিনের ব্যবধানে আকাশ দেখাও আমার কাছে অলীক স্বপ্ন মনে হচ্ছে। এখন তো মনে হচ্ছে আকাশের রঙও ভুলতে বসেছি। সারাদিন কাটছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। এতো দিনও আমাকে ভাবতে হয়নি, এমন দিনগুলো কী করে পার করবো। কিন্তু ক্রমেই একটা বিষাদ ঘনীভূত হচ্ছে!

দিনের সময়টা বিভিন্নভাবে ভাগ করে নিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। জানালেন, পবিত্র রমজান মাস হওয়ায় এই সময়টা বিভিন্নভাবে ভাগ করে নেওয়া আরও সহজ হয়ে উঠেছে। দিনের একটা সময় পবিত্র কোরআন পড়ছি, পরিবারের কাজে মাকে সাহায্য করছি। বিভিন্ন তথ্যের জন্য পুরাতন কিছু বই নিয়ে পড়াশোনা করছি। বিশেষ একটা কথা বলা হয়নি এখনও, কাঁথা সেলায় করাও শিখছি। এই সবকিছু করার মূল লক্ষ্য সময়টা পার করা। এই কারণে বলা যায়, কঠিন সময় মানুষের সেরা গুণটা বের করে আনে। যে কাজগুলো কঠিন মনে হতো, তাও এখন শিখছি কিংবা করছি।

আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য করলাম, এই আতঙ্কের মধ্যে সবার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন, ‘সময় কাটছে কী করে?’

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ অর্ণব। করোনাভাইরাসে বাড়ি থাকার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ একটি বিষয় করোনাভাইরাস। মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে এই ভাইরাসটির ভয়াবহতা সারা বিশ্ববাসীকে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে উপনীত করেছে। এই মহামারীর সমসাময়িক চরিত্র যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনযাপনের মতই অসহায়।

একটু স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ততা নেই, অবকাশের মরুভূমির মধ্যে সেই ব্যস্ততা যেন পরিণত হয়েছে আশ্চর্য রকমের এক মাদকতায়। আগে যেই সময় ক্লাস শেষ করে বন্ধুরা মিলে একসাথে আড্ডা দিতাম, এখন সেই সময় কাটে ফেসবুকে নিউজ ফিড স্ক্রল করে কিংবা মোবাইলে গেম খেলে। আগেকার দিনে কর্মব্যস্ততার মধ্যে একটু সময় পেলেই ঘুরতে যেতাম বন্ধুদের নিয়ে। আর এখন অফুরন্ত সময়, অথচ বের হবার অবকাশ নেই! মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসহীন নিজেকে বড্ড বোঝা মনে হয়। আড্ডা নেই, নেই গল্প, গানের আসর, ফুচকা, কিছুই নেই। চারদিকটা কেমন ধোঁয়াটে ধূসর, যেন প্রাত্যহিক প্রাণচাঞ্চল্যের সবটুকু লুটিয়ে পড়েছে অজানা কোন বর্ণহীন বিভীষিকায়।

এই একঘেয়েমি থেকে মুক্ত হতে প্রতিদিনই নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা করছেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই শিক্ষার্থী। বলেন, কখনও নতুন কোন রান্নার রেসিপি শিখছি, কখনও ছাদের টবে সবজি লাগাচ্ছি। আর অবকাশের বড় একটা সময় যাচ্ছে টিভি দেখে। ছোট বোনের সাথে খুনসুটি করে কেটে যায় অনেকটা সময় আর কিছু সময় কাটে মায়ের সাথে গল্প করে।

মাঝে মাঝে ভাবি, মাত্র কয়েকমাস লকডাউনে থেকে আমাদের এই হাল, অথচ আমাদের মায়েরা তো বলতে গেলে সারাবছরই ঘরবন্দি থাকেন। কই, তারা কিছু বলেন না তো? এসব ভাবতে ভাবতেই দিন কেটে যাচ্ছে, প্রহর গুনছি প্রতীক্ষার। কবে কাটবে আমাদের এই হাহাকার?

চবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আমেনা বেগম বলেন, বাসায় বন্দি দিনগুলো যদিও ততোটা ভালো লাগছে না, তারপরও দুর্বিষহ এই সময়ে বাসায় প্রিয়জনদের কাছাকাছি আছি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না একে অপরের সাথে ভাগাভাগি করতে পারছি। এতেই এক প্রকার স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছি।

এই অবসর সময়গুলো যেন নষ্ট না হয় সেজন্য পাঠ্যবই, পাঠ্যবই বহির্ভূত বই পড়ছি, নতুন নতুন রান্নার রেসিপি শিখছি। মাঝে মাঝে কবিতা লেখার চেষ্টাও করছি।

প্রতিদিন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে মনের মধ্যে দুশ্চিন্তা বিরাজ করছে আমেনা বেগমের। বলেন, যেহেতু পরিস্থিতি ভয়াবহ তাই আমাদের সবার উচিত নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন থাকা। তাই বলবো, ঘরে থেকে নিরাপদে থাকুন, নিজের পরিবার ও দেশকে সাহায্য করুন।

বাংলা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর কারণে গত ১৮ এপ্রিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে বেশ কিছু দিন যাবত গ্রামেই অবস্থান করছি। এদিকে করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় এই সাময়িক ছুটি অনির্দিষ্টকালে মোড় নিয়েছে।

কিন্তু এই সময়টাকে অবহেলায় না কাটিয়ে কিভাবে ফলপ্রসূ করা যায় সেজন্য কিছু কাজও করছি। যেমন- অনেক বই পড়ছি, শরীর চর্চা করছি, অনলাইনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখি, দেশের ও দেশের বাইরের খবরাখবর জানার চেষ্টা করছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে অনলাইন কোর্স করি ইত্যাদি। এভাবেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে ঘরে আছি। তেমন কোনো সমস্যা না হলেও বন্দি হয়ে থাকতে হচ্ছে সারাদিন। একটু একঘেয়েমি লাগার উপক্রম হচ্ছে।

আমাদের গ্রামটি শহর থেকে অনেক দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাই খুব একটা লোক সমাগম চোখে পড়ে না। এজন্য এ অঞ্চলে এখনও পর্যন্ত কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি। একমাত্র জনসচেতনতায় পারে আমাদেরকে এই মহামারী থেকে মুক্তি দিতে। তাই আসুন, ভয় না পেয়ে প্রতিরোধ করি।