২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:২৭

বেরোবি শিক্ষক তাবিউরের নিয়োগ বাতিলে আইনি বাধা নেই, ফেরত দিতে হবে বেতন-ভাতাও

তাবিউর রহমান প্রধান  © টিডিসি সম্পাদিত

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাবিউর রহমান প্রধানের অবৈধভাবে নিয়োগ ও পদোন্নতির সত্যতা পাওয়ায় তার নিয়োগ বাতিলের ‍সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একদিন প্রাপ্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার সমপরিমাণ অর্থ ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। তদন্ত কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৮তম সিন্ডিকেটে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে বলা হয়, তাবিউর রহমান প্রধানের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি বিধিমালা-২০১৮ (শৃংঙ্খলা ও আপিল) অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টার মতামত গ্রহণপূর্বক এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেওয়া হয়। তারই প্রেক্ষিতে তাবিউর রহমানের চাকরি বাতিলে আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই বলে সুপ্রিম কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানেল আইনজীবী মতামত প্রদান করেছেন।

সিন্ডিকেটের স্বাক্ষরিত রেজ্যুলেশনের কপি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহাদাৎ হোসাইনের ১২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত আইনি চিঠিটি আজ েএ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

জালিয়াতি করে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে তাবিউর রহমান প্রধান চাকরি করে যাচ্ছেন এ অভিযোগ তদন্তে গত বছরের ২৮ জুন ১১৩তম সিন্ডিকেটে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। ১১৮তম সিন্ডিকেটে ১১তম আলোচ্যসূচি হিসেবে ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেরিত চিঠি (স্মারক বেরোবি/রেজি: ২০২৪/২৭৬৬, তাং ২১/১২/২০২২) এর প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহাদাৎ হোসেন তার চিঠিতে বলেন, নিয়োগ বাছাই বোর্ডের সুপারিশপত্রে মো. তাবিউর রহমানের ‘নিয়োগের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি’ এবং ১৪ জানুয়ারি ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ২১তম সভায় তার নিয়োগ সুপারিপশত্রের পরিপন্থী বলে প্রতীয়মান হয়। আইনি চিঠিতে তার সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিও বিধিসম্মত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘জালিয়াতি’ করে ১৩ বছর ধরে বেরোবির শিক্ষক, তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তাবিউর রহমান প্রধান প্রভাষক থাকা অবস্থায় ওই পদে স্থায়ী হওয়ার পূর্বেই ১২ জুন ২০১৬ সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। অথচ তার এ প্রভাষক পদ স্থায়ীকরণ হয় ২৯ অক্টোবর ২০১৬, যা বিধি সম্মত হয়নি। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ বিভাগীয় প্রধান তাসনীম হুমাইদার মেয়াদ শেষ হলে বিভাগের কোন শিক্ষকের পরিবর্তে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ নিজেই বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে ‘বিশেষ উদ্দেশ্যে’ ৪ মার্চ ২০২১ প্লানিং কমিটির জুম মিটিংয়ে ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ তাবিউর রহমানকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুপারিশ করেন। ৭ মার্চ ২০২১ ঢাকার লিয়াজোঁ অফিসে পদোন্নতি বোর্ড এবং সিন্ডিকেটের ৭৭তম জরুরি সভায় অনুমোদন একই দিনে হওয়া স্বাভাবিক ছিল না।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, সার্বিক বিষয় এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করে মো. তাবিউর রহমানের নিয়োগ, পদোন্নতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৮তম সিন্ডিকেটের বর্ণিত বিষয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বিবেচনাক্রমে ২০১৮ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপিল) বিধিমালা অনুসারে তাবিউর রহামানের শিক্ষক পদ থেকে চাকরিচ্যূত করা এবং তাকে প্রদত্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ ফেরত প্রদানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিশ্ববিদালয় কর্তৃপক্ষের কোন প্রকার আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যায়ের প্যানেল আইনজীবী মো. শাহাদাৎ হোসেন জানান, বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এক্ষুনি তাবিউর রহমানকে চাকরিচ্যূতির চিঠি ইস্যু করতেও কোন আইনগত বাধা নেই।

তাবিউর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনয়নকারী একই বিভাগের শিক্ষক মাহামুদুল হক বলেন, চাকরিচ্যূতিতে আইনগত বাধা না থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে বিদায় করা হচ্ছে না তা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যাপার। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ একদিনে তদন্ত করে পরদিনই বহিষ্কার করা হয়, আর অবৈধ প্রমাণিত হওয়ার পরও শিক্ষককে বরখাস্ত করতে মাসের পর চলে যায়। সাধারণত এমন গুরুতর অভিযোগ তদন্তকালীন সকল দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় অভিযুক্তকে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় সে কাজটি করেনি। তাকে দ্রুত বিদায় না করলে বিভাগীয় প্রধান ও পরীক্ষা কমিটির সভাপতি থেকে সে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনেক ক্ষতি করতে পারে। এমন কিছু ঘটলে তার দায় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজপত্র অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৯ অক্টোবর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের জন্য অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদে একটি এবং সহকারি অধ্যাপক/প্রভাষক দুটি স্থায়ী পদে বিজ্ঞাপন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে তাবিউর রহমান প্রধানসহ মোট ২২ জন প্রভাষক পদে দরখাস্তকরেন। পরের বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রভাষক পদের জন্য বাছাই বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। বাছাই বোর্ড যথাক্রমে মোহা. মাহামুদুল হক ও নিয়ামুন নাহারকে অপেক্ষমাণ তালিকায় রেখে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু বাছাই বোর্ডের সুপারিশপত্রে দেখা যায়, কম্পিউটারে প্রিন্টকৃত ১ ও ২ নম্বর সিরিয়ালের পরে ৩ নম্বর সিরিয়াল হাতে-কলমে লিখে অপেক্ষামাণ তালিকায় তৃতীয় হিসেবে তাবিউর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করে জালিয়াতি করা হয়েছে।

বাছাইবোর্ডের সুপারিশপত্রে দেখা যায়, কম্পিউটারে কম্পোজকৃত ‘মেধাক্রমানুসারে’ শব্দটি কলম দিয়ে কেটে ‘যেকোন’ শব্দটি লেখা হয়েছে সুপারিশপত্রে। ওই সুপারিশপত্রে বলা হয়েছে: ‘চূড়ান্তভাবে মনোনয়নপ্রাপ্ত আবেদনকারী ওই বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করতে অপারগ হলে অপেক্ষামান তালিকা থেকে প্রথমজনকে নিয়োগ করার সুপারিশ করা হলো। অপেক্ষামান তালিকার প্রথম জন যোগদানে অপারগ হলে অপেক্ষমান তালিকার দ্বিতীয় জনকে নিয়োগ করার জন্য সুপারিশ করা হল।’ অপেক্ষামান তালিকার তৃতীয়জন তাবিউর রহমান সর্ম্পকে কিছুই বলা নেই কারণ ওই সিরিয়াল ছিল না এজন্য যে দু’টি পদের বিপরীতে দুজনকে অপেক্ষামান তালিকায় রাখা হয়েছে। এরপর ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ২১তম সিন্ডিকেট অপেক্ষামান তালিকায় দুইজনের পরিবর্তে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্ন্তভুক্ত তৃতীয়জন তাবিউর রহমানের নাম অনুমোদন করা হয় এবং বলা হয় নিচের তালিকা থেকে ‘যে কাউকে’ নিয়োগ দেওয়া যাবে। সিরিয়াল রাখা হয় ১. মোহা. মাহামুদুল হক ২. নিয়ামুন নাহার ৩. তাবিউর রহমান প্রধান।

উল্লেখ্য যে, নিয়োগের জন্য মেধাতালিকায় তিনজন এবং অপেক্ষামান তালিকায় সেই তিনজনকে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ২২তম সিন্ডিকেটে যেকাউকে শব্দটি বাতিল কিন্তু অবৈধভাবে অপেক্ষমান তালিকায় সিরিয়াল পরিবর্তন করা হয়। এতে মেধাতালিকার প্রথমজন যোগদান না করায় তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। এছাড়াও বিভাগীয় প্রধান ও ডিনের চাহিদার প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত দুইজন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয় এবং অনুমোদন দেওয়া হয় ২১তম সিন্ডিকেটে। ২২তম সিন্ডিকেটে অনুমোদনপ্রাপ্ত ‘যে কাউকে’ শব্দটি সিন্ডিকেট সদস্যদের আপত্তির কারণে বাতিল করা হয়। অর্থাৎ অপেক্ষামান তালিকার প্রথমজন মোহা. মাহামুদুল হক এবং দ্বিতীয়জন নিয়ামুন নাহার নিয়োগ পান ২১তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। কিন্তু সেখানেও জালিয়াতি করা হয়। এতে নিয়োগের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ২জন শিক্ষকদের নাম লেখার সময় প্রথমজন হিসেবে তাবিউর রহমান প্রধান এবং দ্বিতীয়জন হিসেবে নিয়ামুন নাহার-এর নাম লেখা হয়। অপেক্ষমান তালিকায় প্রথম মোহা. মাহামুদুল হকের নাম বাদ দিয়ে অপেক্ষমান তালিকার সিরিয়াল পরিবর্তন করা হয়।

এছাড়া তাবিউর রহমান প্রধানকে অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ নিয়োগ বাছাইবোর্ড ছিল প্রভাষক পদে। অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল কিন্তু কেউ দরখস্তনা করায় কোন বাছাইবোর্ড হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদে প্রার্থী পাওয়া না গেলে এর বিপরীতে প্রভাষক নিয়োগ দিতে হলে নতুন করে বিজ্ঞাপন দিতে হয় কিন্তু তাবিউর রহমানের নিয়োগের সময় তা অনুসরণ করা হয়নি।

উল্লেখ্য যে, মাহামুদুল হক হাইকোটের রায়ে ১০ মার্চ ২০১৯ ওই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এরপর তাঁকে ২০১৩ সালের উক্ত রায় অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা ও সার্ভিস বেনিফিট না দিলে হাইকোর্টে আরেকটি রীট মামলা করেন মাহামুদুল হক। এর প্রেক্ষিতে কেন মাহামুদুল হককে ২০১৩ সালের রায় অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতা ও সার্ভিস বেনিফিট দেওয়া হবে না এবং কেন তাবিউর রহমানের জালিয়াতি করে চাকরি প্রাপ্তি ও চাকরি অব্যাহত রাখার দায়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে ২০২২ সালে হাইকোর্ট রুলনিশি জারি করেন। এদিকে দুদক বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে এবং বিষয়টি জানতে ইউজিসির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করে এবং কমিটি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে প্রতিবেদন দেয় যেখানে তাবিউর রহমানের অবৈধ নিয়োগের প্রমাণ পায়। এ অভিযোগ আবারো তদন্তে ২৮ জুন ২০২৫ অনুষ্ঠিত ১১৩তম সিন্ডিকেটে তিন সদস্যের আরেকটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি তাবিউরের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রতিটি ক্ষেত্রে অবৈধতার প্রমাণ পায়।