গাইবান্ধার ৫ আসনে জাতীয় পার্টির আস্থা সংকট
গাইবান্ধার রাজনৈতিক মাঠ একসময় ছিল জাতীয় পার্টির দখলে। পাঁচটি সংসদীয় আসনেই লাঙ্গল প্রতীকের ছিল অবিসংবাদিত প্রভাব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই লাঙ্গল এখন মাঠে ফসল ফলাতে ব্যর্থ। দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ঘাটতি, ক্ষমতার ভাগাভাগির রাজনীতি, দলীয় কোন্দল এবং আস্থাহীনতার গভীর সংকটে জর্জরিত হয়ে দলটি এখন ভোটারের মন থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যাওয়ায়, দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও জাতীয় পার্টির নিজের অবস্থানও এখন ভোটারদের কাছে অস্পষ্ট ও নড়বড়ে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও ভোটারদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন অন্য একটি রাজনৈতিক বলয়ের ছায়ায় থেকে, নির্ভরশীল রাজনীতি করে আসছে। তারা নিজস্ব ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে পারেনি, এলাকার মানুষের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি, দলের প্রতীককে বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ এড়াতে পারেনি এবং তরুণ প্রজন্মকে দলে আকৃষ্ট করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। বারবার নীতি ও অবস্থান পরিবর্তন দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে তলানিতে ঠেকিয়েছে।
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে দলটি গাইবান্ধার পাঁচটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী নিজে দুটি আসনে (গাইবান্ধা-১ ও ৫) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে গাইবান্ধা-২ আসনে আবদুর রশিদ সরকার, গাইবান্ধা-৩ আসনে ময়নূর রাব্বি চৌধুরী রুমান ও গাইবান্ধা-৪ আসনে কাজী মশিউর রহমান লাঙ্গল প্রতীকে ভোট চাইলেও, তাদের প্রচারণার মূল সুরই যেন ভিন্ন।
মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে ভোট আদায়ের চেয়ে গণভোটে ‘না’ প্রচারণাকেই অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। মহাসচিব পাটোয়ারী নিজে এমনকি দলের নেতাকর্মীদের পর্যন্ত ‘না’ ভোট দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান সাধারণ ভোটার, বিশেষ করে নতুন ও তরুণ প্রজন্মের কাছে জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে আরও বেশি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
তরুণ ভোটার আখলাছ হিমুন বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সাধারণ মানুষের জন্য কোনো কাজ করেনি। তারা শুধু ক্ষমতার বলয়ে থাকার জন্য নানা জোট করেছে। এখন দলটি নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।’
অন্যদিকে ভোটার ডালিয়াজ্জামানের মন্তব্য আরও তীক্ষ্ণ, তিনি বলেন, ‘এই দলটি তরুণদের বিপক্ষেই ছিল। এখন গণভোটে ‘না’ প্রচার করে তারা কী চায়, তা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রধান দলগুলো যখন গণভোটে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে, সেখানে জাতীয় পার্টির ‘না’ প্রচার শুধু তাদের ঐতিহ্যগত ভোটারদেরই বিভ্রান্ত করছে না, বরং দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানকেও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলছে। দলটি যেন 'অভিভাবকহীন সন্তানের' মতো হীনবল দেখাচ্ছে, যার ভবিষ্যৎ কৌশল ও নেতৃত্ব সম্পর্কে অস্পষ্টতা প্রকট।
এই সব সংকটের মধ্যেও জাতীয় পার্টির গাইবান্ধা জেলা সভাপতি সারওয়ার হোসেন শাহিন দাবি করেন, তারা আসনগুলো উদ্ধারে কাজ করছেন এবং সাধারণ ভোট চাইছেন। তিনি জানান, দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহাসচিবসহ তারা গণভোটে ‘না’ পক্ষেও কাজ করছেন।