জেলায় জেলায় নির্বাচনী প্রচারণায় আমির, ১৮ দিনে ঘুরে দাঁড়িয়েছে জামায়াত
নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী প্রচারণার মাধ্যমে সাড়া ফেলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ১৮ দিনে আটটি বিভাগের ৪৩টি জেলায় নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন জামায়াতের দলীয় প্রধান। এ সময় বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক বড় জনসভাসহ বেশকিছু পথসভায়ও বক্তব্য রাখেন তিনি। ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের পক্ষ থেকে আয়োজিত জনসভা-পথসভাগুলোতে আগামী নির্বাচন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন জামায়াত আমির।
এসব জনসভা ঘিরে ঢাকা থেকে পর্যায়ক্রমে সাত হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ ঘুরেছেন ডা. শফিকুর রহমান। সময়কে সর্বোচ্চ পরিমাণ কাজে লাগাতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ পথ হেলিকপ্টারে এবং বাকিটা সড়ক পথে পাড়ি দিয়েছেন তিনি। ১৮ দিনের এই প্রচারণায় সারাদেশে জামায়াতের পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার দেখা গেছে। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, নোয়াখালী কুমিল্লা ও চট্রগ্রামসহ বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এসব জনসভায় নারীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীর মানুষেরাও অংশ নেন জামায়াতের জনসভায়।
দেশব্যাপী সফরের সময় তিনি ভুলে যাননি নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালাতে। প্রচারণার প্রথম দিন মিরপুরে জনসভায় অংশ নেন জামায়াত আমির, একই ধারাবাহিকায় জেলায় জেলায় সফরের ফাঁকে নিজ আসনের মানুষের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে গণসংযোগ, জনসভা, পথসভা ইত্যাদি কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। প্রচারণার শেষ দিন সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) নিজ এলাকায় গণমিছিল করেন ডা. শফিকুর রহমান, এতে অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। হার্টের চিকিৎসায় বড় ধরনের অপারেশনের মাত্র ৬ মাসের মাথায় ৬৭ বছর বয়সি এই নেতার দেশ গড়তে অক্লান্ত পরিশ্রমের বিষয়টি আকৃষ্ট করেছে ভোটারদের।
নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমির মূলত কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়, ঘরে বাইরে ও কর্মস্থলে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত, তরুণ ও যুবকদের দক্ষ করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ক্ষেত্রে আমল পরিবর্তন, সুশাসন নিশ্চিত, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত অন্যতম। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে দেশের পরিবর্তনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, এই নির্বাচনে জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সংস্কারের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-কে বিজয়ী করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত, ন্যায়-ইনসাফের একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সৎ ও যোগ্য হিসেবে জামায়াত প্রার্থীদের দাঁড়িপাল্লায় এবং ১১ দলীয় অন্য শরিকদের মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এসব নির্বাচনি জনসভা ঘিরে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও এলাকার সাধারণ ভোটারদের মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। জামায়াত ও ১১ দলীয় প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করে দেশ পরিচালনার সুযোগ দিলে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান।
আরও পড়ুন : চাদর মুড়ি দিয়ে জামায়াত আমিরের নির্বাচনি বুথে আগুন, ধরা পড়ল সিসি ফুটেজে
নির্বাচনে প্রচারণায় নেমে বিভিন্ন জায়গায় বাধার মুখে পড়েন জামায়াতের নারী কর্মীরা। গত ২২ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের অন্তত ৪৬টি উপজেলায় জামায়াতের নারী কর্মীরা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ জামায়াতের। দলটি বলছে, জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা দেওয়ার পাশাপাশি অন্ত:স্বত্ত্বা নারীর পেটে লাথি থেকে শুরু করে চড়-থাপ্পড়, গালিগালাজ, কান ছিঁড়ে দেওয়া, গায়ের কাপড় ও হিজাব খুলে নেয়া, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণেরও হুমকি দিয়েছে বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। এর বাইরে নির্বাচনের প্রচারে যাওয়ার নারী কর্মীদের উদ্দেশ্য করে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবকদলসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জামায়াতের নারী কর্মীদের প্রকাশ্যে যৌন হুমকি দেওয়াসহ নিয়মিত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তবে দলের নেতা-কর্মীদের অব্যাহত এমন নারী নিপীড়নের ঘটনায় একেবারে নিশ্চুপ বিএনপি।
নারীদের ওপর হামলা, হেনস্তা ও হুমকির বিষয়ে জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রচারণা শুরুর পর থেকে আমাদের অসংখ্য নারী কর্মীদের উপর হামলা, হুমকি ও হেনস্তা কর হয়েছে। দেশের অন্তত ৪৬টি উপজেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সর্বশেষ পটুয়াখালির বাউফলে আমাদের একজন গর্ভবতী নারী কর্মীর উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যে গত ৩ ফেব্রুয়ারি হ্যাক হয় জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট। পরে ওই আইডি থেকে একটি নারী বিদ্বেষী পোস্ট করা হয়। পরেরদিন বিষয়টি নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। জামায়াতের পক্ষ থেকে একাধিকবার তথ্য প্রমাণসহ দেখানো হয় কীভাবে দলীয় প্রধানের আইডি হ্যাক হয়েছে। তথ্য প্রমাণ থাকার পরই ছাত্রদলের আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন এই আন্দোলন বিএনপির নিজেদের জন্যই নেতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় জামায়াতের নারী সদস্য নুশরাত জাহান রিমা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের দল বা আমির কখনো নারী বিদ্বেষী নন, উনার স্ত্রী ও মেয়ে কর্মজীবী, সবগুলো বক্তব্যে তিনি নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতের কথা বলেছেন। এরপরও এমন অপপ্রচার চালানো রাজনৈতিক দেউলিয়াপানা ছাড়া কিছুই না। এই ইস্যুতে ছাত্রদলের আন্দোলন ও বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য মূলত তাদের নিজেদের জন্যই নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সারাদেশে নারী কর্মীদের হেনস্তার পর বিভিন্ন জেলা উপজেলায় নারী মিছিল করেছেন জামায়াতের নারী কর্মীরা। এসব মিছিলে হাজার হাজার নারীদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। হিজাব নন হিজাবের সমন্বিত এই মিছিল সাধারণ নারীদের মধ্যেও জামায়াত নিয়ে নতুন করে ইতিবাচক বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
সবমিলিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমির চমক দেখিয়েছেন বলে মনে করছেন জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় থাকা ১১ দলের নেতাকর্মীরা। ডা. শফিকুর রহমানের সফরসঙ্গী ও ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, জামায়াত আমিরের সফর অত্যন্ত চমৎকার হয়েছে। তিনি এই বয়সেও একজন যুবকের মতো সারাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমি অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়লেও তিনি ছিলেন অক্লান্ত। তার প্রতিটি জনসভায় গণজোয়ার দেখা গেছে। সবাই তাকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন।