বঙ্গবন্ধু চেয়ারে উপাচার্যের যোগদানে সিনেট সদস্যদের উদ্বেগ
‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ এর নির্ধারিত নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই সদ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই পদে গত ৭ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) উপাচার্য নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন। উপাচার্যের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে যোগদান করাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্ষদ সিনেটের নির্বাচিত আটজন শিক্ষক প্রতিনিধি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাছাড়া এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রথমসারির সংবাদপত্রগুলোতে নানান সংবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে খোদ উপাচার্যের এ পদ গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরী হয়েছে সেটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ উভয়ের জন্য সম্মানজনক নয় বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সিনেট প্রতিনিধিবৃন্দ মনে করেন, চবি উপাচার্য ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে নিয়োগের নীতিমালা এবং ১৯৭৩-এর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্টের কোন তোয়াক্কা না করে নিজের পদ, পদবী, এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নিজেই এ চেয়ার/পদে নিজেকে নিয়োগ দিয়ে প্রকারান্তরে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ এর মর্যাদা এবং সম্মান ক্ষুন্ন করেছেন। এমনকি তিনি এ চেয়ারে বসার নৈতিক অধিকারও হারিয়েছেন।
সিনেট সদস্যদের দাবি, ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে নিয়োগের প্রধান দু’টি শর্তই হলো একাধারে ২০ বছর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানের কমপক্ষে ১০টি প্রবন্ধ/নিবন্ধ প্রকাশ করা। স্পষ্টত উপাচার্য সেটা পূরণ করেননি। তাছাড়া, চবি এ্যাক্ট ১৯৭৩-এর ধারা ২৬ (এন) অনুযায়ী যে কোন গবেষণা সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ প্রয়োজন। অথচ এ বিষয়ে একাডেমিক কাউন্সিলে কোন ধরনের আলোচনা হয়নি। এছাড়া এ পদে নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্ষদ সিন্ডিকেট সভার অনুমোদন আবশ্যক। অথচ এ বিষয়ে সিন্ডিকেট সভায় কোন অনুমোদন নেয়া হয়নি। কেবল ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ নিয়োগের নীতিমালা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন করা হয়। এবং সেখানেও নিয়ম-নীতি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে দু’জন সিন্ডিকেট সদস্য ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) পোষণ করেন।
এ দু’জনের মধ্যে একজন হচ্ছেন স্বয়ং চবি উপ-উপাচার্য। এভাবে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদে নিয়োগের কোন নীতিমালা অনুসরণ না করে, চবি এ্যাক্ট ১৯৭৩-এর নিয়মনীতি ভঙ্গ করে, একাডেমিক কাউন্সিলের কোন সুপারিশ ছাড়া এবং সিন্ডিকেটের কোন ধরনের অনুমোদন ছাড়া কেবল নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ এর মতো সম্মানজনক ও মর্যাদাকর পদটি বিতর্কিতভাবে গ্রহণ করাকে আমরা অত্যন্ত নীতিবহির্ভুত, অনাকাক্সিক্ষত এবং অনভিপ্রেত বলে মনে করি।
বিবৃতিতে সিনেট সদস্যবৃন্দ ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’কে কেন্দ্র করে যে অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রী এবং চবি আচার্য ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুদৃষ্টি কামনা করেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সিনেট সদস্যরা হলেন, নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন , লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী এস এম খসরুল আলম কুদ্দুসী, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক, সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এস মনিরুল হাসান, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল মনছুর, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌল্লাহ এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল।
