১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৪৮

ভোটের দিন ৭% কেন্দ্রে পর্যবেক্ষক প্রবেশে বাধা, হুমকির মুখে ফিরে গেছে ৬ শতাংশ ভোটার: ভয়েস নেটওয়ার্ক

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠান  © সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন অন্তত ৭ শতাংশ কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা পেয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। ভোটগ্রহণের আগে-পরে নানা অনিয়ম দেখেছেন তারা। বলছেন, ভোটগ্রহণের দিন হুমকি ও বাধার সম্মুখীন হয়ে ৫.৮ শতাংশ ভোটার ফিরে গেছিলেন। এছাড়া এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০টি জেলায় ৭০টি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কয়েকটি নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম ভয়েস নেটওয়ার্ক এসব তথ্য জানিয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটি বলছে, কয়েকটি নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থার সম্মিলিতভাবে ভয়েস নেটওয়ার্কের এ প্রতিবেদন তৈরিতে কাজ করে। তারা সম্মিলিতভাবে ১০৬৯ জন স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সর্বমোট ১৫০টি আসনের ৩৫৪১টি কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করে। এর মধ্যে ১০০৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা অবধি পর্যবেক্ষণ করেছে। এসব কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে ভয়েস নেটওয়ার্কের নির্বাহী কমিটির সভাপতি ও ইমপ্যাক্ট ইনিশিয়েটিভের সিইও এনায়েত হোসেন জাকারিয়া ও ভয়েস নেটওয়ার্কের রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর বুরহান উদ্দীন প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে তারা বলেন, প্রায় ৭ শতাংশ কেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে ও পর্যবেক্ষণ কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় আইডি কার্ড ও অনুমোদন সরবরাহ করতে যথেষ্ট বিলম্ব হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে পর্যবেক্ষণ কাজকে বিঘ্নিত করেছে। 

তারা বলেন, প্রায় ৭ শতাংশ ভোটকেন্দ্র বাইরে থেকে সনাক্ত করার মত অবস্থায় ছিল না। অর্থাৎ জীর্ণশীর্ণ স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় ১১ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে প্রবীণ, অসুস্থ ও শারিরিকভাবে সক্ষম নয় এমন ভোটারদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা ছিল না। গর্ভবতী নারীর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা ছিলনা প্রায় ২০ শতাংশ কেন্দ্রে। এছাড়া প্রায় ১১ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি পর্যাপ্ত ছিল না, ফলে অনিরাপদ পরিস্থিতিতে কোনো তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ার আয়োজন ছিল না বলে তথ্য পাওয়া গেছে। নিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে প্রায় ১৫.৫ শতাংশ নিরপেক্ষতা বজায় না রেখে পক্ষ নিয়েছেন বা হস্তক্ষেপ করেছে বলে পর্যবেক্ষণ করা গেছে।

প্রতিবেদন বলছে, পর্যবেক্ষণকৃত কেন্দ্র সমূহের প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে অনুমোদিত নয় এমন ব্যক্তিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা সামগ্রিক নির্বাচন পরিবেশের জন্য একটি বড় অসঙ্গতি বলে ‍দৃশ্যমান হয়েছে। 

ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪ শতাংশ কেন্দ্রে যেকোনো একটি পক্ষের পেলিং এজেন্ট ছিল না বলে পর্যবেক্ষণের সময় দেখা গেছে। ঢাকা-৮ আসনের একাধিক কেন্দ্রে এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কুমিল্লা-১০ আসনের নাঙ্গলকোট পেরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের কেন্দ্রে পক্ষের এজেন্টকে বুথ থেকে উঠিয়ে নিয়ে পেটানোর তথ্য এসেছে। এছাড়া ভোলা-২, ভোলা ৪, ঢাকা ৪, গাজীপুর ৩, বাগেরহাট-৪, ফরিদপুর-২, নরসিংদী-৩, চট্টগ্রাম-১২, নোয়াখালী ৬, লক্ষীপুর-৩, সিরাজগঞ্জ-২, লক্ষীপুর ২ ইত্যাদি আসনে এরূপ ব্যত্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যালট ছিনতাই ও চুরির মত ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে।

তারা বলেন, আমরা গণমাধ্যমেও দেখেছি যে, শেরপুর-১ আসনে প্রায় শতাধিক ব্যালট সিলমারা অবস্থা উদ্ধারও হয়েছে। আর প্রায় ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, ভোটারদের পরিচয় যাচাই যথাযথভাবে না করেই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভোটাররা পরবর্তীতে অভিযোগ করেছেন, তাদের ভোট দেওয়া হয়েছে গেছে। এছাড়া ৪ শতাংশ কেন্দ্রে জালভোট দেওয়া হয়েছে বলেও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। সিরাজগঞ্জ-১, রাজবাড়ি-২, ঢাকা-৫ আসনে আমরা ভোটারের ভোট অন্য কেউ দিয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ৫.৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার ভোটকেন্দ্রে এসে হুমকি বা ভীতির শিকার হয়ে ভোট দিতে না পেরে ফিরে গেছেন বলে পর্যবেক্ষিত হয়েছে।  

