পরীক্ষায় অসদুপায়ে বহিষ্কৃত ছাত্রদল কর্মীর শাস্তি মওকুফে প্রশসানের তোড়জোড়
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল কর্মী রিফাত ইসলাম রাফি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করলে তাকে শাস্তি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে শাস্তিপ্রাপ্ত ছাত্রদল কর্মী রিফাতের শাস্তি মওকুফে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনে অংশগ্রহণের ‘দোহাই’ দিয়ে ছাত্রদল কর্মী রিফাত ইসলাম রাফির শাস্তি মওকুফের গুঞ্জন উঠেছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. তানজিউল আলম জীবন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। এ ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় অসদুপায় (নকল) অবলম্বন করার ঘটনায় শাস্তি মওকুফ এটাই প্রথম। পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়নে এমন শাস্তির বিধানের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শাস্তি মওকুফ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের মাঝে পরীক্ষায় অসদুপায় (নকল) করার প্রবণতা বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন কর্মকাণ্ড শিক্ষাজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের ২০২৩ সালের ১ম বর্ষ ১ম সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা (মানোন্নয়ন) PHY 1101 (Engg. Physics) বিষয়ের পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থী মো. রিফাত হোসেন রাফি (আইডি: ১২০১৬০৫৩; রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০০০০১৪৮৬৮, সেশন ২০২০-২০২১ ,পুনঃভর্তি ২০২১-২০২২) বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর মোবাইলের ধারণকৃত ইমেজ থেকে মূল উত্তরপত্রে লেখার সময় কক্ষ পরিদর্শকের নিকট ধরা পড়েন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট প্রধান পরিদর্শক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তরে প্রেরণ করেন।
শৃঙ্খলা বিষয়ক বিধি ও শৃঙ্খলা বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আপনাকে ‘পরীক্ষায় অসদুপায় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বিধিমালা-২০১৮’ এর ৪ ব্যাখ্যা (খ) উপবিধি অনুযায়ী মানোন্নয়ন পরীক্ষা ও অধ্যয়নরত সেমিস্টারের কন্টিনিউয়াস এসেসমেন্টসহ সেমিস্টার ফাইনালের সকল কোর্সের পরীক্ষা বাতিল এবং পরবর্তী ব্যাচের (Next available batch) সঙ্গে বাতিলকৃত সেমিস্টারের পরীক্ষা দিতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে শাস্তি মওকুফের আবেদন করায় জুলাই/আগস্টে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ বিবেচনায় আপনার শাস্তি মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ সুযোগ শুধু একবারের জন্য বিবেচিত হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে রিফাতের শাস্তি মওকুফের ঘটনায় ফের আলোচনায় এসেছেন ইউজিসির নিয়ম লঙ্ঘন করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম জীবন। একসময় আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থাকলেও ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের সাথে নিজেকে বিএনপিপন্থি শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন তিনি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দিনেই জুলাই আগস্টের আন্দোলনের ‘দোহাই’ দিয়ে ছাত্রদল নেতার নকলের শাস্তি বাতিলের চেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি। আগে একটা পক্ষ ছাত্রলীগের অপকর্মের সহযোগিতা করতেন, আর এখন আরেকপক্ষ ছাত্রদলের অপকর্মে সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ তাদের। এ নিয়ে সমন্বয়ক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত থাকা তানজিউল ইসলামকে গত ১২ই জানুয়ারি ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক করা হলে ক্যাম্পাসে তুমুল সমালোচনার জন্ম দেয়। দায়িত্ব নেয়ার পরেরদিনই ছাত্রদল নেতাকে নজিরবিহীন শাস্তি মওকুফের ঘটনায় আবারো সমালোচনার জন্মদেন এ শিক্ষক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) তানজিউল আলম জীবন বলেন, ‘তার শাস্তি এখনও মওকুফ করা হয়নি। আর এটা তো আমাদের একক সিদ্ধান্ত না। আমরা শুধু শৃঙ্খলা বোর্ড এবং একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেরোবি প্রতিনিধি খোকন ইসলাম বলেন, ‘জুলাইয়ের আগে করা অন্যায়ের সাজা জুলাইয়ের দোহাই দিয়ে ক্ষমা করা হলে জুলাইয়ের মাহাত্ম্যকে খর্ব করা হবে। মানুষ বলার সুযোগ পাবে যে জুলাইয়ের দোহাই দিয়ে এই অনিয়ম হয়েছে। আমরা জুলাইয়ের গায়ে এভাবে কোন কালি লাগতে দিতে পারি না। আমরা জানতে পেরেছি অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছে নাকি প্রশাসনের ই কোন দুর্বলতা বা সফট কর্নার আছে এই বিষয়গুলো সকল বেরোবিয়ানদের মর্মাহত করেছে। যদি এর সুষ্ঠু কারণ সবার সামনে না আনা হয় তাহলে শিক্ষার্থী প্রশাসনের ওপর আস্থা হারাবে। এবং সাজা মওকুফের কোন উপায় নেই কারণ এমন একটা উদাহরণ তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে নকলকারীদের উৎসাহ জোগানো হবে। এমন অনিয়মকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনোভাবেই মেনে নেয়া হবে না।’
ছাত্র আন্দোলনের বেরোবি প্রতিনিধি শামসুর রহমান সুমন বলেন, ‘১ বছর পূর্বে পরীক্ষায় মোবাইল নিয়ে অসদুপায় অবলম্বনের কারণে বহিষ্কার হয়েছে। এখন জুলাই অভ্যুত্থানের দোহাই এবং দলীয় প্রভাব দেখিয়ে মওকুফ পাওয়া ও পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টি জুলাই আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সাথে প্রতারণার শামিল। প্রশাসনের এমন হঠকারী সিন্ধান্তের নিন্দা জানাই এবং এর সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার জোর দাবি জানাই।’
এ নিয়ে শৃঙ্খলা কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ইইই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘ওর এটা এক বছর আগের ঘটনা। ওই আহত শিক্ষার্থী হিসেবে আবেদন করেছে। যেটায় আবেদন করেছে সেটায় তো ব্যাচ এভাইলেবল না তাহলে কীভাবে পরীক্ষা দিবে। গ্যাজেট অনুযায়ী তার আহতের লিস্টে নাম আছে এবং সে বলছে তার কয়েকমাস গ্যাপ গেছে, এটার দোহাই দিয়ে সে আবেদন করেছে।’
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রদলকর্মী রিফাত হোসেন রাফি পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘পরীক্ষা চলাকালীন সময় আমার কাছে মোবাইল পাওয়ায় তৎকালীন সময় আওয়ামী লীগের দোসরা আমাকে বহিষ্কার করেছে। আমি ছাত্রদল করায় আমার উপরে আরো বেশি চড়াও হয়েছে। সেজন্য আমি শৃঙ্খলা বোর্ডে আবেদন করি। আমার সাথে অন্যায় হয়েছে সেটি আমি উল্লেখ করি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত হবে তারপর বিষয়টি জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, রিফাত জিয়া সাইবার ফোর্সের নামের ভুইফোঁড় সংগঠনের রংপুর মহানগরের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জিয়া সাইবার ফোর্স নিয়ে পরবর্তীতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জিয়া সাইবার ফোর্সের সাথে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের কোন সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞপ্তির এরপরে ফের তাকে নিয়ে ক্যাম্পাসে তুমুল সমালোচনার জন্ম হয়।