০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:৫৯

বিএনপি-জামায়াতের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কোথায়

বিএনপি ও জামায়াত  © লোগো

মাত্র ৫ দিন পর অনুষ্ঠিত হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির জয় সহজ হতে পারে, এমন একটা ধারণা ছিল প্রথম দিকে। কিন্তু যত দিন গড়াচ্ছে, নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে দলটির সামনে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। এই দুই দলেই বাড়ছে অস্থিরতা-উত্তেজনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্বের কথায়ও প্রকাশ পাচ্ছে সেই অস্থিরতা। তারা জড়িয়ে পড়ছেন বাকযুদ্ধে; কখনো কখনো বিতর্কের জন্ম দিচ্ছেন।

ত্রয়োদশ এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়। বিএনপির চির প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দলটি মাঠে নেই। ফলে রাজনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয় বলে বিএনপিসহ বর্তমানে সক্রিয় দলগুলোর নেতাদেরই অনেকে মনে করেন।

তারা বলছেন, এই শূন্যতার মধ্যে বিএনপির পুরোনো মিত্র জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে; মেরুকরণ হয়েছে রাজনীতিতে।

জামায়াত ১১টি দল নিয়ে নির্বাচনী ঐক্য গঠন করে ভোটের মাঠে এখন বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। এই জোটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি রয়েছে। এছাড়া জোটের বেশিরভাগই ইসলামী দল।

জামায়াতসহ এসব ইসলামী দল বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র ছিল। এখন তাদেরই জোট ক্ষমতায় যাওয়ার টার্গেট নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে বিএনপির মুখোমুখি।

নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়ে নেমেছে জামায়াত জোট। বিএনপিরও শীর্ষ নেতা তারেক রহমান লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি এবার নির্বাচনে বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য শক্তির জায়গা হয়েছে। কিন্তু ভিন্ন রাজনৈতিক মেরুকরণে, ভিন্ন বাস্তবতায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে দলটির জন্য; অনেক ক্ষেত্রে দলটির দুর্বলতাও দৃশ্যমান হচ্ছে। জামায়াতের সামনেও আসছে অনেক চ্যালেঞ্জ। তাদেরও শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো প্রকাশ পাচ্ছে।

বিএনপির সাত চ্যালেঞ্জ
দলটির দুর্বলতা, চ্যালেঞ্জের জায়গা অনেক। তবে বিএনপির নেতা-কর্মীরা যে বিষয়গুলোকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন, সেখানে বড় সাতটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে: ১. দলের বিদ্রোহী প্রার্থী; ২. রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত ১৮ মাসে সারাদেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলের অভিযোগ; ৩. তরুণ ভোটারদের বিএনপির পক্ষে টানার ক্ষেত্রে প্রচারণায় ঘাটতি; ৪. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রচারণা থেকে পিছিয়ে থাকা; ৫. নারীদের মধ্যে তালিমের নামে জামায়াতের প্রচারণার মুখেও পিছিয়ে থাকা; ৬. প্রচারণায় প্রতিপক্ষের ধর্মের ব্যবহার; ৭. প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানের অস্পষ্টতার অভিযোগ।

আসলে কতটা চ্যালেঞ্জে বিএনপি
"দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় আমাদের আসনে নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এর প্রভাব ভোটারদের মধ্যেও পড়তে পারে। এটা আমাদের দলীয় প্রার্থীর জন্য বড় সংকট।" নেত্রকোনা-৩ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর প্রচারণায় যুক্ত থাকা স্থানীয় একজন নেতা এই বক্তব্য দিয়েছেন।

সংসদীয় যে ৭৯টি আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এবং বিএনপি থেকে বহিষ্কার হওয়ার পরও প্রার্থী হয়েছেন, এসব আসনেই নেত্রকোনা-৩ আসনের মতো একই চিত্র বলে দলটির নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন।

বিএনপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আসা তথ্য ও তাদের নিজস্ব জরিপ অনুযায়ী ৭৯টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ৪৬ জন শক্ত অবস্থানে আছেন।

বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাদের বিএনপি থেকে বহিষ্কার করার পরও তারা ভোটে রয়েছেন এবং বেশিরভাগ আসনেই তারাই দলীয় প্রার্থীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন।

বিএনপি শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা বলেছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এটিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা। বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়টি বিএনপির সাংগঠনিক বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যা সামলাতে পারেনি দলটি।

চাঁদাবাজি, দখলের অভিযোগ নিয়েও বিএনপির বিরুদ্ধে নেতিবাচক আলোচনা রয়েছে। এটিকে নির্বাচনি প্রচারণায় বিএনপির বিরুদ্ধে বড় ইস্যু হিসেবে সামনে আনছেন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর থেকে সারাদেশে একেবারে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত হাট-বাজারে, বাস টার্মিনাল-নৌঘাটে চাঁদাবাজি এবং জমি-বাড়ি, এমনকি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, দোকান দখলের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এর বেশিরভাগ অভিযোগই বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

যদিও বিএনপি প্রায় দশ হাজার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু থামানো যায়নি চাঁদাবাজি-দখল। লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দল থেকে বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে এর দায় এড়াতে পারেন না।

তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে চাঁদাবাজি-দখলের মতো অপরাধ করা থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন-এমন ধারণা ছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীও থামানো যায়নি। এখানে নেতৃত্বের দুর্বলতার বিষয় আলোচনায় আসছে।

যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, ওই দুটি বিষয় বিরোধীপক্ষ প্রচারণায় ব্যবহার করলেও তাদের ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু সন্দেহ রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

বিএনপির প্রচারণায় ঘাটতি
যদিও তারেক রহমান মাঠে দলের নির্বাচনী প্রচারণায় সশরীরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এরপরও প্রচারণায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপি পিছিয়ে রয়েছে বলে দলটির ভেতরে আলোচনা আছে।

নেত্রকোনা, বগুড়া, রংপুরসহ কয়েকটি জেলার বিএনপির তৃণমূলের কয়েকজন নেতা বলছিলেন, তরুণদের মাঝে প্রচারণায় বা যোগাযোগে দলের ঘাটতি আছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তরুণরা।

এবার নির্বাচনের ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ চার কোটির বেশি তরুণ ভোটার রয়েছেন। তাদের একটা বড় অংশ আওয়ামী লীগ আমলে দেড় দশকে বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। ফলে এবার ভোটের প্রতি তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন গতানুগতিক প্রচারে তাদের আকৃষ্ট করা যাবে না।

অবশ্য তরুণ ও নারী ভোটারদের সমর্থন পেতে তারেক রহমান তার মেয়ে জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরও বিএনপির প্রচারণায় দুর্বলতা বা ঘাটতির অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে।

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, "তরুণদের কানেক্ট করার ক্ষেত্রে বিএনপির ঘাটতি আছে। তরুণ ভোটের জন্য তাদের আরও চিন্তাশীল কিছু করা প্রয়োজন।"

আরেকটি বড় অংশ নারী ভোট। তাদের মাঝে বিএনপির প্রচারণা শুরু হয়েছে বিলম্বে। জামায়াতের নারী বিভাগের নেতা-কর্মীরা সারাদেশে বিভিন্ন এলাকা বা মহল্লায় নারীদের নিয়ে ধর্মীয় বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা বা বৈঠক করে আসছিলেন কয়েক বছর ধরে। সেটিকে 'তালিম' বলে পরিচিত করে আসছে জামায়াত।

এই তালিমের নামে অনেক আগে থেকেই নারী ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে জামায়াতের নারী কর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে ধর্মকে ব্যবহারের অভিযোগ করছে বিএনপি।

জামায়াতের তালিমের পাল্টা উঠান বৈঠক নাম দিয়ে নারীদের কাছে প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি। কিন্তু দলটির এই কৌশলে বিলম্ব হয়েছে অনেকটা সময়। সে কারণে নারী ভোটারের বড় অংশের কাছে বিএনপির প্রার্থীরা সরাসরি পৌঁছুতে পারবেন কিনা, এনিয়ে বিএনপি নেতাদের অনেকের সন্দেহ আছে।

ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমেও প্রচারণায় বিএনপির পিছিয়ে থাকার কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা। তারা মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমের একটা প্রভাব তৈরি হয়েছে সমাজে। কিন্তু এই মাধ্যমে বিএনপির তুলানায় জামায়াত অনেক এগিয়ে রয়েছে। বিএনপিকে ঘায়েল করতে জামায়াতের প্রচারণা পরিকল্পিত এবং সংগঠিতভাবে হচ্ছে। বিএনপিও জামায়াতের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে 'বট বাহিনী' ব্যবহারের অভিযোগ করছে।

এবার সামাজিক মাধ্যমে এবং মাঠের প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার বেশি হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন। তারা মনে করেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলোর শক্তি ও প্রভাব বেড়েছে। সেকারণে প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার বেশি চোখে পড়ছে।

'জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দিলে জান্নাতে যাবে' দলটির বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচারণা চালানোর অভিযোগও তুলেছে বিএনপি।

দলটির নেতারা বলছেন, "জান্নাতের টিকেট বিক্রি করাসহ ধর্মকে ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াত। ফলে বিএনপিকেও সতর্কভাবে অনেক সময় ধর্মের বিষয় আনতে হচ্ছে।"

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকবে। সেগুলো মোকাবিলা করেই তারা এগোচ্ছেন এবং ভোটারদের স্বতস্ফূর্ত সমর্থন পাচ্ছেন।

তবে দলটির অন্য একাধিক নেতার অভিযোগ হচ্ছে, "স্বতস্ফূর্ত জনসমর্থন না পেয়ে জামায়াত নানারকম মেকানিজমের দিকে নজর দিচ্ছে, সেটিই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।"

জামায়াতের চ্যালেঞ্জ
যদিও দলটির নেতা-কর্মীরা এমন একটা ধারণা তৈরি করছেন যে, ক্ষমতার প্রশ্নে এবারের ভোট জামায়াতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে এসেছে। কিন্তু তারপরও ভোটের মাঠে তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। ১. জামায়াতের পক্ষে স্বতস্ফূর্ত জনসমর্থনে ঘাটতি আছে; ২. ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন; ৩. নারী অধিকার প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থানে অস্পষ্টতার অভিযোগ; ৪. সরকার বা দেশ পরিচালানায় অভিজ্ঞতা নেই; ৫. প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি ও কাজের মিল থাকবে কি না-এ প্রশ্নে অনেকের সন্দেহ; ৬. ভূ-রাজনীতিতে দলটির অবস্থান কী হবে, সেই প্রশ্নে অস্পষ্টতার অভিযোগ।

জনসমর্থনে ঘাটতির অভিযোগ কেন
জামায়াত সংগঠিত দল এবং তাদের শক্তি বেড়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। ভোটের মাঠেও দলটির সংগঠিত ও পরিকল্পিত প্রচারণা সবার চোখে পড়ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় জামায়াত জমায়েত করছে এবং মাঠে ও সামাজিক মাধ্যমে দলটির নেতা-কর্মীরা সর্ব শক্তি দিয়ে নেমেছেন।

এমন তৎপরতার কারণে জামায়াত অন্যতম প্রধান দল বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এসেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু তারা বলছেন, বড় দল হিসেবে বিএনপির যেমন সারাদেশে বিস্তৃত সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন আছে। জামায়াত সংগঠিত হলেও বিস্তৃত স্বতস্ফূর্ত জনসমর্থনের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে।

এছাড়াও দেশের সব এলাকায় জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী বা বিস্তৃত নয়। ফলে ভোটে এই বিষয়টি জামায়াতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। যদিও অনেক ভোটারের কাছে জামায়াত একটি বিষয় পৌঁছিয়ে দিয়েছে যে, মানুষ আওয়ামী লীগ-বিএনপির শাসন দেখেছে। এবার তারা নতুন কাউকে দেখতে চায়।

