১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৮:৩৬

ব্যয়ের হিসাব নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকোচুরি

আইন অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী বছরের আর্থিক হিসাব ইউজিসিতে জমা দিতে হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। এরপর ডিসেম্বরের মধ্যে ওই হিসাবের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ইউজিসিতে পাঠাতে হবে। কিন্তু আইনের এ নির্দেশনা মানছে না বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসাব জমা দিচ্ছে, তারাও আবার হিসাব দেয়ার ক্ষেত্রে আইনে বর্ণিত নিয়ম অনুসরণ করছে না। সব মিলিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে লুকোচুরি করছে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এর মধ্যে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় ওই বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। যদিও ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেয়া অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষা করেনি। এছাড়া আরো ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদন তৈরিতে আইনের নির্দেশনা অনুসরণ করেনি। সব মিলিয়ে আইনে বর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মাত্র ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। সে হিসাবে ওই বছর ৮৫ শতাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই ইউজিসির নির্দেশনা অনুসরণ করে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাব জমা দেয়নি।

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইনের অধীন পরিচালিত, সে আইনেই আয়-ব্যয়ের হিসাব কমিশনে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্যই এ ব্যবস্থা। যদিও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই তা অনুসরণ করছে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে শিক্ষার্থীদের ফি-বেতনের টাকায়। সে অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তার নিরীক্ষিত হিসাব রাখা জরুরি। তদারককারী সংস্থা হিসেবে পাবলিক-প্রাইভেট সব ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়েই আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করছে ইউজিসি। আশা করছি, প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম অনুসরণের মাধ্যমে ইউজিসিকে সহযোগিতা করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাধারণ তহবিল বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক আর্থিক বৎসরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ববর্তী আর্থিক বৎসরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও সংরক্ষিত তহবিল এবং সাধারণ তহবিলের হিসাব কমিশন ও সরকারের নিকট প্রেরণ করতে হবে।’ আর হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি আর্থিক বৎসরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করিবে। উল্লিখিত হিসাব প্রতি আর্থিক বৎসরের বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহিঃনিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানসমূহের (সিএ ফার্ম) মধ্য হইতে সরকার মনোনীত একটি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষা করাইতে হইবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বৎসরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনে প্রেরণ করিতে হইবে।’ কিন্তু আইনের সুস্পষ্ট এ নির্দেশনা মানছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই আইনে বর্ণিত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্ট নীতি অনুসরণ করছে না।’

ইউজিসি কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অডিট ফার্ম নিয়োগ করে হিসাবের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য তাগাদা দেয়া হচ্ছে। এজন্য তাদের সঙ্গে আলাদা করে সভারও আয়োজন করা হয়েছে। এর পরও বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় সেটি অনুসরণ করছে না। তবে এক বছরের মধ্যে অডিট ফার্ম নিয়োগের হার কিছুটা বেড়েছে বলে জানান ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক ড. মো. ফখরুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আইনের বর্ণনা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই হিসাব ও এর নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে এক ধরনের অনীহা পরিলক্ষিত হয়। এজন্য আমরা তাদের কয়েক দফায় নির্দেশনা দিয়েছি। নানাভাবে তাদের চাপ প্রয়োগ করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। গত এক বছরে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অডিট ফার্ম মনোনয়নের জন্য চিঠি দিচ্ছে। অনেকেই নিয়োগ দিয়ে দিয়েছে। ক্রমান্বয়ে বিষয়টি একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার কাজ চলছে।