০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:১১

ভিপিসহ গবি ছাত্র সংসদ নেতাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্ক চরমে

গণ বিশ্ববিদ্যালয়  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও ছাত্র সংসদের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ানের ছাত্রদলে যোগদানের ঘোষণার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অরাজনৈতিক পরিচয় ও গঠনতন্ত্রের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির ফেসবুক পোস্টে প্রকাশ্যে জানান, গকসুর সহ-সভাপতি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান ছাত্রদলে যোগ দিয়েছেন।

এরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই যোগদান সংক্রান্ত ছবি, পোস্ট ও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষয়টি ক্যাম্পাসভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ, শিক্ষার্থী ফোরাম এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনায় আলোড়ন তোলে।

ভিপির যোগদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্র সংসদের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে আসে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, গকসুর সাধারণ সম্পাদক মো. রায়হান খান এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. সামিউল হাসানকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের কর্মসূচিতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে সহ-সাধারণ সম্পাদক সামিউল হাসান জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া সমাজকল্যাণ ও ক্যান্টিন সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অন্তরকে ছাত্রদলে যোগদান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. নির্জন হোসেন প্রকাশ্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এসব ঘটনা মিলিয়ে ছাত্র সংসদের একাধিক শীর্ষ পদে থাকা প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।

গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের ১৭.১ (খ) ধারায় বলা আছে, কোনো নির্বাচিত সদস্য যদি কোনো রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনে যোগ দেন অথবা ওই সংগঠনের কোনো পদে নির্বাচিত বা মনোনীত হন, তাহলে তার সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে।

গঠনতন্ত্রে এত স্পষ্ট বিধান থাকার পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।

ভিপির রাজনৈতিক দলে যোগদানের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের একাংশ ভিপি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস রাখা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার।

তবে বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। অনলাইন পোস্ট ও মন্তব্যে তারা লিখেছেন, নির্বাচনের সময় ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই রায় দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা সেই রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেউ কেউ এটিকে ভোটের ম্যান্ডেটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। কিছু পোস্টে ছাত্র সংসদের কার্যক্রমকে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে সমালোচনা করা হয়েছে।

এই বিতর্কের মধ্যেই গকসুর প্যাডে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যা কিছু সময় পর মুছে ফেলা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয়কে অরাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে বলা হয়, ক্যাম্পাসের ভেতরে কোনো ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে ভিপির রাজনৈতিক দলে যোগদানকে তার ব্যক্তিগত অধিকার বলা হলেও, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তা নিয়ম বহির্ভূত উল্লেখ করে ছাত্র সংসদ এ সিদ্ধান্তের দায়ভার নেবে না বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে গকসুর সহ-সভাপতি ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান জানান, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মতাদর্শগত মিল থাকায় তিনি ছাত্রদলে যোগ দিয়েছেন। তবে গকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো দলীয় পদ গ্রহণ করা যায় না বিধায় তিনি ছাত্রদলের কোনো পদ বা দায়িত্ব নেননি।

তিনি আরও জানান, গণ বিশ্ববিদ্যালয় একটি অরাজনৈতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সে কারণে ক্যাম্পাসের ভেতরে তিনি কোনো ধরনের দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হবেন না এবং অন্য কাউকেও তা করতে দেবেন না। শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কাজ আগের মতোই চালিয়ে যাবেন।

গকসুর সাধারণ সম্পাদক মো. রায়হান খান বলেন, ভিপির ছাত্রদলে যোগদান তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও বিষয়টি গকসুর গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে।

ছাত্র শিবিরের একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ৫ আগস্ট–সংক্রান্ত একটি ইস্যুতে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি একজন সাধারণ অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

গকসু নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার শিবির–সম্পর্কিত পোস্টের বিষয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং যারা পোস্ট দিয়েছেন, তারাই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।

গকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. সামিউল হাসান জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকে এবং তিনি তার ব্যতিক্রম নন।

তিনি আরও জানান, গণ বিশ্ববিদ্যালয় একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ছাত্র সংসদও একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। সে কারণে তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হবেন না এবং অন্য কাউকেও তা করতে দেবেন না।

ছাত্র শিবিরের সঙ্গে আদর্শিক অবস্থান প্রসঙ্গে সামিউল জানান, ছাত্র শিবিরের সৎ, দক্ষ ও আদর্শ নেতৃত্ব তৈরির যে দর্শন, সেটি তিনি ধারণ করেন এবং এটি তার কাছে ভালো লাগে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও সৎ, দক্ষ ও আদর্শ নেতৃত্ব গড়ে তোলার কথা বলতেন।

তিনি আরও জানান, শুধু ছাত্র শিবির নয়, ইনকিলাব মঞ্চ, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তিনি অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিভিন্ন পোস্টও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন।

সামিউল জানান, ভারতবিরোধী ও বাংলাদেশপন্থী অবস্থানের কারণে এসব বক্তব্যের সঙ্গে তিনি একমত। যারা সৎ, দক্ষ ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, তিনি তাদের পাশেই থাকেন।

ছাত্র শিবিরের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ছাত্র সংসদের কোনো সদস্য সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারেন না এবং তিনি নিজেও কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তবে ব্যক্তিগত আদর্শিক অবস্থান থাকা একজন নাগরিকের অধিকার।

সমাজকল্যাণ ও ক্যান্টিন সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অন্তর জানান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের মতাদর্শিক সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং তিনি শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে কাজ করে আসছেন। তবে গকসু নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ছাত্রদলে যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, মতাদর্শগত মিল থাকায় ছাত্রদলে যুক্ত হলেও কোনো পদ বা দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।

গকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অবগত রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না- এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গকসুর যাত্রা শুরু হয়। গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রায় সাত বছর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সহসভাপতি পদে ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক পদে মো. রায়হান খান, সহ সাধারণ সম্পাদক পদে মো. সামিউল হাসান এবং সমাজকল্যাণ ও ক্যান্টিন সম্পাদক পদে মো. মনোয়ার হোসেন অন্তর নির্বাচিত হন।