চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পুলিশি হামলার মুখে জুলাই শহীদ ওমরের স্ত্রী
চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পুলিশি আক্রমণের মুখে পড়ে আহত হয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ইঞ্জিনিয়ার ওমর বিন নুরুল আবছারের স্ত্রী ফারজানা জাহান নীলা। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর শাহবাগে জাতিসংঘের অধীনে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার তদন্তের দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর পুলিশের হামলার সময় এই ঘটনা ঘটেছে। এতে শহীদ ওমরের স্ত্রী পায়ে আঘাত পান।
রাত এক ফেসবুক পোস্টে নিজেই বিষয়টি জানিয়েছেন শহীদ ওমরের স্ত্রী ফারজানা জাহান নীলা। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আজ বিকালে জব ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম শাহবাগে। ইন্টারভিউ চলাকালীন আম্মু ফোন করে বলল— শাহবাগে নাকি গোলাগুলি হচ্ছে। জাবের গুলি খাইছে, হাদি ভাইয়ের হত্যার বিচারের দাবিতে মানুষ জড়ো হয়েছে। সাবধানে থাকতে বলল। আমি তখনো পুরো পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিনি। ইন্টারভিউ শেষে বের হয়ে দেখি— শাহবাগে মানুষের ঢল। চারদিকে স্লোগান— আল্লাহু আকবার, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’
তিনি লিখেছেন, ‘দূরে যে বিকট শব্দগুলো শুনছিলাম, প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কিন্তু মুহূর্তেই বুঝলাম— ওগুলো টিয়ারশেলের শব্দ। হঠাৎ এক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। আমার পাশেই এক ছেলের মাথায় লাঠির আঘাতে রক্ত বের হতে দেখেছি।
মা, বোন, শিশু— সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিল। ভিড়ের চাপে আমার পা মচকে যায়। হাঁটতে পারছিলাম না, পা ফুলে গেছে, অসম্ভব ব্যথা।এর মধ্যে ভেতরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল—এমন প্যানিক অ্যাটাক হবে কখনো ভাবিনি।’
ফারজানা জাহান নীলা আরও লিখেছেন, ‘কোনোমতে আমি আর এক আপু একটি ফার্মেসিতে ঢুকে আশ্রয় নিই। ফার্মেসির আঙ্কেল ওষুধ দিলেন, একটু রিলাক্স হলাম। আমার চোখের সামনেই এক বোরকা পরা আপু পড়ে গেলেন। আরেক আপুর হাত কেটে রক্ত ঝরছিল। দোকানের শাটার নামিয়ে দেওয়া হলো, বাইরে তখনো টিয়ারশেল ছোড়া হচ্ছিল। ৫ আগস্টের পর আবার এমন পরিস্থিতি দেখব— কখনো ভাবিনি। Chief Adviser GOB ছি। মনে হচ্ছিল জুলাইকে আবার নতুন করে দেখছি।’
প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে আটকে ছিলেন জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি যে দোকানের ভিতর আটকা ছিলাম, ওই দোকানের সামনেই যেন পুলিশ টিয়ারশেল-বোমাগুলো মারতেছিল। পরে কয়েকটা ভাইয়া এসে কোনোমতে রিকশায় তুলে দেয়, বাসায় ফিরেছি। আজ সত্যিই মনে হচ্ছিল— আমি বুঝি আর বাঁচব না। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন জ্বলছে— এই দেশ ওমরকে কেড়ে নিয়েছে, আর কত মায়ের কোল খালি করবে— আল্লাহই জানেন। পা ফুলে গেছে এত ব্যথা করতেছে যে হাটতে পারতেছি না। হাদি, ওমর সহ সকল শহীদের হত্যার বিচার চাই।’
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে গত বছরের আগস্টে রাজধানীর উত্তরায় ওমর বিন নুরুল আবছার (২২) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি ঢাকায় বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ট্রেনিং সেন্টারের প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র ছিলেন। এ ঘটনায় ২১ আগস্ট ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের হয়। ওই সময় সুরতহাল, ময়নাতদন্ত অথবা স্থানীয় পুলিশকে অবগত না করে ওমরের মরদেহ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরিবারের লোকজন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আকুবদন্ডী গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে গত বছরের ২৫ জুন তার মরদেহ উত্তোলন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করা হয়।