২৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:৫৯

১০ বছরে ৫২ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ভালো করেনি একটিও

বর্তমানে দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১০৩টি। এরমধ্যে গত দশ বছরেই অনুমোদন পেয়েছে ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি, না হয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অবৈধ সনদ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রায় ৮০ শতাংশ আসনই ফাঁকা থাকছে নামেমাত্র গড়ে ওঠা এসব উচ্চশিক্ষালয়ের। সব মিলিয়ে গত দশ বছরে অনুমোদন পাওয়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনটিই ভালো করতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষা চালু হয় ১৯৯২ সালে। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১টি। এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৮— এ দশ বছরেই অনুমোদন দেয়া হয়েছে আরও ৫২টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। সবমিলিয়ে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৩। এরমধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান রয়েছে ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

গত দশ বছরের সাল ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫১টি। পরের বছরও এ সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে। ২০১১ সালে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়। আর ২০১২ সালে অনুমোদন দেয়া হয় ৮টি। গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে ২০১৩ সালে। ওই বছর ১৮টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিলে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৮টি। এরপর ২০১৪ সালে ২টি, ২০১৫ সালে ৫টি এবং ২০১৬ সালে ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন লাভ করে। ২০১৭ সালে নতুন কোন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না পেলেও ২০১৮ সালে আরও ৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

বেসরকারি খাতের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে নজর না দিয়ে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমোদন দেয়াকে অযৌক্তিক বলছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই আসন অনুপাতে শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এর পরও নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দিয়ে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো স্থাপনের মধ্য দিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত দশ বছরে অনুমোদন পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই আইন ও নীতিমালা অনুসরণ করছে না। এক বছরেও কোন ধরনের সিন্ডিকেট, অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল এবং ফাইন্যান্স কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়নি— এমন তালিকায় থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগই নতুন। শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়াই অনেকটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এসব বিশ্ববিদ্যালয়।

গত দশ বছরে অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। অনুমোদনের এক বছরেই অবৈধ সনদ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার বছর ২০১৪ সালের এপ্রিলে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামের অনুমোদন পায় রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি। সে অনুযায়ী চার বছর মেয়াদি ওই প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ হওয়ার কথা ২০১৮ সালে। অথচ প্রোগ্রাম অনুমোদনের পরের বছর ১৭ মাসের মধ্যেই আবদুল মোতালেব হাওলাদার নামের এক শিক্ষার্থীকে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সনদ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

অবৈধ সনদের প্রমাণ মিলেছে খোদ উচ্চশিক্ষার তদারক প্রতিষ্ঠান ইউজিসির তদন্তে। রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির অবৈধ সনদ প্রদান বিষয়ে ইউজিসির এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ বছর ৫ মাসের মধ্যে কীভাবে চার বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্সের সনদ দেয়া হলো এবং ডিগ্রিপ্রাপ্ত ব্যক্তি বরিশাল সিটি করপোরেশনে কর্মরত অবস্থায় কীভাবে নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ করলেন, সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার। একই ভাবে ৮৫ জনকে সনদ দেয়া হয়েছে বলেও কমিটিকে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) সুমন চন্দ্র দাস। 

বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজের বিরুদ্ধেও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আজিজ তার ঢাকাস্থ আবাসিক ফ্ল্যাটের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের লিয়াজোঁ অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি মাসে ৬৫ হাজার টাকা করে নিয়েছেন তিনি, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অর্থ আত্মসাতের শামিল।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ তলাবিশিষ্ট ভাড়াকৃত ভবনের নিচতলায় গাড়ি মেরামতের গ্যারেজসহ দোকানপাট থাকায় শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। মাত্র তিনটি ল্যাবরেটরি থাকলেও এগুলোয় উল্লেখযোগ্য কোনো যন্ত্রপাতি নেই। টেক্সটাইল, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফার্মাসি বিষয়ে প্রোগ্রাম থাকলেও এ বিষয়ক কোনো ল্যাব নেই। সিএসই বিভাগে ১৪টি কম্পিউটার থাকলেও নেই কোনো ইন্টারনেট সংযোগ। ইইই বিভাগে দৈন্যদশায় একটি ল্যাব থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবহারের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। শ্রেণিকক্ষ-গুলোয় ধুলাবালি জমে থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্লাস পরিচালিত হয় না বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা অপর্যাপ্ত এবং পড়ালেখার কোনো অনুকূল পরিবেশ নেই।

নানা অনিয়মে জড়িয়ে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনেও ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩ হাজার ৭৫০টি আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে মাত্র ৩৭৬ জন। অর্থাৎ আসনের ৯০ শতাংশই ফাঁকা থাকছে নতুন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের।

একইভাবে ২০১৪ সালে অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের জড়িয়ে পড়েছে কুমিল্লার সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিরও অনুমোদন দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের তত্কালীন সংসদ সদস্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা।

এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অনিয়ম নিয়েও তদন্ত করেছে ইউজিসি। ইউজিসির গত বছরের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুমোদনের দুই বছরেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে উপাচার্য, উপাচার্য ও এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়নি। রেজিস্ট্রার নিজেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বিষয়াদি দেখাশুনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্ট তার নামে এবং তিনিই সব চেক স্বাক্ষর করেন।

অবকাঠামো বিষয়ে বলা হয়েছে, স্থাপনা বলতে দুইতলা একটি ভবন ছাড়া আর কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে দেড় কোটি টাকা থাকার কথা থাকলেও তাদের ফান্ডে কোনো টাকা নেই। ৩টি অনুষদের অধীনে ৬টি বিভাগের ৮টি প্রোগ্রাম অনুমোদন রয়েছে। সেখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ১৩৪ জন। তার মধ্যে নিয়মিত ৯৪ জন বলে ইউজিসির টিমকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন। এছাড়া একাডেমিক, সিন্ডিকেট, শৃঙ্খলা কমিটি, পাঠ্যক্রম এবং অর্থ কমিটি নামে কোনো কমিটি নেই। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার মতো সুপরিসর কোনো ক্লাসরুম নেই। গবেষণাগার নেই। কম্পিউটার ল্যাব নেই। এমনকি বিবিএ, আইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলেও সেগুলোর পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পূর্ণকালীন শিক্ষকও নেই। এমনকি কর্মদিবস থাকার পরও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়েও ভিন্ন চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটি ভবনের সামনে রিসার্চ সেন্টার লেখা ব্যানার থাকলেও দায়িত্বরত কর্মচারীকে ভবন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘স্যাররা আসলে এখানে রাতে বিশ্রাম নেন। এখানে থাকার সুব্যবস্থা আছে।'

অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ২০১২ সালে অনুমোদন পাওয়া কুমিল্লার ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধেও। বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা থাকায় ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে ইউজিসি। ইউজিসির ওয়েবসাইটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ফাইভ স্টার দিয়ে রেড মার্ক করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে। একইভাবে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ফরিদপুরের টাইমস ইউনিভার্সিটির বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সব মিলিয়ে ৪০০১ জন শিক্ষার্থী ও ২৮ জন শিক্ষক রয়েছে। যদিও ইউজিসির এক তদন্তে এর চেয়েও খারাপ অবস্থা উঠে আসে।

নানা অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি করার দায়িত্ব ইউজিসির। বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।