তবে এসব ব্যত্যয় সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে ভোটারদের উপস্থিতি, ভোটপ্রদানের ক্ষেত্রে উচ্ছাস ও সামগ্রিক ভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন বিবেচনায় নির্বাচন ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক ও শান্তিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা যায়। 

ভোট গণনা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ভোট গণনা এবং ফলাফল টেবুলেশন পর্যবেক্ষণের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা লক্ষ্য করা গেছে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং আস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। 

প্রথমত, প্রক্রিয়াগত অস্পষ্টতা ছিল একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। কিছু কেন্দ্রের গণনা প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট নিয়মাবলী এবং নির্দেশনার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এতে কর্মকর্তারা কখন কোন ধাপ সম্পন্ন করবেন এবং কোনভাবে ফলাফল নথিভুক্ত করবেন তা স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে গণনার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেরি বা দ্ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, যাচাই ব্যবস্থার ঘাটতিও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যালট পেপারের মিল এবং ব্যালটের বৈধতা যাচাইয়ে পর্যবেক্ষকরা কয়েকটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত তথ্য বা স্বচ্ছতা পাননি। তৃতীয়ত, তথ্য সমন্বয়ে বিলম্ব লক্ষ্য করা গেছে। কিছু কেন্দ্রের ক্ষেত্রে নির্বাচনী তথ্য, গণনা ফলাফল ও টেবুলেশন রিপোর্ট এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ফলাফল নথিভুক্তি ও প্রকাশ প্রক্রিয়া ধীর হয়েছে, যা সমগ্র নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও দ্রুততার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

চতুর্থত, পর্যবেক্ষকের প্রবেশাধিকারে সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করা গেছে। কিছু কেন্দ্রে পর্যবেক্ষকরা গণনার প্রতিটি ধাপে প্রবেশ করতে পারেননি, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ও আঞ্চলিক এলাকাগুলোতে। সার্বিকভাবে, ভোট গণনা ও টেবুলেশন পর্যবেক্ষণে এই সমস্যাগুলো দেখিয়েছে যে যদিও ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ছিল, তবুও ফলাফল প্রকাশ ও যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি বিদ্যমান। এগুলো যথাযথভাবে সমাধান না করলে সমগ্র নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও জনগণের আস্থা প্রভাবিত হতে পারে। 

পর্যবেক্ষণে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ কভারেজ সীমিত ছিল, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনগণের তথ্যাধিকারকে প্রভাবিত করেছে। কিছু সংবাদমাধ্যম পক্ষপাতমূলক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এবং নির্বাচনী দলের বা প্রার্থীর পক্ষে-বিপক্ষে ভুল তথ্য বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। গণমাধ্যমের এই ধরনের দায়িত্বশীলতার অভাব নির্বাচনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এটি ভোটার সচেতনতা কমিয়ে, ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আস্থা হ্রাস করতে পারে। স্বচ্ছ এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন না থাকলে ভোটাররা তথ্যের উপর নির্ভরশীলতা হারায় এবং প্রার্থীদের মধ্যে পক্ষপাতমূলক ধারণা তৈরি হতে পারে।

নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা প্রসঙ্গে ভঅয়েস নেটওয়ার্ক বলছে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই দেশের প্রায় সকল বিভাগে সহিংসতা, হামলা, বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাংপুর ও লুটপাট শুরু হয়। এ পর্যন্ত আমাদের পর্যবেক্ষকরা প্রায় ৪০টি জেলায় অন্তত ৭০টি সহিংসতার তথ্য রিপোর্ট করেছেন। এর মধ্যে বাগেরহাট ও মুন্সিগঞ্জে দুজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। নোয়াখালীতে নির্দিষ্ট দলের প্রতীকে ভোট দেওয়ার কারণে একজন নারীর ওপর যৌন নিপীড়ণ করা হয়েছে বলেও গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। এছাড়া দিনাজপুর, নাটোর, পঞ্চগড়, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, মাগুরা, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, পাবনা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, হবিগঞ্জে সহিংসতার তথ্য রয়েছে। সারাদেশে এহেন সহিংসতার দৃশ্য নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার যে আশাবাদ, তাকে ম্লাণ করছে।  

প্রেস ব্রিফিংয়ে আয়োজকরা বলেন, সামগ্রিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেশের অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য বলে ধরা যায়। তবে নির্বাচনের পরপরই দেশের প্রায় সকল বিভাগে যেভাবে সহিংসতা শুরু হয়েছে, তা সুষ্ঠু নির্বাচনের সাফল্যকে ম্লান করছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তীকালীণ সরকার, আশু দায়িত্বগ্রহণেচ্ছু বিজয়ী রাজনৈতিক দলসহ সকল স্টেকহোল্ডারের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। 

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জসিম উদ্দীন। সভার সঞ্চালনা করেন ভয়েস নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি একরামুল হক সায়েম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির সিইও ইজাজুল ইসলাম ও বাকেরগঞ্জ ফোরামের এক্সিকিউভ ডাইরেক্টর শাহ আলম হাওলাদার প্রমুখ।