০৮ জানুয়ারি ২০২৪, ১৮:১৩

ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে যেভাবে শ্রেষ্ঠত্বের জয়মালা বুঁনলো ইউআইইউ

ইউআরসির সর্বশেষ আসরে এশিয়ার শীর্ষ দলের মুকুট অর্জন করেছে ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’  © ফাইল ছবি

বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত রোবোটিকস প্রতিযোগিতা ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের (ইউআরসি) সর্বশেষ আসরে এশিয়ার শীর্ষ দলের মুকুট অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার টিম’। মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মধ্যে তারা বৈশ্বিক নবম স্থান দখল করে নিয়েছে। অন্য দেশের দলগুলো থেকেও পেয়েছে বিশেষ সমীহ ও সম্মান। টানা দু’বার এশিয়ার সেরা দল হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের বৈশ্বিক র‌্যাংকিং আগের ১৩তম থেকে ৯ম -এ এগিয়ে এসেছে। আগামীতে আরো সামনে যাওয়ার স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির দলটি।

মানুষের মঙ্গলযাত্রাকে আরও অর্থবহ করতে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের আয়োজন। মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে আরও নতুন নতুন তথ্য জানা এবং লাল গ্রহটিতে মানুষের বসবাসের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করতে প্রতি বছর এ আয়োজন করে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান মার্স সোসাইটি। বিদায়ী ২০২৩ সালে সর্বশেষ আয়োজিত প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউটা স্টেটের হ্যাঙ্কসভিলে অবস্থিত বিখ্যাত মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে। 

ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের তত্ত্বাবধানে ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেকুল ইসলাম। পরামর্শক বা মেন্টরের দায়িত্ব পালন করেন প্রভাষক আকিব জামান (স্টাডি লিভ)। ১০ সদস্যের দলটির দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইলেক্ট্রিক্যাল ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের আবিদ হোসাইন।

আরও পড়ুন: চাকরির বাজারে ‘ডে ওয়ানে’ কাজ পাবেন ইউআইইউ স্নাতকরা

অন্যরা হলেন- টি এম আল আনাম (সহ-দলনেতা), আহমেদ জুনায়েদ (যন্ত্রকৌশল নেতা, যন্ত্রকৌশল ফেব্রিকেশন), মো. বদিউজ্জামান (যন্ত্রকৌশল নেতা, থ্রিডি ডিজাইন), আব্দুল্লাহ আল মাসুদ (সফটওয়্যার অ্যান্ড অটোনমাস নেতা), সরওয়ার হোসেইন (সফটওয়্যার অ্যান্ড অটোনমাস সদস্য), শেখ সাকিব হোসেন (সফটওয়্যার অ্যান্ড অটোনমাস সদস্য), সুরাইয়া আফরোজ (বিজ্ঞান সদস্য), শাহ মেহরাব হোসেন (ইলেকট্রিক্যাল নেতা) ও মো. ইয়াসিন (লজিস্টিক নেতা)। 

এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং সেরাদের কাতারে যাওয়ার জন্য নানা চ্যালেঞ্জ জয় করতে হয়েছে রোভার দলটিকে। প্রথমেই ছিল ২৪ সদস্যের টিম থেকে ১০ জনকে প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করা। মৌখিক পরীক্ষা এবং ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে সে ধাপ পার হয় দলটি। কিন্তু তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রস্তুতিতে। এ প্রসঙ্গে দলটির মেন্টর এবং ইউআইইউ’র প্রভাষক আকিব জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে উচ্চমানের ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাচাঁমাল তেমন পাওয়া যায় না। প্রস্তুতি পর্বে এ নিয়ে বড় ঝক্কি পোহাতে হয়। একটি লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সেল নিয়ে আসতে হয়েছিল। এরপর প্রয়োজনমতো ব্যাটারি নিজেরাই তৈরি করি। পিসিবি বোর্ড তৈরি করতেও দেশের বাইরে থেকে নানা পণ্য আনতে হয়।’

নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং অনুসন্ধিৎসু মনকে কাজে লাগিয়ে যে রোবটটি দাঁড়ায়, ভালোবেসে তার নাম দেয়া হয়  ‘টেলস’। গ্রিক এ শব্দের অর্থ- উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য অর্জন করা। মার্স রোভার টিমটির লক্ষ্য ছিল- নিজেদের আগের ১৩তম বৈশ্বিক অবস্থান ছাড়িয়ে যাওয়া। পাশাপাশি নিজেদেরকে আরও উজ্জ্বল দল হিসেবে উপস্থাপন করা। দুই লক্ষ্য অর্জনেই সফল হয়েছে দলটি। আগেরবারের চেয়ে বেশি দলের মধ্যে এবার আরও সামনে অবস্থান এবং আয়োজক ও অন্য দলগুলোর কাছ থেকে তাদের কাজ, আগ্রহ ও দক্ষতা প্রশংসা কুঁড়িয়েছে। 

