০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২০

বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, পিছিয়ে নেই জামায়াত

বিএনপির প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন, জামায়াতে আলী আছগার ও স্বতন্ত্র আনোয়ারুল ইসলাম  © সংগৃহীত

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলনবিল বিধৌত কৃষি, মৎস্য ভান্ডারখ্যাত এবং দুধ, ডিম, ঘি প্রসিদ্ধ পাবনা-৩ আসনে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। নাওয়া-খাওয়া ভুলে ভোটারদের মন জয় করতে ছুটছেন প্রার্থীরা। চা-স্টল থেকে শুরু করে কৃষকের মাঠ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অফিসপাড়া, হাটবাজার পর্যন্ত চলছে নানা বিশ্লেষণ। কে জিতবে আর কে হারবে, সেই সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত সবাই।

চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৩ আসন। স্থানীয় বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংকট রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্তে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোধগার করে ভোট টানার চেষ্টা করছেন। বিএনপির ধানের শীষের প্রতিপক্ষ হয়েছে বিএনপির বহিস্কৃত নেতার ঘোড়া। আর নির্ভার রয়েছে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা। ফলে ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ অবস্থা বিরাজ করছে এই সংসদীয় আসনে। শেষ হাসি কে হাসবে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সাধারণ মানুষ। 

পাবনা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ প্রতিক)। তিনি সুজানগর উপজেলার বাসিন্দা। পাবনা-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে দল তাকে উন্নয়নের স্বার্থে পাবনা-৩ আসনে মনোনয়ন দিয়ে পাঠায়। তিনি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় আসলেই তৃণমূল পর্যায়ে নানা অসন্তোষ দেখা দেয়। বিএনপির একটি পক্ষ সাবেক এমপি ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কেএম আনোয়ারুল ইসলাম এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, সাবেক সদস্যসচিব হাসাদুল ইসলাম হীরার নেতৃত্বে তুহিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নামেন। স্থানীয় প্রার্থীর দাবি তুলে শুরু হয় মশালমিছিলসহ নানা আন্দোলন-সংগ্রাম চালায়।

যখন তুহিনের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়। তখন দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক এমপি আলহাজ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হন (ঘোড়া প্রতীক)। তার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব  হাসাদুল ইসলাম হীরা, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম তাইজুলসহ বিএনপির অন্য নেতারা।

এদিকে উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব ফারুক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক তানভির জুয়েল লিখন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান লেবু দলীয় প্রার্থী তুহিনের পক্ষে ধানের শীষের ভোট প্রার্থনা শুরু করেন। তবে অভ্যন্তরীণ কারণে আবার তারা গত ২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে দল আনোয়ারুল ইসলাম, হাসাদুল ইসলাম হীরা, তাইজুল, লিখন, ফারুক, লেবু, আরিফকে বহিস্কার করে বিএনপি। অন্যদিকে উপজেলা, পৌর বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের সিংহভাগ নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের পক্ষে কাজ করছেন।

চাটমোহর উপজেলায় এমপি নেই গত দুই যুগ। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন চাটমোহরের মানুষ। নিজেদের উপজেলার এমপি বানাতে তাই অনেকে একাট্টা। তারা চাইছেন ‘চাটমোহর ইজম’ কাজে লাগিয়ে স্থানীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কে এম আনোয়ারুল ইসলামের (ঘোড়া) জিতবে। এ ছাড়া আরেকটি সমীকরণ রয়েছে, তিন উপজেলার মধ্যে চাটমোহরে ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই উপজেলায় ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন। ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর দুই উপজেলা মিলিয়ে ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৩০২ জন। সেই হিসেবে দুই উপজেলার ভোটারের চেয়ে চাটমোহর উপজেলায় ৩৪ হাজার ১৯৮ ভোট বেশি। তাই চাটমোহরের এই ৩৪ হাজার ভোট যে বেশি পাবেন তিনি বিজয়ী হতে পারেন। 

সে ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রার্থী হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম এগিয়ে আছেন। এ ছাড়া আনোয়ারুল ইসলামের নিজস্ব কিছু ভোট ব্যাংক রয়েছে, হিন্দুদের একটি বড় অংশের ভোটও তিনি পাবেন। পাশাপাশি আওয়ামী সমর্থকদের একটি ভালো ভোট তিনি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অপর দিকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ) চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুরে দলের প্রার্থী হিসেবে বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন। দলীয় নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা বিরতিহীনভাবে চলনবিলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নানা উন্নয়ন আর ওয়াদা দিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। প্রচারণার প্রথম দিকে দলে বিভক্তি প্রকট থাকলেও শেষ মুহূর্তে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী সংগঠিত হয়েছে। তারা তাদের দলের প্রার্থী তুহিনকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। হাসান জাফির তুহিন নির্বাচিত হলে চলনবিল নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থী ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা আলী আছগার তাদের দলে অভ্যন্তরীণ কোনো সংকট না থাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মী বাহিনী, নারী সদস্যরা দিনরাত ভোট প্রার্থণায় দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্ভার রয়েছে জামায়াতের প্রার্থী। বিগত নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের ভোটের সংখ্যা কম থাকলেও এই নির্বাচনে জামায়াতের ভোট অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেন জামায়াতের স্থানীয় একাধিক নেতা। সে ক্ষেত্রে পাবনা-৩ আসনে ভোটের লড়াই ত্রিমুখীও হতে পারে বলে ধারণা মিলেছে। বিএনপি ও বিদ্রোহী প্রার্থীর দ্বন্দ্বে ভোট ভাগ গয়ে যাবে এবং সেই ফাঁক গলিয়ে জামায়াত প্রার্থী জিতে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই বলেও আভাস পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাবনা-৩ আসনে জয়ের ব্যাপারে মূল ফ্যাক্টর হবে ফরিদপুরের ভোট। কারণ চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়ায় শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও ফরিদপুরের কোনো প্রার্থী নেই। এই কারণে ফরিদপুরে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন তারই জয়লাভ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
 
পাবনা-৩ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন গণ অধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল খালেক (হাতপাখা), গণ ফোরামের সরদার আশা পারভেজ (উদিয়মান সুর্য্য), জাতীয় পার্টির মীর নাদিম ডাবলু (লাঙ্গল), সুপ্রিম পার্টির মাহবুবুর রহমান জয় (একতারা)।

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮০২ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৭ হাজার ৭১১। ফরিদপুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯১ জন।

উল্লেখ্য, চাটমোহর থেকে সর্বশেষ ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। তারপর বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে মকবুল হোসেন বিজয়ী হন।