নেই কোনো শৃঙ্খলাবিধি, তদন্ত ছাড়াই বহিষ্কার কুবি ছাত্রলীগের দুই নেতা

বহিষ্কৃত শাখা ছাত্রলীগ নেতা এনায়েত উল্লাহ ও মো. সালমান চৌধুরী হৃদয়
বহিষ্কৃত শাখা ছাত্রলীগ নেতা এনায়েত উল্লাহ ও মো. সালমান চৌধুরী হৃদয়  © সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রলীগের বিষয়ে কেন্দ্রের পর এবার তৎপর হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তির পর দুই নেতাকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সালমান চৌধুরী হৃদয়কে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কারের চিঠি দেয় রেজিস্ট্রার দপ্তর।

বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শৃঙ্খলাবিধি না থাকার পরও ‘উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী’ বহিষ্কার করায় এ ব্যবস্থার পদ্ধতি ও ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা। আর শৃঙ্খলাবিধি পরবর্তী সিন্ডিকেটে পাশ করাবেন বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। এদিকে কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই একই ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেও শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন বলেন, ‘তাঁদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলাম। তাঁদের জবাব আমাদের কাছে যথাযথ মনে না হওয়ায় সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, তখন হয় সাময়িক বহিষ্কার ওঠে যাবে, না হয় স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, অ-স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই কেবল তার উপশম ঘটাতে তৎক্ষণাৎ সাময়িক বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন যদি না থাকে, তাহলে ঘটনার এক মাস পর এসে সাময়িক বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ধারণা করবে যে কেউই। এছাড়া এ ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতিইবা কে কখন নির্ধারণ করবে?

গত ৩০ জানুয়ারি রাতে ছাত্রলীগের ২০১৭ সালে বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী সমর্থিত কয়েকজন কর্মী ও সাবেক ছাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ‘অবৈধভাবে’ উঠতে গেলে তাঁদেরকে বাধা দেন তৎকালীন সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সমর্থিতরা।

এসময় সহকারী প্রক্টর অমিত দত্তের সঙ্গে ইলিয়াস সমর্থিত এনায়েত ও সালমানের বাগবিতণ্ডা ঘটে এবং উভয়পক্ষকেই উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়। এ ঘটনাকে প্রক্টরিয়াল বডির কর্তব্য পালনে বাধা, শিক্ষককে হেনস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ দাবি করে উভয় নেতাকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ।

এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশের বিপরীতে এনায়েত ও সালমানের উত্তর গ্রহণযোগ্য হয়নি দাবি করে ‘প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী’ উভয় ছাত্রলীগ নেতাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমিরুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত পৃথক দু’টি অফিস আদেশে।

আরও পড়ুন: কুবি ছাত্রলীগের দুই নেতাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার

কারণ দর্শানোর ওই নোটিশের পর সহকারী প্রক্টর অমিত দত্তের বিরুদ্ধে উপাচার্য বরাবর পাল্টা অভিযোগ দেন উভয় নেতা। অভিযোগপত্রে তাঁরা বলেন, ২০১৬ সালে কুবি ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলে নিহত কাজী নজরুল ইসলাম হলের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যা মামলার আত্মস্বীকৃত খুনি বিপ্লব চন্দ্র দাসসহ আরও কয়েকজন অছাত্র হলে ওঠার চেষ্টা করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার ভীতি সৃষ্টি হয়।

এসময় শিক্ষক অমিত দত্ত অছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো হলের শিক্ষার্থীদের সাথে উচ্চবাচ্য ও তাদের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। এ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানালে সেই শিক্ষক তাঁদেরকে মারতে তেড়ে আসেন এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন তাঁরা।

একই ঘটনায় উভয় পক্ষ থেকে অভিযোগ গেলেও কোনো ধরনের তদন্ত কমিটি গঠন করেনি কর্তৃপক্ষ। বরং নিজেদের মতো করেই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেষ্টা করেও প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরং অভিযোগকারী তথা প্রক্টরিয়াল বডির সুপারিশের ভিত্তিতেই উভয় শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপাচার্য সমর্থিত একজন শিক্ষক বলেন, মূলত অভিযোগকারী শিক্ষকরাই তাঁদেরকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেছিল। উপাচার্য তাঁদের বাইরে যেতে পারেননি। সেজন্য বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এসব বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের সাথে। বিষয়টি প্রশাসন সংশ্লিষ্ট হওয়ায় এবং উপাচার্যের বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কায় দু’জনই নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাঁদের একজন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোনো শৃঙ্খলাবিধিও নেই। তাহলে কীসের ভিত্তিতে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা কোন মাত্রার অপরাধ করেছে, সেটা কীভাবে নির্ণয় করা হয়েছে-এ প্রশ্নগুলো সামনে আসা জরুরি।

তবে উপাচার্য বলেন, ঘটনা ঘটার পর আমি বিদেশ চলে যাই। আমরা গত রবি-সোমবারের দিকে দিকে তাঁদের বহিষ্কারের বিষয়ে মিটিংয়ে বসার কথা ছিল এবং সেদিনই বহিষ্কার করার কথা ছিল। কিন্তু তাঁরা কিভাবে যেন জানতে পারে যে আমরা তাঁদের বহিষ্কার করব এবং তাঁদেরকে যাতে বহিষ্কার করা না হয় সেজন্য সাবেক ছাত্রলীগ নেতার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আপগ্রেডেশন বোর্ড চলাকালীন হামলা চালায়। এরপর তাঁরা মাফ চাইবে বলেছিল, কিন্তু মাফ চায়নি।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের কোন বিধি অনুযায়ী তাঁদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? এর উত্তরে উপাচার্য বলেন, প্রক্টরের দায়িত্ব পালনে বাঁধা প্রদান কি শৃঙ্খলাবিরোধী না? গত সিন্ডিকেটে শৃঙ্খলাবিধির বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, পরবর্তী সিন্ডিকেটে আমরা সেটি পাস করাব।

একই ঘটনায় অভিযোগকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ আছে। তাঁর বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই একপাক্ষিক ব্যবস্থা নিতে পারেন কি না- এ বিষয়ে উপাচার্যকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি প্রতিবেদককে অনেকক্ষণ সময় দিয়েছেন দাবি করে আর মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সার্বিক বিষয়ে কথা হয় রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমানের সাথে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের একজন এবং দু’বার প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বলেন, প্রশাসন নিজ থেকে কখনো এ ধরনের শাস্তি দিতে পারে না। ‘উচ্চপর্যায়’ বা অন্য কিছু বলার কোনো সুযোগই নেই। এটা আইনের ভাষা হতে পারে না। যেকোনো বিষয়ে শাস্তি দিতে হলে অবশ্যই বিধি উল্লেখ করতে হবে।

অধ্যপক সৈয়দুর আরও বলেন, যেহেতু আমাদের কোনো শৃঙ্খলাবিধি নেই, সেহেতু প্রচলিত সরকারি বিধি অনুযায়ীই পদক্ষেপ নিতে হবে। অথবা তদন্ত কমিটি গঠন করে তাঁদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কারণ দর্শানোর নোটিশের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে মাত্র। এছাড়া যেহেতু শিক্ষকের বিরুদ্ধেও অভিযোগ এসেছে, তাঁর স্বার্থে হলেও তদন্ত প্রতিবেদন দরকার ছিল।