১৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান, কাঙ্ক্ষিত ভোট আজ
১৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট—ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোট। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের রায়ের ওপর নির্ভর করবে কারা জাতীয় সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং কোন রাজনৈতিক দল বা জোট সরকার গঠন করবে।
একই সঙ্গে গণভোটের ফল ইতিবাচক হলে সংবিধান সংশোধন বাধ্যতামূলক হবে কি না, নাকি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা জোটের প্রতিশ্রুতির ওপর বিষয়টি নির্ভর করবে—সেটিও নির্ধারিত হবে আজকের ভোটে। নিবন্ধিত ৫০টি দল নির্বাচনে অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যেই প্রধান লড়াই।
দুটি ভোট একসঙ্গে হওয়ায় সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পরও যেসব ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত থাকবেন, তাদের ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ফল ঘোষণা বিলম্বিত হওয়ার কারণ নেই; আশা করা হচ্ছে শুক্রবার সকালের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা যাবে।
দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে আজ ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এসব আসনে কেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৬৫১টি এবং মোট ভোটার ১২ কোটি ৭২ লাখ ৯৮ হাজার ৪১৬ জন। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন বাতিল করা হয়েছে। ওই আসনে কেন্দ্র ১২৮টি এবং ভোটার চার লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। সেখানে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে। ফলে শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এলাকার ভোটাররা সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে অংশ নিতে নাও পারেন।
গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ভোটদান শুধু নাগরিক অধিকার নয়, দায়িত্বও। আশা করি সবাই সচেতনভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন।’ তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার অনুরোধ করেন।
এর আগে ঢাকায় বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সিইসি জানান, নির্বাচন ‘অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য’ করতে কমিশন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ৪৫টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রয়েছেন ৩৩০ জনের বেশি, যার মধ্যে প্রায় ২২০ জন ইউরোপীয় ইউনিয়নের। বিদেশি সাংবাদিক ১৬০ জনের বেশি। দেশের অভ্যন্তরে ৮১টি সংস্থার ৪৫ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক এবং ৬০ হাজারের বেশি সাংবাদিককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের গোপনীয়তা বজায় রেখে গণমাধ্যমকর্মীদের কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ থাকবে এবং নির্বাচন শেষে পর্যবেক্ষকরা তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করতে পারবেন।
গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার বঞ্চনার অভিযোগ ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থাকলেও সমান সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, ব্যাপক কারচুপি ও অস্বাভাবিক ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হয়। ওই বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই এবার ভোট হচ্ছে।
নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ ১০টি দল এবার অংশ নিচ্ছে না। অন্য যে দলগুলো অংশ নিচ্ছে না সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা, জাসদ, তরীকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএফ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী ভোটারদের জন্য পাঠানো সাত লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালটের মধ্যে পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ২১৪ জন ভোট দিয়েছেন। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত দেশে এসে পৌঁছেছে চার লাখ ৯১ হাজার ৬১৫টি ব্যালট, যার মধ্যে চার লাখ ৬৬ হাজার ২৪৩টি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া দেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কারাগারে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছয় লাখ ২৬ হাজার ১৪৯ জন ভোট দিয়েছেন। সব মিলিয়ে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১১ লাখ ৫৭ হাজার ৩৬৩ জন ভোটার ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন।
এবারের ভোটার তালিকা অনুযায়ী ৩০০ আসনের মধ্যে ৭৮টি আসনে নারী ভোটার পুরুষের চেয়ে বেশি। উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি আসনে এই চিত্র দেখা গেছে। তবে সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো আসনে নারী ভোটার পুরুষের চেয়ে বেশি নয়। কক্সবাজার-৩ আসনে পুরুষ ভোটার সবচেয়ে বেশি—দুই লাখ ৯১ হাজার ৯৯ জন; সেখানে নারী ভোটার দুই লাখ ৫৪ হাজার ৮৬২ জন।