২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩০

‘চাঁদা না দেওয়ায়’ যাত্রাবাড়িতে চালককে পিটিয়ে হত্যা ইস্যুতে বিবৃতি জামায়াত আমিরের

নিহত লেগুনা চালক নুরে আলম ওরফে খায়রুল ইসলাম (বামে) ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক লেগুনা চালককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকাল পৌনে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ত সংলগ্ন সুফিয়া গার্মেন্টসের পাশে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে রাতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

জানা গেছে, নিহত লেগুনা চালক নুরে আলম ওরফে খায়রুল ইসলাম (৩৫) শরীয়তপুরের শফিপুর সদরের সখিপুর থানার কাছিকাটা কান্দি গ্রামের মোয়াল্লেম সরদারের ছেলে। তিনি মাতুয়াইল মধ্যপাড়া এলাকায় একটি বাসায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন। অপরদিকে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা ব্যক্তির নাম হৃদয়, তিনিও লেগুনা চালক। তবে তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। অপরদিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চাঁদার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।

আজ রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দেওয়া বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একজন গাড়িচালককে চাঁদা লেনদেনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। এই ঘটনার নিন্দা জানাই। চাঁদার এ সংস্কৃতিকে এমনভাবে জাতীয়করণ করা হয়েছে, যেন চাঁদা না দেওয়াই অপরাধ! নেতৃত্বের জায়গা থেকে যখন চাঁদাবাজির বৈধতা দেওয়া হয়, তখন এ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলের ওপরেই বর্তাবে। মাঝখানে নিরীহ জনগণের জীবন এভাবেই কি ঝরে পড়বে?

তিনি বলেন, না, আমরা তা মেনে নিতে পারি না, মেনে নেব না। প্রিয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চাঁদাবাজবিরোধী আরেকটি আন্দোলন গড়ে তোলা এখনই সময়ের দাবি। দেশকে যারা ভালোবাসেন, তাদের সকলের প্রতি আমাদের একই কথা- চাঁদাবাজদের হাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে হলে সম্মিলিতভাবে লড়তে হবে। আমরা লড়ে যাব, ইনশাআল্লাহ।

জানা গেছে, লেগুনা চালক খাইরুল নিহত হওয়ার ঘটনায় শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) তার বাবা মোয়াল্লেম সরদার বাদী হয়ে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অপরদিকে খাইরুল হত্যার প্রতিবাদে ও বিচারের দাবিতে গতকাল শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লেগুনা চলাচল বন্ধ রাখেন ওই সড়কের চালকরা।

খাইরুল হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ২টার সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড লেগুনা স্ট্যান্ডে সিরিয়ালের বাইরে হৃদয় নামের লেগুনা চালক জোর করে তার লেগুনায় যাত্রী ওঠাতে থাকেন। এ সময় লেগুনা চালক খায়রুল আপত্তি জানালে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে হৃদয় খাইরুলকে হুমকি দিয়ে ‘তুই যাত্রাবাড়ী আয়’ বলে লেগুনা চালিয়ে চলে যায়।

পরে বিকেল পৌনে ৩টার সময় যাত্রাবাড়ীর সুফিয়া গার্মেন্টস সংলগ্ন লেগুনা স্ট্যান্ডে খাইরুল পৌঁছামাত্র হৃদয়ের নেতৃত্বে অন্যান্য লেগুনা চালক ইমরান, শাকিল, রায়হান, সোহানসহ ১০-১২ জন তাকে বেদমভাবে পিটিয়ে জখম করে। খাইরুলের অবস্থার অবনতি দেখে হামলাকারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লেগুনা চালক ও পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে চাঁদা নিয়ে পূর্ব-বিরোধের জেরে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তিনি মারা যান।

নিহতের খালাতো ভাই ওমর ফারুক বলেন, হৃদয় নামে এক চালক রোডে গাড়ি চালাতে গেলে চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় নুরে আলমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওর তিন বছরের একটি শিশুসন্তান রয়েছে। তাকে কী বুঝ দেব এখন। জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

নিহত খায়রুলের ছোট বোন আছিয়া আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, আমার ভাই আগে মাছের ফিডের ব্যবসা করত। দেড় বছর বেকার থাকার পর দেড়মাস ধরে ভাড়ায় লেগুনা চালাত। আমার একমাত্র ভাইয়ের ওপর ৭-৮ জনের পরিবারের সদসের ভরণ-পোষণ, পরিচালনা করা হত। তার আফোয়ানা আলম নুর নামের ৩ বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই।

ডিএমপির যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি খাইরুলের সঙ্গে অন্য এক লেগুনাচালকের ঝগড়া হয়। সেই শত্রুতার জেরে তাকে মারধর করে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। ওই ঘটনায় নিহতের পরিবার থানায় একটি হত্যা মামলা করেছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সূত্র বলছে, লেগুনা থেকে নারায়ণগঞ্জ ও ওয়ারি ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসিক ১ হাজার টাকা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের নামে ৫০০ টাকা ও লাইনম্যানের জন্য ৪০ টাকা হারে আদায় করা হয়। এ চাঁদাবাজির আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রাবাড়ী ও চিটাগাং রোড লেগুনা স্ট্যান্ডে বিরোধ চলে আসছে।