২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৩:৩৩

‘পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন’

HROC লিগ্যাল স্কিলস বুট ক্যাম্প ২০২৫  © টিডিসি ফটো

শেষ হলো দেশব্যাপী আইন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন সেন্টারের আয়োজনে শুরু হওয়া ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও আইন পেশার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা প্রস্তুত করতে তিন দিনব্যাপী ‘HROC লিগ্যাল স্কিলস বুট ক্যাম্প ২০২৫’। 

বুট ক্যাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল ‘শিখুন (Learn), যুক্ত হোন (Link), এবং নেতৃত্ব দিন (Lead)’—এই স্লোগানের মাধ্যমে পেশাদার দক্ষতা ও পারস্পরিক যোগাযোগের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা।

বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সুবর্ণগ্রাম অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টে সকাল ১০ টায় এই বুট ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় এবং সমাপনী হয় শনিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫ টায়। 

তিন দিনের এই বুট ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিল দেশের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাছাই হওয়ার পরে একটা নির্দিষ্ট রেজিস্ট্রেশন ফি প্রদানের মাধ্যমে এই ক্যাম্পের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। আয়োজনটির প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ছিল বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। যাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান প্রশিক্ষণার্থী ও অংশগ্রহণকারীদের ঋদ্ধ করার অঙ্গীকার ছিল। 

বুট ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো—ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, সাদার্ন ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। 

শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত হয় সুবর্ণগ্রাম অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টে। তিন দিনের এই কর্মশালায় আইনি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ছিল আরামদায়ক আবাসন ব্যবস্থা, পার্ক ভ্রমণের সুযোগ, সৃজনশীল কার্যক্রম, লেক আড্ডা, স্টাডি সেশন, সুইমিং,  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জমকালো বারবিকিউ ডিনারের আয়োজন ইত্যাদি। 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন HROC লিগ্যাল স্কিলস বুট ক্যাম্প ২০২৫’-এর  আহবায়ক, হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন সেন্টারের ভাইস- প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদ। সূচনা বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন এর সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম।

অতিথি ও বক্তাবৃন্দ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটছে, একইসাথে মানবাধিকারের গুরুত্বও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ আইন শিক্ষার্থী বিচার বিভাগ, কর্পোরেট বা অ্যাডভোকেসির দিকে ঝুঁকছে। অথচ দেশের ল ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়া, দেশকে সমৃদ্ধ করার কথাও বলেন।"

তিন দিনের এই ক্যাম্পে চারটি বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী দিনে মানবাধিকার আইন নিয়ে সেশন পরিচালনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদ। এখানে মানবাধিকার আইনের মৌলিক ধারণা, এর গুরুত্ব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। দ্বিতীয় দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. একরামুল হক আইন গবেষণা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেন। সেশনে আইন গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতি, তথ্য সংগ্রহের কৌশল এবং গবেষণাপত্র লেখার সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়। এই সেশনের উপর ভিত্তি করে একটি গ্রুপ পোস্টার প্রেজেন্টেশন হয়। বিচারকদের বিচারে একটি টিম জয়যুক্ত হয়ে নগদ ৮০০০ টাকা সম্মানি এবং বাকি টিমগুলি নগদ ৪০০০ টাকা সম্মানি পুরষ্কার হিসেবে অর্জন করেন।

একই দিনে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর হায়দার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাট যৌথভাবে লিগ্যাল রাইটিং স্কিলস সেশন পরিচালনা করেন। এই সেশনে আইনগত লেখালেখির দক্ষতা, যেমন মামলার ড্রাফটিং, আবেদনপত্র তৈরি এবং অন্যান্য আইনি নথি লেখার কৌশল শেখানো হয়। সমাপনী দিনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (ড্রাফটিং) এস. এম. শাফায়েত হোসেন লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং বিষয়ক সেশন নেন। সেশনে নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইনের সংশোধনের জন্য কীভাবে খসড়া তৈরি করতে হয়, তার পদ্ধতি ও নিয়মকানুন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এই সেশনের উপর ভিত্তি করে নতুন আইন প্রণয়নের উপর গ্রুপ প্রেজেন্টেশন হয়। 

এই তিন দিনের ক্যাম্পে সেশনের পাশাপাশি ছিল বিনোদন ও আনন্দঘন কিছু মজাদার কার্যক্রম। প্রথম দিনের একটিভিটি ছিল আইস ব্রেকিং এবং ফিমেল একটিভিটি ট্রাস্ট বিল্ডিং। আইস ব্রেকিং সেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জড়তা কাটানো এবং পারস্পরিক পরিচিতি তৈরি করা। এর মাধ্যমে সবাই নিজেদের পরিচয়, আগ্রহ এবং প্রত্যাশা একে অপরের সাথে ভাগ করে নেয়। এটি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করে, যেখানে সবাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এরপর ছিল ট্রাস্ট বিল্ডিং কার্যক্রম। এই সেশনটি বিশেষভাবে মেয়েদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল তাদের মধ্যে আস্থা ও নির্ভরতা তৈরি করা। আরো ছিল গলফকাট (ই- কার) করে সুবর্ণগ্রাম পার্ক ভ্রমণ এবং  পার্কের দুর্দান্ত সব রাইডের অভিজ্ঞতা নেয়া। এছাড়া দিনের সব ক্লান্তি আর অবসাদ দূর করে রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য ছিল ছেলেদের সুইমিং পুলে সুইমিং একটিভিটি। 

দ্বিতীয় দিনের সকালে সকল অংশগ্রহণকারীরা ভোর ৭টায় ঘুম থেকে ওঠেন এবং এক ঘণ্টা ধরে এক্সারসাইজ ও ওয়ার্ম-আপ কার্যক্রমে অংশ নেন। এই কার্যক্রমে বিভিন্ন শারীরিক খেলাধুলা ও দলগত অনুশীলনের মাধ্যমে সকলের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতা তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই দিনের পরবর্তী কার্যক্রম ছেলেদের জন্য বিশেষভাবে ট্রাস্ট বিল্ডিং  ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা বাড়াতে সাহায্য করে।

তৃতীয় দিনে চা-চা ডান্স নামে একটি মজার একটিভিটি। যা সকল অংশগ্রহণকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে আনন্দলাভ করেন। 

তৃতীয় দিন তথা সমাপ্তি দিনের বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সালাহউদ্দিন দোলন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এলএল.এম. প্রোগ্রামের পরিচালক কাজী মাহফুজুল হক সুপন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন এর সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাট। সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন HROC লিগ্যাল স্কিলস বুট ক্যাম্প ২০২৫’-এর  আহবায়ক, হিউম্যান রাইটস অবজারভেশন সেন্টারের ভাইস- প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ আহসান খালিদ।

তিনদিনের এই বুট ক্যাম্পে সকল অংশগ্রহণকারীর সার্বিক কার্যক্রম এবং পারফরম্যান্স এর উপর ভিত্তি করে ৪টি ক্যাটাগরিতে ৪টি টিমকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়। 

সার্বিক এই আয়োজনে মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল যমুনা টেলিভিশন, নিউজ টোয়েন্টিফোর, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, আজকের পত্রিকা এবং দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস।