০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫১

অনিষ্টের ভয়ে ৫৬ বছর ভোট দেন না এই উপজেলার নারীরা

নির্বাচনে নারীর ভোটাধিকার  © সংগৃহীত

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে গত ৫৬ বছর ধরে কোনো নারী ভোটকেন্দ্রে যান না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙতে প্রশাসন ও প্রার্থীরা ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন। মূলত অনিষ্টের ভয় আর সামাজিক রীতির কারণে এই ইউনিয়নের ১০ হাজার ২৯৯ জন নারী ভোটার তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত থাকছেন। অন্যান্য সব সামাজিক কাজে অংশ নিলেও তারা কেবল ভোটের দিন কেন্দ্রে যাওয়া থেকে দূরে থাকেন।

জনশ্রুতি আছে, ১৯৬৯ সালে ভারতের জয়নপুর থেকে আসা পীর মওদুদ হাসান জয়নপুরী (রহ.) তৎকালীন কলেরা মহামারির সময় নারীদের পর্দা রক্ষা ও ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যদিও এই তথ্যের কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে বছরের পর বছর ধরে এটি এলাকার একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত পারিবারিক চাপ এবং পীরের কথা অমান্য করলে কোনো অমঙ্গল হতে পারে—এমন ভয় থেকেই তারা ভোট দিতে যান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী ভোটার বলেন, 'ওই পীরের আদেশ অমান্য করলে যদি কোনো অনিষ্ট হয়, সেই ভয়েই অনেকে নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না।'

নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্থানীয় নির্বাচনের সংরক্ষিত নারী সদস্য বা উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানরাও এখানকার নারীদের ভোট ছাড়াই কেবল পুরুষদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেক নারী ভোট দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। সংরক্ষিত সদস্য হাজেরা বেগম এ প্রসঙ্গে বলেন, 'সময় বদলেছে। এখন নারীরা আগের চেয়ে সচেতন। অনেক নারী ভোট দেওয়ার কথা বলছেন। আমিও চাই, নারীরা অধিকার প্রয়োগ করুক।'

নারীদের এই ভীতি কাটাতে জেলা প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। গত বুধবার সাহেবগঞ্জ এলাকায় ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের নিয়ে আয়োজিত সভায় জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, 'ইসলামের দৃষ্টিতে পর্দা মেনে ভোট দেওয়া নিষিদ্ধ বা অপরাধ নয়।' তিনি ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দূর করে নারীদের কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক দলগুলোও এবার নারী ভোটারদের টানতে বিশেষভাবে কাজ করছে। চাঁদপুর-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মো. হারুনুর রশীদ বলেন, 'ভোট দেওয়া সাংবিধানিক অধিকার। নারীরা কেন্দ্রে এলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি, আস্থা তৈরির চেষ্টা করছি।'

একই সুর শোনা গেছে জামায়াত প্রার্থী বিল্লাল হোসেন মিয়াজীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, 'ইসলামে নারীদের ভোট দেওয়া নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ এমন কোনো কথা নেই। নারীদের কেন্দ্রে আনতে জামায়াত জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের নারী কর্মীরা এলাকায় ৮-১০টি উঠান বৈঠক করেছেন।'