উল্লেখ্য, চবিতে গত বৃহস্পতিবার ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’র (গবেষণা কেন্দ্র) উদ্বোধন হয়। এই পদে দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। অপরদিকে বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়নি বলে মনে করেন চবি উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। এমনকি দ্বিমত থাকায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণও করেননি তিনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জীবন চরিত পাঠ, পঠন, চর্চা ও গবেষণার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার (গবেষণা কেন্দ্র)’ প্রবর্তন করা হয়েছে। বেতন-ভাতাসহ নীতিমালায় থাকা কোন ধরণের সুযোগ-সুবিধা না নিয়েই চবি উপাচার্য এই দায়িত্ব নিয়েছেন।
এ বিষয়ে চবি উপাচার্য বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ প্রতিষ্ঠা একটি অবিস্মরণীয় উদ্যোগ। যারা এ নীতিমালা তৈরী করেছেন তারাই আমাকে এই চেয়ার মনোনীত করেছেন। আমি তাঁদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এ দায়িত্ব নিয়েছি। যারা নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তারা যদি মনে করেন এই চেয়ার আমাকে দেবে সেক্ষেত্রে কোনো বিতর্ক থাকতে পারে না। আমিও চাই যে এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক না হোক। এসময় তিনি যারা বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু চেয়ারকে নিয়ে বিতর্ক করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহি মামলা করারও হুশিয়ারি দেন।
তিনি আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণার জন্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা আমার প্রয়োজন নেই। আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করে আসছি এবং গত ১০-১২ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছি। যা আমার কাছে সংরক্ষিত আছে।’
অপরদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ পদের নীতিমালার ২-এর ‘ঘ’ অনুচ্ছেদে লেখা আছে ‘ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কীর্তি, রাজনীতি, আদর্শ ও কর্ম এবং ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি বিষয়ে একাধারে ২০ বছর গবেষণা/লেখালেখি হিসেবে স্বীকৃত/আন্তর্জাতিকমানের প্রকাশনা হিসেবে অন্তত ১০টি নিবন্ধ/প্রবন্ধ/বুক চ্যাপ্টার থাকতে হবে।’ পাশাপাশি নীতিমালার ৩নং অনুচ্ছেদ ‘দায়িত্বে’ বলা হয়েছে, ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অধ্যাপকগণের অন্তর্ভুক্ত হবেন না এবং পদাধিকারবলে একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হতে পারবেন না।’
এ বিষয়ে চবি উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার বলেন, ‘এ দায়িত্ব কাউকে দিতে হলে বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলে এবং সিন্ডিকেটে পাশ হতে হয়। কিন্তু এসবের কোন কিছুই মানা হয়নি এখানে। শুধুমাত্র এই পদ পরিচালনার এবং এর বাজেট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া নীতিমালা তৈরি হওয়ার পর একাডেমিক কাউন্সিলের কোনো মতামত না নিয়ে সিন্ডিকেটে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যেটা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত।’
তিনি আরও বলেন, আমি উপাচার্য মহোদয়কে ব্যক্তিগত ভাবে বলেছি ‘আপনার সাথে প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালন কালে কোন মতপার্থক্য হয়নি। তবে এই বিষয়টিতে বঙ্গবন্ধুর নাম জড়িয়ে আছে, তাই এখানকার কোন অনিয়ম আমি মেনে নিতে পারি না। তাছাড়া আপনি তো এক দেড় বছর ধরে বঙ্গবন্ধু নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তাই আপনার থেকে যারা এ বিষয়ে এগিয়ে তাদের কাউকে নিয়োগ দেন।’
এদিকে সিন্ডিকেট সদস্য ও আওয়ামী বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন হলুদ দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সুলতান আহমেদও বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়নি বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, সিন্ডিকেটে বঙ্গবন্ধু চেয়ারে কারো নিয়োগের ব্যাপারে আলোচনা হয়নি। শুধুমাত্র এ পদ পরিচালনার জন্য যে নীতিমালা প্রয়োজন তা অনুমোদন করা হয়েছিল। যেহেতু বিষয়টি রিপোর্ট আকারে সিন্ডিকেটে আনা হয়েছে সেহেতু এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি এজেন্ডা না করে সিন্ডিকেটে রিপোর্ট হিসেবে আনায় দুইজন সিন্ডিকেট সদস্য ‘নোট অপ ডিসেন্ট’ ও দিয়েছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু চেয়ারের অনুমোদনের ব্যাপারে একাডেমিক কাউন্সিল সুপারিশ করেছিল, কিন্তু নীতিমালা তৈরি হওয়ার পর একাডেমিক কাউন্সিলের কোন মতামত না নিয়ে সরাসরি সিন্ডিকেটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এটা বিতর্কিত একটি প্রক্রিয়া।