১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৫

নির্বাসন থেকে ঘরে ফিরেই প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমানের মতো গদিতে ফিরবেন অন্য রাজপুত্র?

তারেক রহমান ও রেজা পাহলভি  © টিডিসি সম্পাদিত

বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি। তার  হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক দল বিএনপি। সেই দলের হয়ে মা খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এখন তাদের সন্তান তারেক রহমান ১৭ বছরের নির্বাসন থেকে ফিরে দুই মাসের মাথায় নির্বাচনে বিপুল জয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। 

২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে যেতে হয়েছিল তারেক রহমানকে। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য তিনি দেশ ছাড়েন। ওই বছর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে হেরে যায় বিএনপি। এর পরের ১৭ বছর ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়। নেতাকর্মীরা মার খেয়েছে, ‘গুম’ হয়েছে; খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে হয়েছে। লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে থেকে সেসব মোকাবিলা করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। 

তারেক রহমানের সঙ্গে ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির জীবনের রয়েছে পরতে পরতে মিল। গত ৪৭ বছর ধরে পরিবার নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে তারেক রহমানের কায়দায় সাবেক পারস্য দেশে ফিরে হারানো রাজ-গদি সামলানোর প্রবল ইচ্ছা আছে তার। সম্প্রতি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে বকলমে সে কথা জানিয়েছেন দেশত্যাগী তেহরানের রাজপুত্র। তাঁর মুখে শোনা গিয়েছে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ কথা।

নির্বাসিত ইরানি যুবরাজের বাবা মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ছিলেন পারস্য দেশের শেষ রাজা। ১৯৬৭ সালের ২৫ অক্টোবর রাজ্যাভিষেক হয় তার। কুর্সিতে থাকাকালীন তেহরানে পশ্চিমি সংস্কৃতি আমদানি করে আমেরিকার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভির সময় ইরানি তরুণীদের কখনও পর্দার আড়ালে থাকতে হয়নি। বরং যথেষ্ট স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতে পারতেন তারা। যদিও এক দশকের মধ্যে রাতারাতি বদলে যায় পরিস্থিতি। 

মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভির রাজত্বের ১২ বছরের মাথায় (১৯৭৯ সালে) ইরানে ঘটে যায় ইসলামীয় বিপ্লব। এর নেতৃত্বে ছিলেন শিয়া ধর্মগুরু রুহুল্লাহ মুসাভি খোমিনি। তেহরানে একটি মুসলিম প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন তিনি। ফলে ২,৫০০ বছরের প্রাচীন রাজশাহির বিলুপ্তি ঘটে। সেই জায়গায় দেশ শাসনের ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয় পার্লামেন্টের হাতে। আর সর্বোচ্চ নেতা বা সুপ্রিম লিডারের পদ নিয়ে যাবতীয় আইনের ঊর্ধ্বে চলে যান খোমিনি। তেহরানে এখনও সেই ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

অন্যদিকে ইসলামীয় বিপ্লবের জেরে ক্ষমতাচ্যুত মহম্মদ রেজা শাহ পাহলভি পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। যুবরাজ রেজা পাহলভিকেও তখনই দেশ ছাড়তে হয়েছিল। তেহরানের পালাবদলকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি ওয়াশিংটন। ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে একের পর এক মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে সাবেক পারস্য দেশ। এই পরিস্থিতিতে পাল্টা ওয়াশিংটনের রক্তচাপ বাড়াতে পরমাণু হাতিয়ার নির্মাণে মরিয়া হয়ে ওঠে ইরান। দেশ ছাড়ার মাত্র এক বছরের মাথায় মিশরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পারস্যের শেষ রাজা। সালটা ছিল ১৯৮০।

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরই পশ্চিমি সংস্কৃতির বেড়াজাল ভাঙতে বেশ কিছু নিয়মকানুন চালু করেন শিয়া ধর্মগুরু খোমিনি। এর মধ্যে ছিল মহিলাদের বাধ্যতামূলক হিজাব ব্যবহার। গত শতাব্দীর ৮০-এর দশকে এ ব্যাপারে আরও কড়া আইন আনে তেহরান। তৈরি হয় নীতি-পুলিশ। রাস্তাঘাটে হিজাব না পরা কোনও মহিলাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখলেই তার ওপর চড়াও হওয়ার দায়িত্ব পায় ওই বাহিনী। ফলে হিজাব ইস্যুতে দানা বাঁধে বিক্ষোভ। ২১ শতকে বেশ কয়েক বার একে গণআন্দোলনের রূপ নিতে দেখা গিয়েছে। 

গত বছরের ডিসেম্বরে মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে পারস্য উপসাগরের শিয়া মুলুক। মার্কিন ডলারের নিরিখে অনেক নীচে নেমে যায় ইরানি টাকার দাম। ফলে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হন হাজার হাজার মানুষ। সেই আন্দোলন থামাতে কালঘাম ছুটে যায় তেহরানের। বিদ্রোহ দমন করতে ওই সময় বিদেশ থেকে বাহিনী ভাড়া করেন বর্তমান শিয়া ধর্মগুরু। বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতেও দ্বিধা করেনি তারা। 

ডিসেম্বরে ইরান জুড়ে গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়তেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটি থেকে একের পর এক বিবৃতি দেন যুবরাজ রেজা পাহলভি। আন্দোলনকারীদের রাস্তা না ছাড়ার কথা বলতে শোনা যায় তাকে। ওই সময় রাজশাহি ফেরানোর দাবিতে সোচ্চার হন বিক্ষুব্ধদের একাংশ। চলতি বছরের গোড়ায় পারস্য উপসাগরে একাধিক রণতরী পাঠিয়ে তেহরানকে ঘিরে ফেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিয়া মুলুকটির সামরিক বাহিনী পরমাণু শক্তি অর্জন করুক, কোনও ভাবেই চাইছেন না তিনি।

এই পরিস্থিতিতে তারেকের মতো নির্বাসন কাটিয়ে ইরানে ফিরতে চাইছেন যুবরাজ রেজা পাহলভি। বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, তেহরানে তার পা পড়লেই কট্টরপন্থীদের শাসনের অবসান ঘটবে। এমনকি দেশ ছেড়ে পালাতে হতে পারে শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খোমেনি। যদিও এর উল্টো মতও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, সাবেক পারস্য দেশ ও ঢাকার গণআন্দোলন কখনোই সরলরেখায় চলেনি। 

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন ঘটে আওয়ামী সরকারের। এরপর বাংলাদেশে তৈরি হয় একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর প্রধান উপদেষ্টা হন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জুলাই  আন্দোলন হত্যা মামলায় শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। 

বিশেষজ্ঞদের দাবি, নিষিদ্ধ হওয়ার জেরে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামি লিগ। ফলে তাদের ভোটব্যাঙ্কের পুরোটাই চলে গিয়েছে বিএনপির দিকে। একই ছবি ইরানের ক্ষেত্রে দেখা না-ও যেতে পারে। কারণ, যুবরাজ রেজা সাবেক পারস্য দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফেরাতে চাইছেন, এমনটা নয়। তার মূল লক্ষ্য হল রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

দ্বিতীয়ত, নির্বাসনে যাওয়ার আগে পুরোদস্তুর রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তারেক জিয়া। এমনকি লন্ডনে থাকাকালীনও দলের রাশ ছিল তারই হাতে। অন্যদিকে যুবরাজ রেজা যখন ইরান ছাড়েন তখন তিনি ১৬-১৭ বছরের কিশোর। সাবেক পারস্য দেশটির ঘরোয়া রাজনীতি সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণা নেই তার। সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে তিনি যে মারাত্মক রকমের জনপ্রিয়, তাও হলফ করে বলা সম্ভব নয়। 

তৃতীয়ত, হাসিনার কায়দায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খোমেনি সরকারের পতন ঘটানো একেবারেই সহজ নয়। কারণ, ওই শিয়া ধর্মগুরুর হাতে রয়েছে ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি নামের একটি আধা সেনাবাহিনী। একে পারস্যের সরকারি ফৌজের তুলনায় বেশি শক্তিশালী বলা যেতে পারে। তেহরানের যাবতীয় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটের বহর নিয়ন্ত্রণ করেন আইআরজিসির কমান্ডারেরা। 

তা ছাড়া নির্বাসনে থাকাকালীন কোনও দিনই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সরকারের হাতের পুতুলে পরিণত হননি তারেক। বরং বিদেশ থেকে বিএনপির হয়ে প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন তিনি। যুবরাজ রেজার ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। ওয়াশিংটনের কথাতেই উঠতে-বসতে হচ্ছে তাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প না চাইলে তার পক্ষে ইরানে ফিরে ফের রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটানো একরকম অসম্ভব, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, অনেকেই নির্বাসন থেকে ফিরে সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে গিয়েছেন। উদাহরণ হিসাবে সাউথ আফ্রিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার কথা বলা যেতে পারে। বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ২৭ বছর জেলে থাকতে হয়েছিল তাকে। তা ছাড়া নির্বাসন থেকে ফিরেই সিংহাসনে চড়ে বসার তালিকায় নাম আছে কিংবদন্তি ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টেরও।

১৮১৪ সালে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত হন নেপোলিয়ন। ঠিক তার পরের বছরই সেখান থেকে ফ্রান্সে ফিরে আসেন তিনি। ১৮১৫ সালের ২০ মার্চ প্যারিসে পা পড়ে বোনাপার্টের। সবাই সাদরে তাকে গ্রহণ করে নেন। ফলে একরকম বিনা বাধাতেই ফের সম্রাটের মুকুট ফিরে পান তিনি। এর পর অবশ্য আর মাত্র ১০০ দিন দেশ শাসন করতে পেরেছিলেন নেপোলিয়ন। ওয়াটারলুর যুদ্ধে হেরে গিয়ে ফের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে যেতে হয় তাকে।  

সূত্র: আনন্দবাজার