২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৬

তরুণদের চোখে নির্বাচন ও আগামীর বাংলাদেশ

তরুণদের চোখে নির্বাচন ও আগামীর বাংলাদেশ  © টিডিসি সম্পাদিত

আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে তরুণ ও শিক্ষার্থী ভোটাররা, যাদের অনেকেই ভোটার হওয়ার পর এই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেদের ভোটের মাধ্যমে দেশ গঠনের অংশীদার হতে চায় তারা। তাদের প্রত্যাশা—ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্ব দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেবে এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেই ভাবনাই তুলে ধরেছেন ডিআইইউ প্রতিনিধি নুর ইসলাম। 

নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও শঙ্কা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি ভবিষ্যৎ গড়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। কারণ জাতীয় সংসদ থেকেই রাষ্ট্রের বাজেট প্রণীত হয়, আর সেই বাজেটের ওপর নির্ভর করে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ, ক্যাম্পাসের অবকাঠামো ও শিক্ষার মান। একটি ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মনে নতুন আশা জাগায়—নতুন ল্যাব, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, গবেষণায় সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিবেশের স্বপ্ন।

কিন্তু এই আশার পাশেই রয়েছে গভীর শঙ্কা। অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শিক্ষাঙ্গনে। ক্যাম্পাসে সংঘাত, দখলদারিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে; কেউ আহত হয়েছেন, কেউ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে নির্বাচন এলেই আনন্দের সঙ্গে উৎকণ্ঠাও ঘিরে ধরে শিক্ষার্থীদের।

তবুও সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে—পরিবর্তনের শক্তি তাদের হাতেই। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তরুণ শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখছে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসম্পন্ন বাংলাদেশের। তারা চায় এমন এক যোগ্য ও দায়িত্বশীল সরকার, যারা শিক্ষা, মানবিকতা ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামীর বাংলাদেশকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেবে।

মাসুমা বিনতে মুজিব
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কেমন দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা

জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে যে নতুন যাত্রার সূচনা হয়েছে, তার চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষার্থীরাই। প্রযুক্তির বিকাশে আজ শহর-গ্রামের ব্যবধান কমেছে, তথ্য ও শিক্ষার আলো পৌঁছেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেড়েছে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ। তারা স্বপ্ন দেখছে এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ মিলবে সবার জন্য।

শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—কোনো ধরনের রাজনৈতিক হয়রানি থাকবে না, নারী সমাজ কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে নিরাপদ থাকবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে সহিংসতা ও দলীয় দখলমুক্ত। সরকার হবে শিক্ষার্থী-বান্ধব; তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি গ্রহণ করবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে সৃজনশীল ও গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা চালু করতে হবে, বাড়াতে হবে শিক্ষা খাতে বাজেট ও বৃত্তির সুযোগ।

একই সঙ্গে প্রশ্নফাঁস ও অবৈধ বাণিজ্য রোধে কঠোর ব্যবস্থা, কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার, মানসম্মত উচ্চশিক্ষা গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে তরুণদের দেশে রাখার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের চোখে এভাবেই গড়ে উঠুক একটি আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ।

সামিহা সিরাজী লাজ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থীদের চোখে নেতৃত্বের সংকট

আজকের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিতে নেতৃত্বের সংকট একটি গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার আসন নয়; এটি সততা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতার নাম। কিন্তু বাস্তবে তারা দেখছে, অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিস্বার্থ ও দলীয় প্রভাব ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এতে তরুণ সমাজে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, দুর্বল হচ্ছে আদর্শের প্রতি আস্থা।

এই সংকট শিক্ষাঙ্গনেও স্পষ্ট। ছাত্রসংগঠন বা শ্রেণি প্রতিনিধিত্বে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব ও পক্ষপাত অনেক সময় মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে প্রকৃত নেতৃত্বের চর্চা ব্যাহত হয় এবং তরুণদের সৃজনশীল শক্তি সমাজ গঠনে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায় না।

তবু আশার পথ বন্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নির্বাচন, নেতৃত্ব বিকাশমূলক কার্যক্রম ও মুক্ত মতপ্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণরাই ভবিষ্যতের নেতৃত্বের প্রধান ভরসা—এই বিশ্বাস নিয়ে নিজেদের ভেতর থেকেই যদি তারা সততা ও মানবিকতার ভিত্তিতে নেতৃত্বের গুণ গড়ে তোলে, তবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

তাসনিম আক্তার কনা
শিক্ষার্থী, ঢাকা সিটি কলেজ

নারীর ভোটাধিকার: ভয়ের দেয়াল ভেঙে এগোনোর সময়

নির্বাচন মানেই অশান্তি—এই ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি বাক্য: “মেয়েরা না গেলেই ভালো।” কথাটি যত সহজে বলা হয়, বাস্তবে ততটাই গভীর বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায়, নারীর ভোটকে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ও গৌণ হিসেবে দেখা হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভোট দিতে আগ্রহী হলেও পরিবার ও সমাজের ভয়ের কারণে সেই ইচ্ছা দমে যায়। ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক চাপ কিংবা কটূক্তির আশঙ্কা নারীদের অংশগ্রহণ আরও সংকুচিত করে।

তরুণ প্রজন্ম জানে, ভোট দেওয়া শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি নিজের মত প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। তাই নারীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক সমর্থন ও সামাজিক সাহস। সহিংসতা ও অনিয়মকে স্বাভাবিক না ভেবে প্রতিবাদ জানানো, একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং মুক্তভাবে কথা বলাই পারে পরিবেশ বদলাতে। নারীর নিরাপদ ও স্বাধীন ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাই গণতন্ত্রের প্রকৃত অগ্রযাত্রা।

তাসনীম
শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি 

সব মিলিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণ ও শিক্ষার্থী ভোটারদের কাছে শুধু একটি ভোটের দিন নয়—এটি তাদের ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার এক বড় সুযোগ। তারা চায় এমন একটি নির্বাচন, যেখানে সহিংসতা, ভয় ও অনিয়মের জায়গা থাকবে না; থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা। শিক্ষার্থীদের বিশ্বাস—যদি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায়, তবে এই প্রজন্মই পারে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দেশকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নিতে।