গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অনীহা
করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। রোজার ছুটির সঙ্গে বর্তমানের ছুটি মিলিয়ে ঈদের পর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। অর্থাৎ করোনার প্রকোপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আগামী ৩০ মে পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা অব্যাহত রাখতে টেলিভিশনে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। আর দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে আহবান জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। সম্প্রতি কমিশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের আহবানে সাড়া দিয়ে অনলাইনে পাঠদানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে সাড়া নেই সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) শিক্ষার্থীদের। গত বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার আহবান জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে এ উদ্যোগকে শিক্ষার্থীরা সাধুবাদ দিলেও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের অভিমত, চলমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই তাদের বাসায় অবস্থান করছে। নিজ এলাকাতে ওয়াইফাই তো দূরে থাক, অনেকক্ষেত্রে ভালোভাবে ফোনের নেটওয়ার্কও পায় না। এই ধরণের দূর্বল ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে অনলাইনে ক্লাস করা অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
তাছাড়া যেসব অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা ভালো, সেখানে মোবাইল ডাটা কিনে কতোদিন অনলাইনে ক্লাস করা সম্ভব? কারণ, এদেশে মোবাইল ডাটা কিনতে বেশ ভালো পরিমাণে টাকা ব্যয় করতে হয়। দুর্যোগময় এ পরিস্থিতিতে যেখানে মানুষের আয় রোজগার নেই, সেখানে এ ধরণের সিদ্ধান্ত বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। আর দেশের কঠিন পরিস্থিতিতে বাইরে বের হয়ে মোবাইল রিচার্জ করা স্বাস্থ্যগতভাবে বেশ ঝুঁকির বিষয়।
বর্তমানে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন ফার্মেসী, মাইক্রোবায়োলজি, ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি ইত্যাদি চালু রয়েছে। এসব বিষয় সহজভাবে বুঝতে বিভিন্ন উপকরণের প্রয়োজন হয় যেটা অনলাইন ক্লাসে পাওয়া সম্ভব না। তাছাড়া এসব বিষয়ে পড়ালেখার জন্য ল্যাবরেটরির উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভিন্ন বিষয়ের জন্য ল্যাবরেটরী প্রয়োজন হয়। অনলাইনে ক্লাসের মাধ্যমে এসব বিষয়ে কতটা উপকৃত হওয়া সম্ভব, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রাথমকিভাবে যখন ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়, তখন এই স্বল্প সময়ের (দুই সপ্তাহ) ছুটির জন্য অনেকেই তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী বাসায় নিয়ে যায়নি। এ অবস্থায় প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী ছাড়া অনলাইনে ক্লাস করা বেশ কষ্টসাধ্য একটি বিষয়। তাছাড়া দেশের চলমান আতঙ্ক জনিত পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের মাঝে পড়ালেখার মন মানসিকতা নেই বলেও অভিমত অনেক শিক্ষার্থীর।
অনলাইন ক্লাসের সমস্যার বিষয়ে ভেটেরিনারি এন্ড এনিমেল সায়েন্সেস অনুষদের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী হাসানুল বাকের তামলিখা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচকভাবে নেয়া উচিত। শিক্ষার্থীরা যদি ঘরে বসে এই অলস সময়টা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে কিছুটা হলেও কাজে লাগাতে পারে, সেটা অবশ্যই ভালো বিষয়। তবে সকল শিক্ষার্থীর কথা চিন্তা করলে এটা সম্ভব নয়। যাদের গ্রামাঞ্চলে বাসা, তারা এটার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না।
গতকাল অনলাইনে ক্লাসের পক্ষে বিপক্ষে শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে একটি জরিপ করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। জরিপে ৯১% শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের বিপক্ষে মত দেন। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মেরাজ তালুকদার বলেন, 'অনেক শিক্ষার্থী এবং কিছু শিক্ষকও আছেন যারা অনলাইনে ক্লাসের সিস্টেম সম্পর্কে তেমন অবগত নন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্বল ইন্টারনেট সেবা, মোবাইল ডাটার অর্থ ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সমস্যার কথা বিবেচনা করে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। তবে প্রযুক্তির এই যুগে অনলাইনে ক্লাসের উদ্যোগ অবশ্যই যুগোপযোগী।
এ বিষয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. নজরুল ইসলাম রলিফের সাথে। শিক্ষার্থীদের সাথে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে অনেক শিক্ষার্থী ভালোভাবে অবগত নয়। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে অবস্থান করায় নিয়মিত ইন্টারনেট কেনার সামর্থ্য অনেকের নেই। এই বিপর্যয়ে অনলাইনে ক্লাস করা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য কখনোই যৌক্তিক হবেনা।'
তবে অনলাইন ক্লাসে ইতিবাচক বিষয় দেখছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘরে বসে অলস সময় পার করার চেয়ে অনলাইনে ক্লাস করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কিছুটা উপকৃত হলেও আমাদের স্বার্থকতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেশকে ডিজিটালাইজেশন করার অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ। ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই অনলাইনে ক্লাস চলমান রয়েছে। বিষয়টা সকলকে ভালোভাবে নেয়া উচিত। তবে এটা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংগঠন, সাংবাদিক সহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী রেজিস্ট্রার আবু মুহাম্মাদ মুকাম্মেল বলেন, বর্তমানে অনলাইনে যুক্ত নয়, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত এবং সেশনজটের কথা চিন্তা করেই পরীক্ষামূলকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সকল বিভাগে জানানো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে। তবে যদি সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহ থেকে যৌক্তিক সমস্যার বিষয়ে জানানো হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষ অবশ্যই এ বিষয়ে ভাববে।