বাজারমুখী শিক্ষা ও অ্যাপারেল শিল্প: এআইয়ের হাত ধরে ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ
একবিংশ শতাব্দী প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন সভ্যতার যুগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়; বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে টিকে থাকতে হলে প্রতিটি দেশকেই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফ্যাশন ও অ্যাপারেল শিল্পেও এআই একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং শিক্ষায় এআই-এর ব্যবহার বাজারমুখী, যুগোপযোগী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং প্রায় কয়েক কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ফলে এই শিল্পের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক ও জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। এই শিল্পকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি। অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যা উৎপাদক, ক্রেতা ও বাজারের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে।
বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও রিটেইল প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহার করে ট্রেন্ড ফোরকাস্টিং, ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ফলে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, অপচয় কমাচ্ছে এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।
একসময় মার্চেন্ডাইজিং কার্যক্রম প্রধানত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অনুমান ও সীমিত তথ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু আধুনিক এআই প্রযুক্তি বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাজারের গতিপ্রকৃতি, ক্রেতার আচরণ, ক্রয়ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম। কোন মৌসুমে কোন পণ্যের চাহিদা বাড়বে, কোন ডিজাইন জনপ্রিয় হবে, কোন দেশে কোন রঙ বেশি বিক্রি হবে—এসব তথ্য এখন AI খুব সহজেই বিশ্লেষণ করতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও রিটেইল প্রতিষ্ঠানগুলো এআই ব্যবহার করে ট্রেন্ড ফোরকাস্টিং, ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, প্রাইসিং স্ট্র্যাটেজি এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। ফলে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে, অপচয় কমাচ্ছে এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি বাড়াচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।
এই প্রেক্ষাপটে অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং শিক্ষাক্রমে এআই অন্তর্ভুক্ত করা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি। বর্তমান শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং তাদের প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ডেটা অ্যানালিটিক্স, মেশিন লার্নিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইআরপি সফটওয়্যার, ব্লকচেইন-ভিত্তিক সাপ্লাই চেইন, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং অটোমেশন সিস্টেম সম্পর্কে ধারণা থাকলে একজন শিক্ষার্থী বৈশ্বিক মানের মার্চেন্ডাইজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
এআই প্রযুক্তির সাহায্যে বর্তমানে ভার্চুয়াল স্যাম্পল তৈরি, থ্রিডি ডিজাইন, ডিজিটাল ফিটিং, স্মার্ট অর্ডার প্রেডিকশন এবং স্বয়ংক্রিয় কোয়ালিটি কন্ট্রোল অনেক সহজ হয়ে গেছে। আগে যেখানে একটি স্যাম্পল তৈরি করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সময় লাগত, এখন তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্ভব। এতে সময় ও ব্যয় উভয়ই সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ ও কাপড়ের অপচয়ও কমছে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এআই-ভিত্তিক শিক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই যথেষ্ট নয়; বরং পণ্যের মান, সময়মতো ডেলিভারি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং ডিজিটাল স্বচ্ছতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব ক্ষেত্রে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মার্চেন্ডাইজার তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ব।
তবে এই পরিবর্তনের পথে নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনো আধুনিক সফটওয়্যার, প্রযুক্তি ল্যাব, হাই-স্পিড ইন্টারনেট এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রম হালনাগাদ হয় না দীর্ঘদিন। ফলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক অপরিহার্য। নিয়মিত ওয়ার্কশপ, সেমিনার, অনলাইন কোর্স এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের আপডেট রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রযুক্তি-ভিত্তিক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানো এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে গবেষণামুখী ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
এক্ষেত্রে শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক অপরিহার্য। নিয়মিত ওয়ার্কশপ, সেমিনার, অনলাইন কোর্স এবং আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের আপডেট রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রযুক্তি-ভিত্তিক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
এআই ব্যবহারের ফলে কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে—এমন একটি ভয় অনেকের মধ্যেই রয়েছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এআই অনেক কাজকে সহজ করেছে এবং নতুন ধরনের পেশার সৃষ্টি করেছে। দক্ষ মানবসম্পদ থাকলে এআই কখনোই হুমকি নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তাই শিক্ষার মাধ্যমেই এই ভয় দূর করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং শিক্ষায় এআই-এর সংযোজন শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলবে, দেশের শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে টেকসই করবে। বাজারমুখী, আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এখনই আমাদের এআই-নির্ভর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ দক্ষ মানবসম্পদই একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ—আর সেই সম্পদকে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
লেখক: ডিন, স্কুল অব বিজনেস, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি