০৩ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:০৭

জবিতে ট্রেজারার নিয়োগে বিলম্ব, অফিস স্থবির

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ফটো

গত মাসে শেষ হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কোষাধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়ার দ্বায়িত্ব। প্রায় ১৬ দিন পার হয়ে গেলেও এ পদে নতুন কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় দফতরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন সংশ্লিষ্ট অফিস ফাইল আটকে আছে। এমনকি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের আগামী মাসের বেতন ঠিক সময়ে হবে কি না এই নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সাবেক কোষাধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াকে তৃতীয় মেয়াদে পেতে শিক্ষা মন্ত্রণালায় ও সরকারের বিভিন্ন অফিসে তদবির করা হচ্ছে। সাবেক এ ট্রেজারের নামে নানা বিতর্ক থাকায় তাকে তৃতীয় মেয়াদে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মানতে নারাজ শিক্ষক-কর্মকর্তারা। এতে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাবেক কোষাধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া অবশ্য জানিয়েছেন তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্য থেকে ট্রেজারার নিয়োগ দেয়ার দাবি জানান। এদিকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাবেক ট্রেজারার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। এই বলয়ে নির্দিষ্ট কিছু লোক পদ-পদবি থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। নানা অনিয়মই নিয়মে পরিণত করেছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে তিনি অবৈতনিক কর্মকর্তা হলেও নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থ ভোগ বণ্টন করছেন। চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারীকে অনিয়ম করে একই দফতরের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছেন। অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একজন চুক্তিভিত্তিক আইটি কনসালট্যান্টকে সরাসরি প্রোগ্রামার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাবর্তনের টাকা নিজ আত্মীয়ের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডেমরা শাখায় একাউন্টে রেখে সুবিধা ভোগ করেছেন।

টেন্ডার ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দকৃত গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম সার্ভিস দেন সদ্য সাবেক এই কোষাধ্যক্ষ। জানা গেছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের মেয়াদ শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তিনজন শিক্ষকের নাম পাঠাতে হয়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু মো. সেলিম ভূঁইয়ার নাম পাঠানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষকের চাকরির সময়সীমা শেষ হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় একজন শিক্ষকের নাম পাঠানোয় সেই চিঠি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত পাঠিয়ে তিনজন শিক্ষকের নাম পাঠাতে বলে। দ্বিতীয় দফায় কোষাধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়াসহ আরো দুজনের নাম পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ এক প্রভাবশালী অধ্যাপকের আস্থাবাজন লোক হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০১৬ সালে মো. হাফিজুর রহমানকে চুক্তিভিত্তিক আইটি কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেন। হাফিজুর ২০১৬ সালে ইউজিসি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জারিকৃত সনদ গ্রহণযোগ্য নয় ‘পিপলস বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ০৩ মে ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামার পদে (৬ গ্রেড) পদে চাকরির অনুরোধ জানান। তখন হাফিজুরের চুক্তির মেয়াদ এক বছর বৃদ্ধির সুপারিশ করেন সেলিম ভূঁইয়া।

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ সালের হিসেবে ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন নিতে হলে ন্যূনতম ৫ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সালে ৬ মাসের জন্য এডহক ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামার হিসেবে যোগদান করেন হাফিজুর। ওই বছর ১৪ আগস্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় ৬ মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় হাফিজুরের। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ সালের কাঠামো অনুযায়ী ৫ বছর অভিজ্ঞতার কথা বলা থাকলেও মাত্র দুই বছরের অভিজ্ঞতা দিয়ে গত ১৬ মে ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০তম সিন্ডিকেটে হাফিজকে প্রোগ্রামার হিসেবে নিয়োগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আনোয়ার হোসেন সেলিম ভূঁইয়ার আস্থাভাজন হওয়ায় অনিয়ম করে একই দফতরের কর্মকর্তা পদে নিয়োগ করেন। অথচ দফতরে যোগ্যতাসম্পন্ন আরো কর্মচারী থাকলেও তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। এই কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি অনুমোদন ছাড়াই ঢাকার বাহিরে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে থাকেন।

অভিযোগ আছে, টেন্ডার ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ, ক্যাফেটিরিয়া, অ্যাডমিশন সার্ভারসহ বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও দফতরের কাজ করেন। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো অচল করে নিজেই সব কাজ করেছেন।

জানা গেছে , বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে কোষাধ্যক্ষের ‘অবৈতনিক’ পদ। এ পদের সম্মানী হিসেবে তিনি শুধু গাড়ি সুবিধা পাবেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে নিজ কর্মস্থল থেকে বেসিক বেতনসহ অন্যান্য সুবিধা পাবেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সেলিম ভূঁইয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধুমাত্র বেসিক বেতনই নেন অধ্যাপক সমমান ৭৬ হাজার ৪৯০ টাকা সব মিলিয়ে তা ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি। তৃতীয় মেয়াদে এ শিক্ষককে আবার নিয়োগ দেয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগার থেকে এ অতিরিক্ত খরচা গুনতে হবে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এদিকে কোষাধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়া গাড়ি ব্যাবহার করে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়) নিয়মিত যাতায়াত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব খাটিয়ে ইভিনিং এমবিএতে ক্লাস নিয়ে টাকা নেন। কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্প প্রণয়নের সময় দুই বেসিক বেতন ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা এবং জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে ৯০ হাজার টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ভূমি ক্রয় করার সময়ও একইভাবে টাকা নিয়েছেন। এভাবে দাফতরিক কাজকে অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা নেন তিনি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কোষাধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, আমি তো একা নিয়োগ দেই না, নিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে তা করা হয়েছে। ভিসি স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সমাবর্তনের টাকা ব্যাংকে জমা রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকার যে লভ্যাংশ এসেছে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হয়েছে।

গাড়ির বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য গাড়ি দিয়েছে। এটা আমি কি কাজে ব্যবহার করলাম তা তো দেখার বিষয় না।আর অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়াও আমার কাজের মধ্যে পড়ে। তাছাড়া এ গাড়িতে আমার স্ত্রীও কোনদিন উঠেনি। তৃতীয়বারের মতো ট্রেজারার হওয়ার জন্য কোনো ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে না।

এ বিষয়ে জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, ট্রেজারার নিয়োগটি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করে থাকেন। তারা যাকে যখন ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ দেবেন তখনই আমরা ট্রেজারার পাব।