চিতার আগুনে হারিয়ে গেল আরও এক প্রিয়াঙ্কা
উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সবুজ ক্যাম্পাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা মজুমদার। ধারাবাহিকভাবে সবকিছু চালিয়েও যাচ্ছিলেন তিনি। একাডেমিক জীবন শেষ হওয়ার পথে বাকি ছিলো মাত্র একটি পরীক্ষা। এরপরেই অর্জন করতেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। তবে শেষ পরীক্ষার আগেই পৃথিবীকে চিরবিদায় জানালেন চবির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের এ শিক্ষার্থী।
জানা যায়, প্রিয়াঙ্কা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতার পেশা। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় নিজ এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি সংসার জীবনেও পা বাড়ান। গুছিয়ে উঠেছিলেন সাংসারিক জীবনেও। সচল রেখেছিলেন উচ্চশিক্ষার যাত্রাও।
গত সোমবার (১৯ নভেম্বর ) ছিল রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির সর্বশেষ পরীক্ষা। ওই দিন সবাই এসেছিলো, শুধু আসেনি প্রিয়াঙ্কা। একাডেমিক জীবনের শেষ পরীক্ষাতেই অংশগ্রহণ করা হলো না তার। মৃত্যুকেই আলিঙ্গণ করেন তিনি।
প্রিয়াঙ্কার বন্ধুরা জানান, প্রিয়াঙ্কা পরীক্ষা চলাকালে গর্ভবতী ছিলেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই সহপাঠীদের কাউকে না জানিয়েই হঠাৎ বাড়ি চলে যান। দুটি ফুটফুটে যমজ সন্তানের জন্মাদান করেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে।
স্বজন ও বন্ধুরা জানান, যেহেতু শুধু একটি পরীক্ষাই বাকি ছিল তাই প্রিয়াঙ্কা মানসিকভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় আর অংশগ্রহণ করা হয়নি তার। সন্তান প্রসবের তিনদিন পর্যন্ত সুস্থ-সবল থাকলেও গত ১৯ নভেম্বর রাতে মারা যান প্রিয়াঙ্কা। সন্তান জন্মের পর প্রথম দুই দিন রক্তস্বল্পতার অভাব ধরতেই পারেননি চিকিৎসকরা। তিন দিনের মাথায় তার শরীরে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। রক্ত দেয়ার দশ মিনিটের মাথায় খিচুনি দিয়ে মারা যান প্রিয়াঙ্কা। রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটুকু সঠিক ছিলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
জানা যায়, প্রিয়াঙ্কার সন্তান প্রসবের নির্ধারিত তারিখ ছিলো আরও পরে। কিন্তু তাকে সিজারিয়ান সার্জারির মাধ্যমে আগাম প্রসব করানো হয়। রক্তের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণও লক্ষ্য করা হয় নি। প্রসব বেদনার সঙ্গে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার অভিযোগও রয়েছে।
প্রিয়াঙ্কার সহপাঠীরা জানান, প্রিয়াঙ্কা ছিল সবার চেয়ে আলাদা। চুপচাপ, ভাবুক এবং সাদামাটা স্বভাবের। নম্র, ভদ্র ও মার্জিত রুচির অধিকারী। সবসময় ব্যস্ততার মধ্যেই থাকত সে। হৈচৈ ও হাঙ্গামা করার ফুসরত ছিল না তার। একাডেমিক কার্যক্রম, চাকরি, পারিবারিক ব্যস্ততাসহ নানা সংগ্রামে জয়ী হওয়ার বাসনা ছিলো তার। সেই প্রিয়াঙ্কা হেরে গেছে মৃত্যুর কাছে। তদন্ত সাপেক্ষে তার মৃত্যুর কারণ নির্ণয় এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তারা।