প্রতিযোগিতার আসরে যেন নিজেদেরকে তুলে ধরতে পারে সেজন্য দলটির পেছনে প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) কর্তৃপক্ষ। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও আগ্রহের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের প্রণোদনা দারুণ ফল এনে দিয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠিত মার্স রোভার ল্যাবটিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও চমপ্রদ কাজ-উদ্ভাবন করা যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে ‘টেলস’ রোবটটি দেশেও কৃষি উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবেলা, জরিপ কার্যক্রমসহ আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের নানা কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। 

আরও পড়ুন: যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি একশ’ শিক্ষার্থীর ৮ জন পড়েন বিনা খরচে

থ্রিডি নকশা, ড্রোন ও বিভিন্ন গিয়ার তৈরির পরও রোবটটিকে সম্পূর্ণ রূপ দিতে ধোলাইখাল ও নবাবপুরের কিছু ওয়ার্কশপে কয়েকটি যন্ত্রপাতি তৈরি করাতে হয় বলে জানান ইউআইইউ মার্স রোভার দলের প্রধান আবিদ হোসাইন। তিনি বলেন, আগের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা ছিল দলের কয়েকজন সদস্যের। কিছু কঠিন পরিস্থিতিতে উত্তীর্ণ হতে এবং ভুল-ত্রুটি এড়াতে সে অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। তবে আমাদের আরও ভালো করার সক্ষমতা ছিল। যে দুর্বলতা বা ভুলের কারণে সেটি করা যায়নি, আগামীর দল তা কাটিয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস রয়েছে।

দলের আরেক সদস্য ইয়াসিন আলী জানান, প্রতিযোগিতায় রকেটের মতো দেখতে একটি মকল্যান্ডার ব্যবহার করেন তারা। তাতে ইউএসবি পোর্ট ও বিভিন্ন বোতাম ছিল। রোবটিক হাত মকল্যান্ডারের বোতামগুলো নির্ধারিত সময়ে যেন টিপতে পারে, তা নিশ্চিত করা ছিল অন্যতম কঠিন কাজ। এ বিষয়ে আগে কারো অভিজ্ঞতা ছিল না। ইন্টারনেট ঘেটে নানা তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়। শুধু তাই নয়। একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করে প্রতিযোগিতার আগে উড্ডয়ন-অবতরণের পরীক্ষাও চালানো হয়। 

মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ইউআরসি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে নিজেদের তৈরি রোভারের ক্ষমতা এবং পরিচালন দক্ষতা প্রদর্শন করে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রতিযোগীরা। সক্ষমতা প্রকাশের অংশ হিসেবে অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিংয়ের মতো বিষয়গুলোর ওপর নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দেন ইউআইইউ শিক্ষার্থীরা।

ইউআরসি, বাংলাদেশ এবং ইউআইইউ 
সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায় ১৫টি দেশ থেকে ১০৪টি দল অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে শীর্ষ ৩৭টি দল প্রতিযোগিতার মূল পর্বে অংশগ্রহণ করে। ২০২৩ সালের গত ১-৩ জুন প্রতিযোগিতাটির চূড়ান্ত পর্ব যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ অঙ্গরাজ্যের হ্যাঙ্কসভিল শহরের মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ থেকে মোট তিনটি দল প্রতিযোগিতার ফাইনালে অংশ নেয়। এগুলো হলো- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ‘ইন্টারপ্ল্যানেটার’, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইউআইইউ মার্স রোভার’ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্র্যাকইউ মঙ্গল-তরী’ দল। 

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) দল ইউআইইউ মার্স রোভার দলটি বৈশি^ক র‌্যাঙ্কিংয়ে ৯ম এবং এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করে। এ দলটির স্কোর ছিল ২৭৩ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট। ফাইনাল পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, কলম্বিয়া, মিশর, মেক্সিকো এবং তুরস্কসহ ১০টি দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইউআইইউ মার্স রোভার দল। 

ফাইনালিস্ট ৩৭টি দলের প্রতিযোগিতায় ৪২৫ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনির্ভাসিটির একটি দল। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনির্ভাসিটির একটি দল ৩৫৪ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় এবং ৩৪৪ দশমিক ০৯ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিংহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির একটি দল।