তাদের এমন 'ন্যারেটিভ' বিএনপির জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলেও রাজনীতিকদের অনেকে মনে করেন। তবে বাংলাদেশে জামায়াতের রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা নেই- এই ইস্যুকে সামনে আনছে বিএনপি তাদের প্রচারণায়। বিএনপির এই প্রচারণাও জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

নারী অধিকার প্রশ্নেও জামায়াতের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। বিশেষ করে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জামায়াতের আমির একটি বক্তব্য এসেছে যে, নারীরা কখনো তাদের দলের আমির হতে বা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না।

এই বক্তব্য নিয়ে ভোটের মাঠে চলছে নানা বিতর্ক। যদিও দলটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের উদারনীতি নেওয়ার কথা বলছে, কিন্তু সমাজে এক ধরনের সন্দেহ কাজ করছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তারা বলছেন, উদারনীতির কথা বললেও ক্ষমতায় গেলে জামায়াত তা কতটা বাস্তবায়ন করবে বা ভোটের প্রতিশ্রুতি ও কাজের মিল কতটা থাকবে-এই সন্দেহটাই আসছে আলোচনায়। এ বিষয়টিও জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখনো ৭১
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল জামায়াত। সেই যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ৫৪ বছরেও জামায়াত কখনো অনুষ্ঠানিক ভুল স্বীকার বা দুঃখ প্রকাশ করেনি, ক্ষমা চায়নি।

ফলে এ নিয়ে এখনো জনগোষ্ঠীর বড় অংশের মধ্যে জামায়াতের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব আছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, অতীত তাদের নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তাদের দলের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ভোটারদের আকৃষ্ট করছে।

তবে একাত্তর ইস্যু এবারের ভোটেও সামনে এসেছে। তাদের পুরোনো মিত্র বিএনপির প্রচারণাতেও জামায়তের বিরুদ্ধে একাত্তরে দলটির ভূমিকার সেই অতীতকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতির প্রভাব কতটা
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি ঘিরে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের তৎপরতা বিভিন্ন সময় দৃশ্যমান হয়েছে। তবে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনের দিকে অনেক বেশি নজর রাখছে বিভিন্ন দেশ। এদের মধ্যে আছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এবং চীন, প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান।

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও জামায়াতের বর্তমান ও ভবিষ্যত অবস্থান কী-সেটা জানার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে ওই দেশগুলোর কূটনীতিকদের মধ্যে।

ঢাকায় কর্মরত ওই দেশগুলোর কূটনীতিকেরা বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। দল দুটোর দিক থেকেও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের উদারনীতি তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

জুলাই গণ-অভ্যত্থানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন একবারে তলানি গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে, এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের অনুপস্থিতিতে যে দলগুলো সক্রিয় রয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই ভারতবিরোধী অবস্থান।

ফলে দেশের রাজনীতিতে এবং ভোটের প্রচারণাতেও ভারতবিরোধিতার বিষয়কে কার্ড হিসেবে আনছে কোনো কোনো দল।

জামায়াতসহ ইসলামী বিভিন্ন দলের নেতাদের অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে, বিএনপির সঙ্গে ভারতের এক ধরনের সমঝোতা হয়ে থাকতে পারে। সেকারণে বিএনপি তাদের প্রচারণায় এবার ভারত বিরোধী কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না।

ভারত প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট নয়, এটিই অভিযোগ ইসলামী বিভিন্ন দলের। এ বিষয়টি বিএনপির জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন, এমন পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে মানুষ হত্য বন্ধ করা এবং অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা আদায়সহ দুই দেশের অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরতে হয়েছে।

জামায়াতের বিরুদ্ধেও ভূরাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবস্থানের অস্পষ্টতার পাল্টা অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের প্রতিপক্ষ থেকে। কূটনীতির বিশ্লেষকেরা বলছেন, দলগুলো ভোটে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতির বিষয়ও বিবেচনায় নিচ্ছে বলে তাদের ধারণা।