১৫ আগস্ট ২০২৩, ১৭:৩৪

শিক্ষক সংকটে ৬ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

৬ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়  © লোগো

কয়েক বছর ধরে শিক্ষক সংকট ভুগছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ। আড়াইশ শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিভাগটিতে শিক্ষক আছে মাত্র দুইজন। শিক্ষক সংকটের কারণে বর্তমানে বিভাগটিতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মত ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে গত সপ্তাহে আন্দোলনে নামেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরা।

একই অবস্থা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও (ইবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির ধর্মতত্ত্ব অনুষদের আল কোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়া এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ এবং আরবি বিভাগে প্রায় ২০ বছর ধরে কোন শিক্ষক নিয়োগ নেই। এর ফলে একাডেমিক ও অফিসিয়াল কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হিমশিম খাওয়া হলেও নতুন শিক্ষক নিয়োগে তেমন উদ্যোগ নেই।

শুধু এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, শিক্ষক সংকটের এই দূরাবস্থা আরও ৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছে, এ সংকটের অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক শিক্ষক পদ অনুমোদন না দেয়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা একাধিকবার ইউজিসির কাছে শিক্ষকের পদ অনুমোদন দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে আমাদের চাহিদার অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষকও দেয়া হয়নি। ইউজিসি বলছে, তাদের এত সংখ্যক শিক্ষক দেয়ার মত বাজেট তাদের নেই।

জানা যায়, উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় গত ১৫ বছরে প্রায় দুই ডজন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এদের মধ্যে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। এছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও তিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম চালু করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

তবে প্রতিনিয়ত নতুন এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এমনকি শুধুমাত্র সদ্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই নয় অপেক্ষাকৃত পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভুগছে নানা সংকটে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক চেয়ে আবেদন করলে আমরা যাচাই-বাছাই করে শিক্ষক দিচ্ছি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে অনেকেই বেশি শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে। এখন এতো সংখ্যক নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া তো সম্ভব না-অধ্যাপক আবু তাহের

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম বড় সমস্যা শিক্ষক সংকট। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিতই ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক সময়ে এক সেমিস্টারের ফলাফল দিতেই বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব শিক্ষক রয়েছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক নেই বললেই চলে। ফলে গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীরা সুপারভাইজার পেতে গিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ১:২০ (২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক) হলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০ এর বেশি। এ অনুপাত সবচেয়ে বেশি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রতি ৪২ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র একজন। এ তালিকায়  দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। প্রায় ৪ দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৪১। তৃতীয় এবং চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) এবং গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয় দুটিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত যথাক্রমে ১:৩৯ এবং ১:৩৮। এছাড়া পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি) এবং হাজী মোহাম্দ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (হাবিপ্রবি) শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত যথাক্রমে ১:৩১ এবং ১:৩০।

পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ভালো শিক্ষার পরিবেশ এটাতো শিক্ষার্থী হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু তাদের সেটুকুই দিতে পারছি না-ভিসি, বশেমুরবিপ্রবি

 

এ বিষয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হাসিবুর রশীদ বলেন, আমরা ২০২১ সালে শিক্ষকের জন্য আবেদন করেছিলাম কিন্তু শিক্ষক দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে বলা হয়েছে ইউজিসির টিচার্স লোড ক্যালকুলেশন অনুযায়ী হিসেব করে পুনরায় যেন আবেদন করি। এর ফলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হলেও কিছুতো করার নেই। তাই আপাতত আমরা যে কয়জন শিক্ষক আছেন তাদের দিয়েই যথাসম্ভব একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছি।

আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ১:২০ (২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক) হলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থীর অনুপাত ১:৩০ এর বেশি।

বশেমুরবিপ্রবির উপাচার্য ড. একিউএম মাহবুব বলেন, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে রিসার্চের সময় পান না। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের জন্য অনশন পর্যন্ত করেছে। অথচ পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ভালো শিক্ষার পরিবেশ এটাতো শিক্ষার্থী হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু তাদের সেটুকুই দিতে পারছি না। শিক্ষকের জন্য আমি অনেকবার ইউজিসিতে গিয়েছি। কিন্তু তারা দেবে দেবে করে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাই শিক্ষামন্ত্রীকে জানিয়েছি। এখন দেখা যাক কি হয়।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক দেয়া হচ্ছেনা এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক চেয়ে আবেদন করলে আমরা যাচাই-বাছাই করে শিক্ষক দিচ্ছি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে অনেকেই বেশি শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে। এখন এতো সংখ্যক নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া তো সম্ভব না। ফলে একটা সংকট তৈরি হয়েছে। 

বাজেটের বিষয়ে তিনি বলেন, করোনা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আর শিক্ষাখাতে আমাদের পর্যাপ্ত বাজেট নেই এটি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলছি। কিন্তু এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষক পাচ্ছে না এটি সঠিক নয়। নিয়ম অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই ২০ শতাংশ শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে থাকতে পারেন। এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি ৩০ ৪০ শতাংশ শিক্ষককে শিক্ষাছুটি দেয় এবং শিক্ষাছুটির বিপরীতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে চায় সেটিতো সম্ভব না। কারণ একজন শিক্ষাছুটিতে থাকলেতো তার বেতন বন্ধ থাকে না। তাহলে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিতে গেলে সেই বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবে? এককথায় শিক্ষক সংকট নিরসনে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় সবাইকেই আরো আন্তরিক হতে হবে।