সচিবের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শিক্ষক সমিতি

‘শিক্ষা ক্যাডারের কেউ শিক্ষক হতে চায় না, সবাই কর্মকর্তা হতে চায়’

করোনা
কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আমিরুল ইসলাম খান  © ফাইল ছবি

সম্প্রতি গণমাধ্যমের কাছে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আমিরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা ক্যাডার তৈরি করে তাদেরকে উচ্চাভিলাষী করা হয়েছে, এ ক্যাডারের কেউ শিক্ষক হতে চায় না, সবাই কর্মকর্তা হতে চায়।’

সচিবের এমন বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্যাডার সার্ভিসের বৃহৎ ক্যাডার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। তার এ বক্তব্যে শিক্ষা ক্যাডার ও কারিগরি সচিবকে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। ‌তার এ বক্তব্য বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কার শিক্ষা ক্যাডার বিদ্বেষী শিক্ষা সচিব শহীদুল আলমের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলে যায় বলেও‌ অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনের সদস্য সচিব মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী।

রোববার (২৯ আগস্ট) পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খানের বক্তব্য আমাদের নজরে এসেছে। বক্তব্যের কিছু অংশ দেশের অন্যতম বৃহৎ ক্যাডার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের উচ্চ পদে আসীন হয়ে এ জাতীয় মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক।

এতে বলা হয়, পত্রিকায় তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘শিক্ষকদের ক্যাডার করে তাদের উচ্চাভিলাষী করা হয়েছে। সবাই অফিসার হতে আসেন। শিক্ষকতা করতে চান না।’ প্রায় ১৬ হাজার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার মেধা, মর্যাদা ও অধিকারকে অসম্মান করে এ জাতীয় বক্তব্য প্রদান অনভিপ্রেত ও বিদ্বেষপ্রসূত, যা ক্যাডারের স্থিতিশীলতার জন্য হানিকর।

প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস ১৯৮০ ও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা দেশের প্রাথমিক থেকে টার্শিয়ারি স্তরের সাধারণ শিক্ষা ধারার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক পদে নিয়োগ পেয়ে থাকেন। ক্যাডারের আকার অনুযায়ী প্রশাসনিক পদের সংখ্যা একেবারেই সীমিত। ফলে এসব সীমিত সংখ্যক পদে এ বৃহৎ ক্যাডারের স্বল্প সংখ্যক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকেই সরকার পদায়ন করে থাকে। বেশিরভাগ ক্যাডার কর্মকর্তাই শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকেন।

তিনি আরও বলেছেন, ‘অথচ পাশের দেশ ভারতেও শিক্ষকদের ক্যাডার করা হয়নি। আসলে এরা শিক্ষক হতেই আসেন না।’ বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। অন্য কোনো দেশের কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আমাদের অনুসরণ করতেই হবে এটা তার কেমন যুক্তি? আর শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা শিক্ষার বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়েই শিক্ষা প্রশাসনে কাজ করেন।   

আসলে তার এ বক্তব্য বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কার শিক্ষা ক্যাডার বিদ্বেষী শিক্ষা সচিব শহীদুল আলমের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলে যায়। সে সময় থেকেই মূলত শিক্ষা ক্যাডারের প্রশাসনিক পদগুলো গ্রাস করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক পদ দখল, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে শিক্ষা ক্যাডার বহির্ভূতদের পদায়ন, নায়েম থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিতাড়নের অপচেষ্টা এ সবই ঘটেছিল ওই সময়। 

তারই ধারাবাহিকতায় এখনও মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে আসীন কেউ কেউ এরূপ অভিপ্রায় নিয়ে কাজ করছেন। মনে রাখতে হবে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে ওই সব পদ শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণা ও জ্ঞানহীন অন্যদের দখল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের পরিপন্থী। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনের মূলে ছিল নিজ নিজ পেশায় দক্ষ পেশাজীবীদের কাজে লাগানো। সে জন্য তিনি প্রশাসনিক বিন্যাসে বিশেষায়ন নীতি গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের সামষ্টিক সমৃদ্ধি ও অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে  অপরিহার্য ও অবিকল্প কৌশলের অংশ। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ড. এ আর মল্লিক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শিক্ষা সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। 

এছাড়া স্বাস্থ্য, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিজ নিজ পেশায় দক্ষদের সচিব পদে পদায়ন করেছিলেন। পরবর্তীতে সিভিল সার্ভিসের জন্য বিভিন্ন পেশার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই বিভিন্ন ক্যাডার গঠন করা হয়েছে। 

আমরা জানি, কালের অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন ক্যাডারকে অধিকতর শক্তিশালী ও সংহত করার জন্য এবং আন্তঃক্যাডার বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, বিশেষায়িত ক্যাডারগুলোতে বিশেষায়িত পেশাজীবীদের প্রাপ্য পদ সংকুচিত করাসহ বিদ্যমান সেসব পদে বিশেষ একটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অন্যায্য পদায়ন ও পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন পেশাজীবী ক্যাডারের স্বার্থ যেমন ক্ষুণ্ণ হচ্ছে তেমনি সংশ্লিষ্ট খাতে জনগণের সর্বোচ্চ সেবা পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন দফতর-অধিদফতরের মূল পদগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদ সংকোচন করে একটি বিশেষ ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদায়নের সুযোগ রেখে নতুন নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। অনেকগুলো দফতরেই ডি-ক্যাডারাইজেশনের অপচেষ্টা চলছে। কিছু কিছু জায়গায় আংশিকভাবে এসব বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দফতর-অধিদফতরগুলো থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দফতর-অধিদফতরগুলোতেও এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

আমরা মনে করি, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খানের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সাম্প্রতিক বক্তব্য বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের স্বার্থ বিরোধী। বর্তমান সরকারকে বিব্রত করার এক সুপরিকল্পিত অভিপ্রায়ের অংশ।

আমরা লক্ষ্য করছি ওই বিভাগের সচিব হিসেবে যোগদানের পর থেকে তিনি শিক্ষা ক্যাডার পরিপন্থী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ থেকে শিক্ষা ক্যাডার সদস্যদের সরিয়ে দিচ্ছেন। নিম্ন যোগ্যতা (নন-ক্যাডার) সম্পন্নদের পদায়ন করছেন এবং শিক্ষা ক্যাডার পদ সৃজনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নন-ক্যাডার পদ সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই আমরা তার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করছি এবং এ বক্তব্য প্রত্যাহার করার জন্য অনুরোধ করছি। পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডার ও শিক্ষা পরিপন্থী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।


মন্তব্য

x