২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭:৫৯

অর্থবহ জীবন গঠনের বার্তায় ড্যাফোডিলের ১৩তম সমাবর্তন, ডিগ্রি পেলেন ৪০২০ শিক্ষার্থী

ডিআইইউর ১৩তম সমাবর্তন  © সৌজন্য প্রাপ্ত

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) ১৩তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকালে ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ৪ হাজার ২০ জন শিক্ষার্থী সমাবর্তন গ্রহণ করেন। এছাড়াও কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জনকারী পাঁচ স্নাতককে দেয়া হয় চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল, চার স্নাতককে দেয়া হয় চেয়ারম্যান গোল্ড মেডেল এবং তিন জন স্নাতককে দেয়া হয় ভাইস-চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল। মোট গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৩ হাজার ৩৯১ জন স্নাতক এবং ৬২৯ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।  

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি হিসেবে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও সনদ প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস. এম. এ. ফায়েজ। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং ব্র্যাক এর চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রেরিত এক বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এই সমাবর্তন কেবল একটি ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং তোমাদের জীবনের এক নতুন এবং অর্থবহ অধ্যায়ের সূচনা। বিশ্ব আজ এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আমরা একটি থ্রি জিরো ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা করছি অর্থাৎ শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ, শূন্য সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ এবং শূন্য বেকারত্ব। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির মতো একটি উদ্যোক্তা বান্ধব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে তোমরা আজ এমন এক অবস্থানে আছো যেখান থেকে এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব। তোমাদের অর্জিত জ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যে নয়, বরং একটি বৈষম্যহীন ও পরিবেশবান্ধব নতুন পৃথিবী গড়ার ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস. এম. এ. ফায়েজ বলেন, শিক্ষার্থীরা আজ এমন এক পৃথিবীতে পা রাখছে যা রোমাঞ্চকর, দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং উদ্ভাবনী সম্ভাবনায় ভরপুর। শিক্ষা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি যে অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে, তা জাতীয় অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মনে রাখবে, ডিগ্রির চেয়ে বড় হলো বিবেক। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তোমাদের ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও দৃঢ় হওয়া উচিত। সেই নৈতিক শক্তি নিয়ে তোমরা দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করবে।

সমাবর্তন বক্তা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। আগে আমরা সীমিত সম্পদ নিয়ে কীভাবে টিকে থাকা যায় আর সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেই কথাই বলতাম। আজ আমাদের অর্থনীতি মজবুত হয়েছে, কিন্তু শুধু বেশি পরিমাণে পণ্য তৈরি করলেই চলবে না—গুণগত মান বাড়ানো এখন সবচেয়ে জরুরি। আমরা যেন মধ্য-আয়ের ফাঁদে আটকে না যাই, সেজন্য আমাদের উদ্ভাবনী শক্তি বাড়াতে হবে, জ্ঞানভিত্তিক কাজে এগোতে হবে এবং নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে। তোমাদের এই তরুণ প্রজন্মকেই এখন এমনভাবে গড়ে উঠতে হবে, যেন তোমরা শুধু কারও নির্দেশ পালনই নয়, বরং নিজেরাই নতুন সমস্যার সমাধান বের করতে পারো।  

শিক্ষা ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি যে অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে, তা জাতীয় অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মনে রাখবে, ডিগ্রির চেয়ে বড় হলো বিবেক। একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তোমাদের ভালো-মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও দৃঢ় হওয়া উচিত। সেই নৈতিক শক্তি নিয়ে তোমরা দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করবে।-ইউজিসি চেয়ারম্যান

তিনি আরও বলেন, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও নতুন উদ্ভাবনের যে জোরেশোরে কাজ চলছে, তা দেখে আমি খুবই আশাবাদী। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদান এবং গবেষণার মধ্যে একটা ফাঁক থেকে যায়, কিন্তু ড্যাফোডিলে বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করা হয়—যেমন জলবায়ু সহনশীল কৃষি, সবার জন্য ব্যাংকিং সুবিধা (ফিনটেক), এবং টেকসই শহর পরিকল্পনা। এগুলো শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করে না, বরং দেশের জন্য এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ তৈরি করে, যা আমাদের অর্থনীতিকে বিশ্বের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেও শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করবে।

আজকের দিনটি শুধু একটি সনদ গ্রহণের দিন নয়। এটি জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার দিন। আজ থেকে গ্র্যাজুয়েটরা আর শুধু শিক্ষার্থী নয়—তারা সমাজের অংশীদার এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা।-ডিআইইউ চেয়ারম্যান

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান বলেন, আজকের দিনটি শুধু একটি সনদ গ্রহণের দিন নয়। এটি জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার দিন। আজ থেকে গ্র্যাজুয়েটরা আর শুধু শিক্ষার্থী নয়—তারা সমাজের অংশীদার এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কখনোই তার গ্র্যাজুয়েটদের শুধু চাকরি প্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়নি। আমরা চাকরি দাতা হিসাব এ তৈরি করেছি। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অবকাঠামো নয়, আমাদের  গ্র্যাজুয়েটরা।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির বলেন, এই সমাবর্তন তোমাদের পড়ালেখার একটি অধ্যায়ের শেষ, কিন্তু বাস্তব জীবনের শুরু। ড্যাফোডিলে তোমরা যে শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করেছো, তা তোমাদেরকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি করেছে। আমাদের এমপ্লয়াবিলিটি ৩৬০ ফ্রেমওয়ার্ক ও স্মার্ট সিটি ক্যাম্পাস তোমাদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা ও বৈশ্বিক মনোভাব গড়ে তুলেছে। আজ থেকে তোমরা শুধু স্নাতক নও, তোমরা ড্যাফোডিলের প্রতিনিধি। আজকের পর থেকে শুধু নিজের পরিবার ও সমাজে নয়, বরং দেশের পাশাপাশি বিশ্বময় ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে এগিয়ে যাও।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১৩তম সমাবর্তনের ভ্যালিডিক্টোরিয়ান হিসেবে মোছা. স্বপ্নীল আক্তার নূ তার বক্তব্যে বলেন, এখানে দাঁড়িয়ে আমি গর্ববোধ করছি। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এই যাত্রা আমার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে আমাকে গড়ে তুলেছে। জীবনের পরবর্তী ধাপে প্রবেশের সময় মনে রেখো: সাহসের সাথে স্বপ্ন দেখবে, সততার সাথে কাজ করবে। যদি পরেও যাও, তবুও সাহসের সাথে ঘুরে দাঁড়াবে। ভবিষ্যৎ তাদেরই যারা নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখে, এমনকি যখন পথ অস্পষ্ট থাকে।

স্বর্ণপদক প্রাপ্তদের মধ্যে চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল পান মোছা. স্বপ্নীল আক্তার নূ, মোছা. জাকিয়া আক্তার, সৌরভ গারদিয়া ,আরিফুল রহমান, মুনতাসির সরকার। চেয়ারম্যান গোল্ড মেডেল পান আনজির রহমান খান, মো. তুহিন ইসলাম, মো. আবু বকর সিদ্দিক, মো. আবু বকর সিদ্দিক এবং ভাইস-চ্যান্সেলর্স গোল্ড মেডেল পান শাহরিয়ার শহীদ, বায়েজিদ চৌধুরী, হালিমা আক্তার।

অনুষ্ঠানের শেষাংশে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্লাব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিবেশন করে। জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠান মধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে আনন্দঘন করে তোলে।